বেতন নেন দোয়ারাবাজারের কলেজ শিক্ষকের!

বিশেষ প্রতিনিধি
কাগজে কলমে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের সমুজ আলী স্কুল এ- কলেজের ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক তিনি। নাম মোহাম্মদ ছোয়াব মিয়া। আবার ছোয়াব আহমেদ ঋতুল নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগরের গোকর্ণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও এই কলেজ শিক্ষক। গোকর্ণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর ওখানে উপ-নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন তিনি। ছোয়াব মিয়া গোকর্ণের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করলেও বেতন নিচ্ছেন সমুজ আলী স্কুল এ- কলেজের প্রভাষক হিসাবে। দায়িত্বশীলরা বললেন, বিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে সম্মানী চেয়ারম্যানেরই নিতে হবে।
প্রভাষক মোহাম্মদ ছোয়াব মিয়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই কলেজ শিক্ষকতার চাকুরিতে অনিয়মিত রয়েছেন। প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমতি বা ছুটি না নিয়েই ২০১৯ সালের আট এপ্রিল নাছিরনগরের গোকর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন তিনি। ৬ মাস এক নাগাড়ে স্কুলে না আসায় তাকে কয়েকবার শোকজ করার পর বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানায় কলেজ কর্তৃপক্ষ। ২০১৯’এর জুনের পর কলেজে এসে কয়েকদিন উপস্থিতি দেখান এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে বেতনও তুলে নেন তিনি।
সমুজ আলী স্কুল এ- কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ (বর্তমানে অবসরে আছেন) সলিল তালুকদার বললেন, প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমতি না নিয়েই ছোয়াব মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করেছেন। পরে তাকে শোকজও করা হয়েছিল। আমি অবসরে চলে যাওয়ায় পরের বিষয় জানা নেই।
কলেজের অন্যান্য শিক্ষকরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে ইসলামের ইতিহাসের একজন শিক্ষক, তিনি অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান বিঘিœত হয়। করোনাকালের ১৭ মাস কেবল সম্মানী নেবার দিন তিনি উপস্থিত হয়েছেন। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি এভাবেই বেতন তুলেছেন।
২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সমুজ আলী স্কুল এ- কলেজের অধ্যক্ষ অসিম মোদক যোগদানের পর তাকে (ছোয়াব মিয়াকে) বার বার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। পরে অসুস্থ উল্লেখ করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর কলেজের ই- মেইলে ছুটির আবেদন পাঠান ছোয়াব মিয়া। গেল সাত অক্টোবর কলেজ পরিচালনা কমিটির সভায় সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাংশু কুমার সিনহা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ছোয়াব মিয়ার এই ছুটির আবেদন অনুমোদন না দিয়ে তার বেতন বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কলেজ অধ্যক্ষ জানান, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা সামনে, তিনি (ছোয়াব মিয়া) এসে ক্লাস না করায় সমস্যা হচ্ছে। অধ্যক্ষ জানালেন, কলেজে ছোয়াব মিয়া নামেই চাকুরি তাঁর, শুনেছি নাছিরনগরে ছোয়াব আহমেদ হৃতুল নামে তার পরিচিতি। এই প্রভাষক কলেজে না আসায় শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় বিঘœ ঘটছে বলে জানান কলেজ অধ্যক্ষ।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বললেন, ওই শিক্ষক কর্মস্থলে অনিয়মিত এবং আরেক জেলায় গিয়ে তিনি চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। তার কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে যাওয়া আইনসঙ্গত ছিল। এছাড়া বেতন তিনি চেয়ারম্যান হিসাবে তুলবেন, শিক্ষক হিসাবে নয়।
দোয়ারাবাজারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাংশু কুমার সিংহ বললেন, বিষয়টি জানার পর ওই কলেজ শিক্ষকের ছুটির আবেদন মঞ্জুর করা হয় নি। তার বেতন বন্ধ রেখে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলেছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হালিমা খাতুন বললেন, আমি নাছিরনগরে কেবল যোগদান করেছি, গোকর্ণের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছোয়াব আহমেদ ঋতুল কলেজে শিক্ষকতা করছেন, ওখান থেকে বেতন নিচ্ছেন বলে জানা ছিল না। তবে তিনি চেয়ারম্যান হিসাবে বেতন তুলছেন না এটি জেনেছি আমি। তিনি যেহেতু কলেজে অনিয়মিত, ওখানকার বেতন না তুলে চেয়ারম্যান হিসাবে যে সম্মানী পান সেটি তুলাই আইনসঙ্গত ছিল। দোয়ারাবাজার কলেজ কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি খেয়াল করলে ভালো হত।
নাছিরনগরের গোকর্ণের বর্তমান চেয়ারম্যান ছেয়াব আহমেদ হৃতুল। এই ইউনিয়নে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ভোট হবে। ভোটের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এবারও ছোয়াব মিয়া ওখানকার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। অনেক চেষ্টা করে কথা বলার জন্য তাকে ফোনে পাওয়া গেলেও পরিচয় দিতেই তিনি কথা বলতে পারবেন না জানিয়ে ফোন কেটে দেন। ফোন বন্ধ করে দেওয়ায় তার ছেলে সুলতান আহমদ’এর ফোনে (হোয়াটসঅ্যাপে) যোগাযোগ করেও ছোয়াব মিয়ার সঙ্গে কথা বলা যায় নি।