- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - http://sunamganjerkhobor.com -

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহমায়ের দুধপান সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ

এম হাফিজুল ইসলাম
যে কোনো প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থার চাইতে শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত শুধু মাত্র মায়ের দুধ প্রদান শিশুর জন্য সবচেয়ে ভাল প্রতিষেধক যা অন্যান্য রোগসমূহ যেমন- শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া জনিত রোগ এবং জীবনের হুমকি স্বরূপ অন্যান্য রোগ থেকে শিশুকে ভালভাবে রক্ষা করে। এ সময়কালে অনিয়মিত মাতৃদুগ্ধ পান বা শুধু মাত্র মায়ের দুধ না খাওয়ানোর ফলে সারা বিশ্বে বার্ষিক ১১.৬ শতাংশ বা ৮,০০,০০০ শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী (সূত্র: https://thousanddays.org/the-issue/breastfeeding/) ।
মায়ের দুধের গুরুত্ব বিষয়ে আলোচনার আগে কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে কথা বলি। শিশুর জীবনে প্রথম ১০০০ (২৮০+১৮০+৫৪০) দিবস তার ভবিষ্যৎ গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যার গণনা শুরু হয় মায়ের গর্ভে শিশুর অবস্থানের ঘোষণার সাথে সাথেই। অর্থাৎ গর্ভে শিশুর ভ্রুণ তৈরীর সময়েই। মায়ের গর্ভ ধারণের দিন থেকে শিশুর দিবস হিসেব শুরু করতে হবে। যদিও আমরা শিশু জন্মের পর থেকে তার বয়স হিসেব করে থাকি। মায়ের গর্ভের ২৭০ দিন এবং জন্মের পরবর্তী ২ বছর শিশুর খাদ্যাভ্যাস পুষ্টির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসময়ে শিশুটি ভবিষ্যতে কতটা বু্িদ্ধদীপ্ত এবং কর্মঠ হবে তা অনেকটা নির্ধারিত হয়ে যায়। তাই এসময় শিশুর বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। শিশুর এই ১০০০ দিবসকে আমরা ৩টি ভাগে ভাগ করতে পারি, যথা-
১. মায়ের গর্ভে শিশুর ৯মাস ১০দিন বা ২৮০দিন
২. জন্মের পরে প্রথম ৬ মাস বা ১৮০ দিন এবং
৩. ১৮১ দিন থেকে শুরু করে শিশুর দ্বিতীয় জন্মদিন বা ৫৪০ দিন।
শিশু এবং তার গর্ভধারিনী মা দু’জনের জন্যই গর্ভকালীন সময়কাল বা প্রথম ধাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ধাপে শিশু যখন তার মায়ের গর্ভে বড় হতে থাকে এসময় সে তার মায়ের কাছ থেকে তার বেড়ে উঠার সমস্ত প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে। তাই এসময় শিশুর যথাযথ বৃদ্ধি, বিকাশ ও সুস্থতা সবই নির্ভর করে তার মায়ের গর্ভকালীন নিয়মিত সেবা, যত্ন ও পারিপার্শ্বিক ইতিবাচক পরিবেশের উপর। মায়ের জন্য গর্ভস্থ শিশু যদি প্রথম গর্ভ হয়ে থাকে তা হলে মায়ের বয়স কমপক্ষে ১৮ বা তার বেশী হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার তাই মেয়েদের বয়স সর্বনিম্ন ১৮ বছর ধরে আইন প্রণয়ন করেছেন। কম বয়সে গর্ভ ধারন করলে মা ও শিশু উভয়ের জন্য কিছু ঝুঁকি তৈরী করে। এতে মায়ের প্রসব কালীন মৃত্যু ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে শিশু জন্মের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাছাড়া ১৮ বছর পর্যন্ত একজন কিশোরী নিজেই শারীরিক ও মানসিকভাবে বৃদ্ধি ও বিকাশ লাভ করে। যা তার ভবিষ্যৎ পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন শুরু করবার প্রস্তুতির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের জন্য চলমান গর্ভ একাধিক হয়ে থাকলে আগের গর্ভের সাথে পরবর্তী গর্ভের মধ্যে ব্যবধান কমপক্ষে ৩ বছর হওয়া প্রয়োজন, যা মাকে পরবর্তী গর্ভের জন্য ভালভাবে প্রস্তুত করে। এবং ছোট শিশুর যথাযথ যত্ন ও পুষ্টির জন্যও তা অনেক ভাল ভূমিকা রাখে।
গর্ভকালীন সময়ে মায়ের যথাযথ যত্ন, সঠিক পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও আনন্দদায়ক এবং নিরাপদ পরিবেশ আসন্ন শিশুর বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে দারুণ সহায়ক। অন্যদিকে এটি মায়ের নিরাপদ সন্তান প্রসবে ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে টনিক হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন শিশুর প্রথম ২ বছরের মধ্যে তার মস্তিস্কের গঠন বহুলাংশে সম্পন্ন হয় এবং মায়ের দুধ এই কার্যক্রমকে গতিশীল ও স্বাভাবিক রাখতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
