বিশ্বাসকে দৃঢ় করার দিন ১৫ আগস্ট

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাৎবার্ষিকী ও জাতীয় শোকদিবস আজ। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি তার স্রষ্টাকে হারিয়েছিল ১৯৭৫ সনের এই দিনে। স্বাধীনতা লাভ করলেও বাংলাদেশ যে তখনও পাকিস্তান ভাবাদর্শকে ঝেড়ে-মুছে দিতে সক্ষম হয়নি, ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ও বেদনা বিধুর ঘটনা এর বড় প্রমাণ। মূলত কতিপয় বিপথগামী সামরিক অফিসারের কাঁধে চড়ে সেদিন পাকিস্তানি প্রেতাত্মারাই বাংলাদেশকে পুনর্দখল করে নিয়েছিল। তাই স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের সাড়ে তিন বছর পেরোতে না পেরোতেই এই জাতি আবারও প্রগতির উন্মুক্ত আকাশ থেকে প্রতিক্রিয়ার বদ্ধ কুঠরিতে আশ্রয় নেয়। এই পশ্চাদ্গমনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতির যে বিষময় ফলাফল, আমরা আজও তা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। যেসব মহান আদর্শকে অন্তরে ধারণ করে বীর বাঙালি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেশটিকে স্বাধীন করেছিল, আজ সেইসব আদর্শের অধিকাংশই মেঘে ঢাকা আকাশের কোন দূর অজানায় লুকিয়ে আছে যেন। যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে অস্বীকার করে ১৯৪৭ সন থেকে ১৯৭১ সন পর্যন্ত লড়াই সংগ্রাম জারি ছিল এই জনপদে, সেই বিভাজন রেখাকে চিরতরে মুছে দেয়া সম্ভব তো হয়ই নি বরং আজ যেন ব্যক্তির পরিচয় শুধু ওই আয়নায়ই প্রতিবিম্বিত হয়। যে অর্থনৈতিক অসাম্যের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে লড়াকু এই জাতি রাজপথ কাঁপিয়েছে সেই অর্থনৈতিক সমতা এখন অমাবস্যার চাঁদের মতো অবাস্তব কল্পনা মাত্র। ১৯৭৫ সনের পর এই দেশটি উল্টোযাত্রা শুরু করে পথে পথে যে আবর্জনার স্তুপ জমিয়ে তুলেছে তা আজ পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে অবস্থান নিয়েছে মননে-মানসিকতায়-চিন্তায়-আচরণে। এমন এক সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবস আমাদের আত্ম-সমালোচনা ও আত্মোপলব্ধির একটি সুযোগ এনে দেয়। মহান স্বাধীনতার আদর্শগুলো, যা ছিল বঙ্গবন্ধুরই মগজপ্রসূত, সেইসব আদর্শকে স্মরণ করার একটি উপলক্ষও হয়ে উঠে ইতিহাসের রক্তস্নাত এই কালো দিবসটি।
সেদিন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি যারা অংশ নিয়েছিলো তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু শুধু এই ক’জন হত্যাকারীই কি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে ১৯৭১ সনের অর্জিত বিজয়কে অর্থহীন করে দিতে চেয়েছিল? এই হত্যকাণ্ডের ব্যাকস্টেজের কুশলীদের এখনও বিচারের সম্মুখীন করা যায়নি। এই অদৃশ্য কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিতে ইতিহাসের আলো প্রক্ষেপণের মাত্রাও কম। পচাত্তরে একটি জাতির স্বপ্ন- আহ্লাদকে খুন করার যে সুনিপুণ পরিকল্পনা সাজিয়েছিল জাতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের চিহ্নিত না করার কারণেই আমরা আজও সাম্প্রদায়িকতা, পশ্চাদপদতা, ক্ষুদ্রতা, চেতনার অন্ধত্ব, আদর্শের প্রগতিহীনতা; প্রভৃতি খারাপ প্রপঞ্চগুলোকে বিদায় করতে পারিনি। আজ যখন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারবর্গের আত্মাহুতির করুণ আখ্যান এই জাতি স্মরণ করবে তখন অবশ্যই সেইসব প্রপঞ্চগুলোকেও জাতীয় জীবন থেকে চিরতরে নির্বাসনের পথ সন্ধান করতে হবে সকলকে। নতুবা আদর্শের বঙ্গবন্ধু চেতনার মুজিব দৃঢ়তার শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা হারিয়ে ফেলব। মুজিব চিরঞ্জীব বা এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে, এইসব শ্লোগান কেবল মুখে উচ্চারণের জন্য নয়, এই শ্লোগানগুলো ব্যক্তির বিশ্বাস ও আবেগ দ্বারা তৈরি। এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করার দিন হলো ১৫ আগস্ট।
সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের নিহত ১৬ জন সদস্যের স্মৃতির প্রতি আমরা বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের লালিত আদর্শ, বিশ্বাস ও স্বপ্নের কথা আমরা স্মরণ করি এই ঐতিহাসিক দিনে। শপথ নেই তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের। সকলের মুখে সমান হাসি ফুটিয়ে তোলার সোনার বাংলা গঠনের।