বৃদ্ধ সুনীলের মৃত্যু আমাদের বিমূঢ় করে দেয়

মানুষ কতটা বেপরোয়া এবং দুর্বিনীত হতে পারে সেটি প্রমাণ করল আব্দুর রউফ। সে বেতগঞ্জ বাজারের পার্শ্ববর্তী এলাকার হাবিব উল্লাহর ছেলে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় আব্দুর রউফ কোন এক জলমহালে নৈশ প্রহরীর কাজ করত। সম্ভবত স্বভাবের দুর্বিনীত বৈশিষ্টটি সে ওই পেশা থেকেই অর্জন করেছে অথবা সে এমন স্বভাবের বলেই তাকে ওই কাজে নেয়া হয়েছে। আব্দুর রউফ নামের এই বেপরোয়া মানুষটি আকিলপুর গ্রামের সুনীল চন্দ্র পাল নামের এক বৃদ্ধকে ঘুষি মেরে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলেছে। এমন না যে, বৃদ্ধ সুনীল পাল তার উপর আক্রমণ করেছিলেন, এমনও না যে সুনীল রউফের পাকা ধানে মই দিয়েছেন। এমন সাধ্যও নেই সুনীল পালের। তিনি নিতান্তই এক হতদরিদ্র ও নিরীহ প্রকৃতির ব্যক্তি। ফেরিওয়ালার ব্যবসা করে কোনমতে তিনি নিজের সংসার চালাতেন। এই ধরনের নিরীহ দরিদ্র ব্যক্তিরা সবসময় মার খেয়েই অভ্যস্ত। কখনও প্রতিবাদ করতে পারেন না তারা। বরং বলা যায় প্রতিবাদ করার অভ্যাসই নেই তাদের মধ্যে। শনিবার সন্ধ্যায় বেতগঞ্জ বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন সুনীল পাল। হাতে ছিল বাজার থেকে কেনা একটি চালকুমড়ো। ওই চালকুমড়োটি জোর করে ছিনিয়ে নিতে চাইছিল আব্দুর রউফ। সুনীল চালকুমড়োটি দিতে চাইছিলেন না। হয়ত ওই চালকুমড়ো ঘরে নিলেই তা দিয়ে কোন তরকারি রান্না হত যা দিয়ে রাতের খাবার গ্রহণ করতেন তারা। কিন্তু রউফ সুনীলের এমন বেয়াদবি সহ্য করার মত ব্যক্তি নয়। সে বৃদ্ধ সুনীলকে ঘুষি মারতে লাগল। এমনই মারল যে ঘটনাস্থলেই নিহত হলেন সুনীল।
উপরের ঘটনাটিকে আমরা কী বলব? এখানে একজন মানুষকে মেরে ফেলার মত কোন বিষয়ই ছিল না। নেহায়েৎ একটি চালকুমড়ো জোর করে ছিনতাই করে নেওয়ার জন্য কেউ কাউকে খুন করে ফেলতে পারে এমন বর্বর সমাজ ব্যবস্থার ততোধিক বর্বর কেউ যে এখনও রয়েছে আব্দুর রউফের এই কুকা- না শুনলে বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হত। অবস্থা পর্যালোচনায় আমাদের কাছে মনে হয়েছে যে, আব্দুর রউফের মধ্যে এক ধরনের মানসিকতা কার্যকর ছিল যার ফলে সে অন্তত সুনীলের মত মানুষের চাইতে নিজেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হিসাবে মনে করত। ওই মানসিকতাই তাকে সুনীলকে মেরে ফেলার মত আঘাত করতে সাহসী করে তুলেছে। শহর বা গ্রামাঞ্চলে একটু সতর্কভাবে খোঁজ খবর নিলে এমন বহু অসহায় সুনীলদের আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারব। দুর্বলের উপর সবলের এমন উৎপীড়ন সভ্যতা শুরুর আদিকাল থেকে কার্যকর থাকলেও সভ্য মানুষরা সর্বাবস্থায় ওই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে প্রতি মুহূর্ত কাজ করে আসছেন। একটু একটু করে অবস্থার কিছু অগ্রগতি সাধিত হলেও মোটাদাগে এখনও আমরা সকল নাগরিকের সমান মর্যাদার জায়গায় যেতে পারিনি। আধুনিক সভ্যতার সংকটের জায়গাও এটুৃকুই। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে কখনও শান্তি স্থাপিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা মানুষের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার বোধকে স্বীকার না করি।
ঘাতক আব্দুর রউফ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। সুনীল যেহেতু হতদরিদ্র শ্রেণির লোক সম্ভবত তার পরিবার থেকে আইনি প্রতিকার লাভে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জায়গাটিতে ঘাটতি থাকবে। সমাজের সচেতন ও অগ্রসর অংশকে এখন অসহায় সুনীলের হত্যাকা-ের সুবিচার পেতে সহায়তা দিতে হবে। একইসাথে পুলিশকে রাখতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। সুনীল হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে রউফের কলঙ্কের হাত থেকে আমরা বাঁচতে চাই।