বেরীবাঁধ কাম ওয়াকওয়ে নির্মাণের দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি
ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জির পাদদেশের জেলা শহর সুনামগঞ্জকে নিরাপদ রাখতে সুরমা নদীর তীরে বেরীবাঁধ কাম ওয়াকওয়ে নির্মাণের দাবি ওঠেছে। সীমান্তের এপারে এবং ওপারে বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই সুনামগঞ্জ শহর প্লাবিত হয়। নদীরপাড়ের বাড়িঘর—সড়কে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ওঠে। বছর বছর সড়ক নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। এই অবস্থায় সুনামগঞ্জ শহর বাঁচাতে বেরীবাঁধ নির্মাণ জরুরি মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সুনামগঞ্জ জেলা একসময় আসামের কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তভুর্ক্ত ছিল। ইতিহাসে উল্লেখ আছে সুনামদি (সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রূপ) নামের মোগল সিপাহীর নামানুসারে সুনামগঞ্জের নামকরণ হয়েছিল । ১৮৭৭ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমা এবং পৌরসভা হয়েছিল ১৯১৯ সালে। ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয় এই প্রান্তিক শহর। সীমান্তবর্তী এই শহরে উল্লেখ করার মতো বৃহৎ কোন উন্নয়ন কাজ হয় নি। পাহাড়ি ঢলের আগ্রাসন থেকে শহর সুরক্ষার দাবি এই শহরবাসির দীর্ঘদিনের। প্রতিবছর বর্ষার পদধ্বনিতেই সুরমা উপচে শহরের নবীনগরের সকল সড়ক, ষোলঘর, ডিএস রোড, পশ্চিমবাজার, বড়পাড়া, তেঘরিয়া, আরপিননগর, উত্তর আরপিন নগরের সকল সড়কে পানি ওঠে। ঘরবাড়িও নিমজ্জিত হয়।
শহরবাসির বহুদিনের দাবি সুরমা উপচে শহরে ঢোকা ঠেকাতে নদীর তীরঘেঁষে বেরীবাঁধ নির্মাণের। একইসঙ্গে এই বাঁধেই হবে ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ), যা বয়স্ক থেকে শুরু করে সকল মানুষ হাঁটার পথ হিসেবে ব্যবহার করবেন।
শহরতলির কোরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল বরকত বললেন, প্রতিবছর বর্ষার শুরুতেই হালুয়ারঘাট—নবীনগর সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অবস্থায় নবীনগর, মাইজবাড়ি, ধারারগাঁওসহ এখানকার জনপদ রক্ষাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি হালুয়ারঘাট থেকে জলিলপুর পর্যন্ত নদী সংরক্ষণের জন্য বেরীবাঁধ কাম ওয়াকওয়ে নির্মাণের দাবি জানান।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কালী কৃষ্ণ পাল বললেন, হালুয়ারঘাট থেকে বড়পাড়া পর্যন্ত তিন কিলোমিটার অংশে সুরমা নদী সংরক্ষণ ও বেরীবাঁধ কাম ওয়াকওয়ে নির্মাণের জন্য বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষকে পৌরসভার পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ২০০৮—০৯ সালে স্টিফ—২ প্রকল্পের আওতায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু স্থানে কাজ করার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল। তাদের ডিজাইনে সরকারি জমির বাইরে স্থানীয় জনসাধারণের কিছু জমি পড়েছিল। ডিজাইনে কিছুটা ত্রুটি ও জমি না পাওয়ায় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।
তিনি বললেন, সুরমা উপচে প্রতিবছর শহরের বেশ কিছু সড়ক প্লাবিত হওয়ায় কোটি কোটি টাকায় আবার সড়ক সংস্কার করতে হয়। নদীরপাড়ের এসব এলাকার পৌর নাগরিকদের ভোগান্তিও দূর হচ্ছে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বললেন, সুনামগঞ্জ পৌর এলাকাকে নদীভাঙন থেকে ও ঢলের আঘাত থেকে রক্ষা করতে ২০০৮ সালে কিছু কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নদীর পাড়ে জমি না পাওয়ায় এই প্রকল্পটি বাস্তাবায়ন করা যায় নি। শীগগিরই নদী খননের জন্য সমীক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে। ওই সময় নদী সংরক্ষণের বিষয়টি সমীক্ষার আওতায় আনা হবে। তিনি জানালেন, প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে সুনামগঞ্জ জেলা শহর অরিক্ষত থাকে। নদীরপাড়ে ৩০—৪০ ফুট জমি না পেলে নদীরপাড়ে বেরীবাঁধ কাম ওয়াকওয়ে নির্মাণ কঠিন হবে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভা মেয়র নাদের বখ্ত বললেন, এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নের জন্য নানা কতৃর্পক্ষের কাছে ধরণা দিচ্ছি আমরা। নদী খননের সমীক্ষার সময় প্রকল্পটিকে যুক্ত করার চেষ্টা করবো আমরা। নদীরপাড় কারো ব্যক্তিগত হতে পারে না, সুরমার পাড়ে বেরী বাঁধ কাম ওয়াকওয়ে হলে নদীরপাড়ের বাসিন্দারাই উপকৃত হবেন বেশি।
পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান সুনামগঞ্জের ধারারগাঁওয়ের বাসিন্দা ড. মোহাম্মদ সাদিক বললেন, স্বাধীনতার পর পাণ্ডারখালে বাঁধ নির্মাণ হওয়ায় বিশাল দেখার হাওরের কৃষকদের উপকার হয়েছে। কিন্তু দুই নদীর পানি একসঙ্গে গেলে ঢল নামলেই সুরমার পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে, তাতে কি কি সমস্যা হবে, সেই চিন্তাটি করা হয় নি। এখন সুরমাপাড়ের সুনামগঞ্জ শহর রক্ষায় নতুন চিন্তা করতে হবে। নদীশাসন, বেরীবাঁধ নদীর সংযোগ খালগুলো খনন করা, ধোপাখালি স্লুইসগেটকে বড় করে রাবারড্যাম বা অন্যকিছু করা যায় কি—না সেটি সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরাই ভাবতে হবে। না হয় জনপদ রক্ষা করা কঠিন হবে।