জন্মের সাথে সাথে শুরু হয় শিশুর দ্বিতীয় সময়কাল, যার সব চেয়ে ভাল সূচনা হতে পারে জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে শিশুকে হলুদাভ শালদুধ প্রদানের মাধ্যমে। আধুনিক কালে যা শিশুর প্রথম টিকা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই শাল দুধ শিশুকে জন্ম পরবর্তী বাইরের নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বেশ সহযোগিতা করে। শিশুর জন্য জন্মের পরে প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র মায়ের দুধই যথেষ্ট। এবং এসময় শিশুকে মায়ের দুধ ব্যতীত অন্য কোন বিকল্প খাদ্য বা ১ ফোঁটা পানিও প্রদান না করার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়। ভালভাবে নবজাতককে মায়ের দুধ সেবন আরম্ভ করা মায়ের স্বাস্থ্যের জন্যও অনেক জরুরী। এসময় শুধু মাত্র মায়ের দুধ শিশুর বেড়ে উঠার জন্য যথেষ্ট। তাই প্রসব পরবর্তী মায়ের সুস্থতার উপর নির্ভর করে শিশুর চাহিদা মতো মায়ের দুধ পাওয়া। এসময় সন্তানের পিতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও ভাল ভূমিকা রাখার সুবর্ণ সুযোগ থাকে। তারা মাকে নানা ভাবে সহায়তা করতে পারেন, যাতে মা তার সন্তানকে যথেষ্ট সময় নিয়ে সঠিক ও পরিমাণ মত বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন।
শিশুর প্রথম ১০০০ দিবসের শেষ ধাপ হলো তার ৬-২৩ মাস বয়সকাল। এসময় শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দেয়া আরম্ভ করতে হয়, যা শিশুকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে। শিশুর ৬ মাস পূর্ণ হলে শিশুর শারীরিক চাহিদা বাড়ে এবং তা শুধুমাত্র মায়ের দুধে পূরণ হয় না। এসময় শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স অনুপাতে বৈচিত্র্যপূর্ণ পারিবারিক খাবার দিতে হবে। তবে শিশুর পিতা-মাতাকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে এ সময়ে মা কোনোভাবেই পুনরায় গর্ভধারন না করেন। এব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাকর্মীরও রয়েছে সমান দায়িত্ব, তাদেরকে শিশুর পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। মা পুনরায় গর্ভধারণ করলে মায়ের দুধের সরবরাহ কমে যেতে পারে। তাছাড়া এসময় মায়ের শরীর একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে ফলে মায়ের শরীর পুনরায় গর্ভধারনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না। মায়ের অপ্রস্তুতি স্বাস্থ্য পরবর্তী সন্তানের জন্য ফলপ্রসূ না।
উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, শিশুর সম্ভাব্য মেধা ও শারীরিক বিকাশ বহুলাংশে নির্ধারিত হয়ে যায় শিশুর প্রথম ১০০০ দিবসের মধ্যে। তাই আজকের এই শিশুকে আগামী দিনের যোগ্য ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে মায়ের দুধের গুরুত্ব অপরিসীম। এবারের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য হলো- BREASTFEDING: Foundation of Life বা ‘মায়ের দুধপান সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ’। এই শ্লোগানকে বাস্তব রূপ দিতে গেলে আমাদের অনেক করণীয় আছে। যেমন- বিকল্প দুধের প্রসার নিয়ন্ত্রণ, শিশুর প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত কর্মজীবী মায়ের বেতনসহ ছুটির কার্যকারিতা সব পর্যায়ে নিশ্চিত করা এবং গৃহিনী মায়েদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরী নিশ্চিত করা, সেবাকর্মীদের এ সম্পর্কিত জ্ঞান ও কাউন্সেলিং দক্ষতা বাড়ানো যা সারাদেশে মায়ের দুধের গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এবং শিশুর ভবিষ্যৎ ভিত্তি মজবুত করবে এবং প্রকারান্তরে দেশকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে।
লেখক: টেকনিক্যাল কোর্ডিনেটর-নলেজম্যানেজমেন্ট এন্ড এডভোকেসি নিউট্রিশন এট দি সেন্টার প্রকল্প, কেয়ার বাংলাদেশ।

  • [১]