বিষমুক্ত সবজির চাষে জগন্নাথপুরের আশরাফুলের দিন বদল

আলী আহমদ, জগন্নাথপুর
আশরাফুল ইসলাম। বিষমুক্ত সবজি চাষে তিনি একজন সফল চাষি। পরিশ্রমি এই চাষি কর্মদক্ষতায় কৃষি ক্ষেত্রে একজন লড়াকু কৃষক হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত। ২০০৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষার পর আশরাফুল ইসলামের কৃষক বাবা আব্দুল বাতির মারা যান। সংসারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পড়ে আশরাফুলের ওপর। দিশাহারা হয়ে আশরাফুল বাবার পথেই কৃষি কাজ নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। বাবার রেখে যাওয়া মাত্র চার কেদার বোরো জমির ওপর সংসারের ভরণপোষণ ও ভাই বোনদের পড়ালেখা করাতে গিয়ে তিনি হিমশিম খেতে শুরু করেন। পরপর তিনবার অকাল বন্যা প্রাথকৃতিক বিপর্যয়ে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হলে ২ লাখ টাকা ঋণ গ্রস্থ হয়ে পড়েন আশরাফুল । দিশেহারা হলেও হাল না ছেড়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শে শুরু করেন সবজি চাষ ।
বিষমুক্ত সবজি চাষে প্রথম বছরে লাভের দেখা পান। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের বালিকান্দি গ্রামের আশরাফুলের বসবাস।
সস্প্রতি সবজি বাগান গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, আশরাফুল নিজের সবজি বাগান মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। কাজের ফাকে আশরাফুল কথা বলেন এ প্রতিবেদকের সঙ্গে। আশরাফুল জানান, বাবা মারা যাওয়ার পর মা, তিন ভাই, দুই বোন, স্ত্রী মিলে ৭ সদস্যের পরিবারের হাল ধরতে হয় তাকে। পরপর তিনবার অকাল বন্যায় বোরো ফসল হারিয়ে তিনি যখন দিশেহারা হয়ে পড়েন তখন নিজের চাচাতো ভাইদের জায়গায় তাদেরকে বলে সবজি চাষ শুরু করেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে লাভের দেখা পান এভাবে বাড়তে থাকে সবজি চাষের পরিধি। এবছর তিনি ১২ কেদার জমিতে সবজি চাষ করেছেন। তার মধ্যে ছয় কেদার জমিতে লাউ চাষ করেছেন, আশ্বিন মাস থেকে চলছে লাউ বিক্রি চৈত্র মাস পর্যন্ত তিনি তা বিক্রি করতে পারবেন। তিন কেদার জমিতে ফুলকপি আর তিন কেদার জমিতে ব্রুকলি চাষ করেন। আশরাফুল বলেন, ঘুম থেকে উঠে সবজি চাষের যাবতীয় কাজ করে কাজের মৌসুমী গ্রামের আরো ২/৩ জন যুবককে বেতন দিয়ে সহযোগি হিসাবে কাজে নেন। এবার সবজি চাষে ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আয় হবে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এরমধ্যে দুই লাখ টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। আশরাফুল সবজি বাগান দেখিয়ে বলেন, গ্রামের প্রতি পতিত জায়গায় কাজে লাগিয়ে সবজি চাষ করছি, নিজের পরিবারের কোন সবজি কিনতে হয় না, এমনকি প্রতিবেশীদের বাড়িতে তিনি নানা জাতের সবজি ছাড়া দিয়ে তাদেরকে সবজি খাওয়ার সুব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আশরাফুল জানান, সবজি চাষের পাশাপাশি এবার তিনি নিজের ও বর্গা দিয়ে প্রায় ৩০কেদার জমিতে বোরো আবাদ করেছেন।
আশরাফুলের দেখানো পথ অনুসরণ করে অনেকেই এ পথে হাঁটছেন।
তাদের মধ্যে একজন গৌস মিয়া জানান, আশরাফুলের কাছ থেকে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি এবার সাত কেদার জমিতে সবজি চাষ করেছি। তিনি আমাকে নানা ভাবে সহযোগিতা করায় আমি বিষমুক্ত সবজি চাষে লাভবান।
গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি তছই মিয়ার বলেন, আশরাফুলের সবজি চাষ করে তাঁর দিন বদল করেছেন। এখন সে এখন গ্রামের স্বাবলম্বী যুবক।
সৌদি থেকে দেশে আসা আসা আশরাফুলের বন্ধু ছইদুল ইসলাম বলেন, আমি প্রবাসে গিয়েও কষ্ট করে যা করতে পারিনি গত পাঁচ বছরে বিষমুক্ত সবজি চাষে আশরাফুল তা করতে পেরেছে। আশরাফুল নিজে বেশী পড়ালেখা করতে না পারলেও ছোট ভাইদের কে পড়লেখা শিখিয়েছে। গতবছর একজন সরকারি চাকুরি পেয়েছেন।
আশরাফুলের ভাই আমির হোসেন বলেন, বাবার মৃত্যু পর আমার ভাই অনেক কষ্টে সবজি চাষ করে আমাদের পড়ালেখা ও সংসার খরচ চালাতে হয়েছে। এখন ১০ কেদার জমি কিনেছেন। গরু কিনেছেন আরো ১২টি। গরুর গোবর থেকে জৈব সার তৈরি করে সবজি ক্ষেতে ব্যবহার করে ক্ষতিকারক পোকা দমনের জন্য জাদুর ফাঁদ সেক্স ফেরমোন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
আশরাফুলের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশের কল্যানপুর গ্রাম থেকে আসা আবুল খয়ের ৮০টাকা টাকা দিয়ে একটি লাউ কিনেন। আবুল খয়ের বলেন, বাজারে এ লাউ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতো, বিষমুক্ত ক্ষেত থেকে ৮০ টাকায় কিনে নিলাম। আশরাফুল বলেন, সবজিগুলো উপজেলা সদরের প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র জগন্নাথপুর, কলকলিয়া, শ্রীধরপাশা বাজারে গিয়ে বিক্রি করেন।
একই গ্রামের বাসিন্দা কলকলিয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল হাশিম বলেন, আশরাফুল এলাকার জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি নিজে সবজি চাষে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করছেন। এখন তার কল ্যানে গ্রামের মানুষ সবজি কিনতে হয়ে না।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শওকত ওসমান মজুমদার জানান, আশরাফুল জগন্নাথপুরের বিষমুক্ত সবজি চাষের প্রবর্তক। একজন সফল সবজি চাষি হিসেবে আমরা তাকে পুরস্কৃত করেছি।