বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের অচলাবস্থা কাটাতে উদ্যোগ নিন

শুক্রবার প্রকাশিত দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বর্ষপূর্তির বিশেষ সংখ্যায় শহরের বুলচান্দ হাইস্কুলের হতাশাজনক অবস্থার উপর একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদটিতে জেলার অন্যতম প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষা দান কাজে নিদারুণ ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে। সংবাদটিতে বলা হয়েছে শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে অন্য ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এতে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার মানের অধোগমন ঘটেছে যার প্রতিফলন ঘটছে ফলাফলে। শহরের অভিভাবক মহল এক সময়ের নামকরা বিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠার আশা ব্যক্ত করেছেন। বলাবাহুল্য শহরের এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি গড়ে উঠার পিছনে যে দেশাত্মবোধ ও চেতনা কাজ করেছিল, আজকের অবস্থা দেখে কেউই তা বিশ্বাস করতে চাইবেন না। ১৯৩২ সনে, ব্রিটিশ শাসনকালে ব্রিটিশবিরোধী দেশপ্রেমিকরা গড়ে তুলেছিলেন এই বিদ্যালয়। তখন শহরের অন্যতম বিদ্যালয় ছিল সরকারি জুবিলী বিদ্যালয়। ব্রিটিশদের অধীনস্ত কোন বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ করবেন না, এমন এক দেশপ্রেমিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তৎকালীন সময়ের স্বদেশী বিপ্লবীরা নিজেদের একটি বিদ্যালয় চাইছিলেন এই শহরে। রবিদাম, যিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের অন্যতম এক ব্যক্তি ছিলেন, তিনি সহ আরও অনেকের একাগ্রতায় ও বুলচান্দ পালসহ আরও কয়েক জনের সহায়তায় গড়ে উঠে এই বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর নৈতিক চরিত্র গঠন, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়া প্রভৃতি দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহু কীর্তিমান শিক্ষক এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁদের ঋষিসুলভ শিক্ষায় আলোকিত হয়ে অনেক শিক্ষার্থীই পরবর্তী কর্মজীবনে যশস্বী হয়েছেন। জুবিলীর সাথে তাল মিলিয়ে এই বিদ্যালয়টি শহরের অন্যতম বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন এই অবস্থান বজায় রেখেছিল। কিন্তু বিদ্যালয়টির সেই সুদিন হারিয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে এই অধোগমন। এখন ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ হতে চলেছে। জানা গিয়েছে, এই বিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক শিক্ষা বহির্ভূত কর্মকা-ে অধিকতর মনোযোগী থাকেন। ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠ দানের আসল কাজটিই এখন বিদায় নিয়েছে। তাই বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের এখন আর আকৃষ্ট করতে পারছে না। শুধুমাত্র ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নত করা যায়। শহরের সচেতন মহল একান্তভাবেই চান, বিদ্যালয়টি তার পূর্ব সুনাম ফিরিয়ে আনুক। আমরাও তাই চাই।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সুপরিসর এলাকা নিয়ে বিদ্যালয়টির অবস্থান। এখানে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ভাল। আরও ভাল করার সুযোগ আছে। শহরে এমনিতেই মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুঁজতে যেয়ে দুই/একটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে আর কিছু পছন্দ করার সুযোগ পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যালয়টিকে শিক্ষা দানের অনুপযুক্ত করে রাখা চরম দুর্ভাগ্যজনক। এখন এখানে যে যে সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসনের উদ্যোগ নেয়া উচিত জরুরি ভিত্তিতে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রধান শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। অন্যান্য শিক্ষক যারা আছেন তাদেরকে আদর্শ শিক্ষক রূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শিক্ষার বিষয়ে কোন আপোশ কেউই কামনা করেন না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শক্ত হতে হবে। নমনীয় বা মুখরক্ষা মনোভাব পরিহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে কীভাবে পূর্বের ঐতিহ্যবাহী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায় সেই চিন্তা করতে হবে। আমরা মনে করি এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ও মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সুধীজনরা ভাল ভূমিকা রাখতে পারেন। আমরা আশা করি বহু গর্বে গরীয়ান এই বিদ্যালয়টির অচলাবস্থা নিরসনে অচিরেই একটি খোলামেলা সাবজনীন আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নিশ্চয়ই ব্রিটিশ পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র নিয়ে গড়ে উঠা এই বিদ্যালয়টি শহরের যোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।