বেশিরভাগ স্কুলেই কম্পিউটার ল্যাবের দরজা খোলা হয় না

বিশেষ প্রতিনিধি
কক্ষের সামনে লিখা কম্পিউটার কক্ষ, ভেতরে কোন কম্পিউটার নেই। কিছু অব্যবহৃত মালামাল ও পুরাতন বই রাখা আছে। নবম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে কম্পিউটারের ব্যবহারিক ক্লাস কোথায় হয় জানতে চাইলে আশ্চর্য হয়ে তাকালো, যেন এমন শব্দের সঙ্গে পরিচয় নেই তাদের। সুনামগঞ্জ শহরতলির ইয়াকুব উল্লাহ্ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব’এর এমন করুণ দশা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল আহমদ বলেন,‘কম্পিউটার ল্যাবের ৫ টি ডেক্সটপ ও ১ টি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে রাখা আছে। এগুলো বিদ্যালয়ে দেবার কিছুদিন পর থেকেই (২০১০ সাল থেকেই) অকেজো। মেরামত করার চেষ্টা করেছি, হয়নি। কম্পিউটারের ব্যবহারিক ক্লাস বিদ্যালয়ে হয় না।’ বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেছে জানান এই শিক্ষক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল ইয়াকুব উল্লাহ্ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় নয়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এবং পরবর্তী কালে আইসিটি অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জেলার ১১ উপজেলার বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে করা অনেক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবেরই এমন করুণ হাল। প্রত্যন্ত এলাকার বেশির ভাগ স্কুলেই কম্পিউটার ল্যাবের দরজাই খোলা হয় না। এ কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তথ্য প্রযুক্তিতে আগ্রহী করার সরকারের লক্ষ্য সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গির আলম বলেন,‘এক বছর আগে দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। কম্পিউটার ল্যাব দেখতে চাইলে, অনেক সময় খুঁজে তালার চাবি বের করা হলো, খুলে দেখলাম ল্যাপটপ নেই, এক শিক্ষক বললেন প্রধান শিক্ষকের ঢাকায় পড়–য়া ছেলে নিয়ে গেছে। পরে এই বিষয়ে শোকজ করা হয়।’
শহরতলির মঙ্গলকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন,‘বিদ্যুতের ভোগান্তি ল্যাব চালাতে প্রধান অন্তরায়, ইন্টারনেট সংযোগ পেতেও ভোগান্তি আছে, এছাড়া কম্পিউটার ল্যাবে পর্যাপ্ত ডেক্সটপ বা ল্যাপটপ না থাকায়ও সমস্যা হয়। যেমন একটি বিদ্যালয়ে ১২ টি থেকে ১৭ টি কম্পিউটার আছে। শিক্ষার্থী আছে ১০০ থেকে ২০০ জন। একসঙ্গে এসব শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়া কষ্টকর হয়।’
অবশ্য. সুনামগঞ্জ সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক শওকত আলী আহমেদ বললেন,‘সীমিত সামর্থ দিয়ে সদিচ্ছা থাকলে ভালো করা যায়। আমাদের বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব সব সময় সচল থাকে। আমরা প্রতি ক্লাসের শিক্ষার্থীকে গ্রুপ করে একেকদিন একেক গ্রুপকে ব্যবহারিক ক্লাসে নিয়ে আসি এবং শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ভীতি দূর করা থেকে শুরু করে প্রাথমিক জ্ঞান এবং সহজসাধ্য অনেক প্রোগ্রামই শিখিয়ে দিচ্ছি। বিদ্যালয়ের শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের সকল ডেক্সটপ ও ল্যাপটপ সচল এবং আপডেট রাখা হয় সব সময়। ল্যাবে থাকা প্রায় ২৫ লাখ টাকার সরঞ্জামাদিকে আমরা যতœ করে রাখার চেষ্টা করছি।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কম্পিউটার বিভাগের সহকারী প্রোগ্রামার মো. নিজাম উদ্দিন বলেন,‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর থেকে সুনামগঞ্জের দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৪৭ টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানে প্রথম ধাপে ২০১৭ সালে ১৭ টি করে ল্যাপটপ, দ্বিতীয় ধাপে ১ টা ডেক্সটপ ও ৪ টা ল্যাপটপ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০১০-১১ সালে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, আইসিটি অধিদপ্তর থেকে শেখ রাসেল কম্পিউটার ল্যাব এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও আলাদা আলাদা কম্পিউটার ল্যাব করা হয়েছে। এগুলোর একত্রিত হিসাব না থাকলেও আনুমানিক সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় ১০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাব রয়েছে। এরমধ্যে কতগুলো সচল বা সক্রিয় সে হিসাব নেই। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল থেকে ২০১০-২০১১ ইংরেজি সালে দেওয়া কম্পিউটার ল্যাবগুলোর অনেকগুলোই এখন সচল নয়। ঐ সময় আইসিটির শিক্ষকও অনেক প্রতিষ্ঠানে ছিলেন না। ব্যবহার হয়নি, তদারকিও হয়নি।’
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গির আলম বলেন,‘সব কয়টি স্কুলের কম্পিউটার ল্যাব চালু রাখার জন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। ক্লাস্টার করে করে দায়িত্বশীলরা এখন বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন।’