বৈশাখী মেলা অসাম্প্রদায়িকতার প্রেরণা

ওবায়দুল মুন্সী
পহেলা বৈশাখ ও বৈশাখী মেলা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির প্রাণের উৎসব ও প্রাণের মেলা হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন । নানা প্রতিকূলতা ও অসম্প্রদায়িক প্রেরণার মধ্য দিয়ে বাঙালিরা এ মেলা উদযাপন করে আসছে আনন্দ উল্লাসে। কিন্তু এখনও কিছু মানুষ বৈশাখী মেলাকে ধর্মীয় পেক্ষাপটে বিচার করতে চান। এ বিচার বিবেচনা কেবল বাংলাদেশ
রাষ্ট্র হবার পরে নয়; আগেও করা হয়েছিল। কারো ‘হিন্দুয়ানি’ বলায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন বন্ধ হয়ে যায়নি। এ প্রসঙ্গে আহমদ রফিকের ‘বাঙালির শ্রেষ্ঠ সেক্যুলার জাতির উৎসব বাংলা নববর্ষ’ প্রবন্ধের কিছু কথা টেনে আনা যায়। তিনি লিখেছেন-আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান বাঙালির শ্রেষ্ঠ বা সর্বোত্তম জাতীয় উৎসব। একে বাঙালি সং¯ৃ‹তি ও ঐতিহ্য থেকে আলাদা করা যাবে না। তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে , এর শাসনতন্ত্রে যতই পরিবর্তন ঘটুক। শুধু দই মিষ্টি খেয়ে বা খাইয়ে একে ধরে রাখা যাবে না। রাখতে হবে হৃদয় ও মননের আন্তরিকতায় এবং ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব পালনে। বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখকে আমরা এভাবেই দেখে থাকি। দেখি যুক্তিতে, আবেগে, গ্রাম-নগরের একাত্মতায়, ঐতিহ্যিক সেই সেতুবন্ধনে। তাই বৈশাখী মেলা বরাবরই বাঙালির চৈতন্য এবং অসাম্পদায়িক প্রেরণার উৎস হয়ে জেগে থাকবে উৎসবে-অনুষ্ঠানে,উৎযাপনে।
জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব পেশাভিত্তিক লোকজনের সমাগম ঘটে এই বৈশাখী মেলায়। সারা বছর একে অন্যের থেকে দূরে থেকে যে বিরহের সূচনা হয়েছিলো, বৈশাখী মেলায় আবার সেই বিরহের অবসান ঘটিয়ে মহামিলনের এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জোয়ার সৃষ্টি করে দেয় এই বৈশাখী মেলা। এখানে আগমন ঘটে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান,কুলি-মজুর ,কামার-কুমার, মুচি-চামার, মেথর সহ সর্বজাতির । ধর্মালয়ে কিন্তু চাইলেই এটা হবে না! তবে নববর্ষের পহেলা বৈশাখে বৈশাখী মেলায় এই জাগরণ ঘটে থাকে। এখানে সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্মেষ ঘটে, রচিত হয় মহা-মিলনের নতুন আরেকটি পৃথিবীর । সর্বজাতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যে আনন্দ বিনোদন উপভোগ করে, বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির আর কোথাও আছে বলে আমার মনে হয় না । বৈশাখী মেলা প্রাণের মেলা , মহা মিলনের মেলা । তাই নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে, বৈশাখী মেলা হচ্ছে অসম্প্রদায়িক প্রেরণার এক মহামিলনের কেন্দ্রস্থল । বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব । নতুনবর্ষ কে বরণের পাশাপাশি উৎসবকে পরিপূর্ণতা দেয় বৈশাখী মেলা । অসম্প্রদায়িকতার প্রেরণামূলক
এই মেলা বাঙালি শতাব্দি প্রাচীন ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে শহর-গ্রামের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় এ মেলার। মেলা চলে মাস জুড়ে। তবে আমরা যে বৈশাখী মেলা দেখি, এটা কিন্তু মোটেও শহরিক নয়; বৈশাখী মেলার প্রচলন শুরু হয়েছে গ্রাম থেকেই । গ্রামের মানুষগুলো বছরের শুরুতে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতো এই বৈশাখী মেলা থেকেই । সে সঙ্গে চলতো হৈচৈ আনন্দ। বৈশাখী মেলা তাদের জন্য ছিলো একটা অসম্প্রদায়িক চেতনার মিলনমেলাও। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বৈশাখী মেলা গ্রামের গ-ি পেরিয়ে শহরের সংস্কৃতিতে স্থান নেয়। সেই সাথে মেলায় আসে কিছু পরিবর্তন । শহরের মানুষের কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজলভ্য, সেগুলো কেনার জন্য তাদের মেলার উপর নির্ভর থাকতে হয় না । তাই শহরে বৈশাখী মেলা হচ্ছে অনেকটা বিনোদন নির্ভর। দিনদিন শহরেও বৈশাখী মেলার প্রচলন বাড়ছে। আর এই মেলার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
এদেশে জমিদারি খাজনা আদায়ের লক্ষেই সম্ভবত বৈশাখী মেলার পত্তন ঘটেছে। অনেক গবেষকের ধারণা, খাজনা আদায়কে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য মূলত চৈত্রসংক্রান্তির মেলার উৎপত্তি হয়েছিলো । ধারণা করা হয় যে এর বয়স ১৫০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো। বর্তমানে বাংলাদেশে মেলার সংখ্যা প্রায় ১৬০০ থেকে ১৮০০ টি। আর বাংলাদেশে বৈশাখ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলার সংখ্যা প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টি। এই মেলাগুলো অবশ্যই প্রাচীন এবং যে কোনো নির্দিষ্ট স্থান ঘিরে আয়োজিত হয়ে থাকে। পূর্বে বৈশাখী মেলার মূল কেন্দ্র ছিলো বাংলা একাডেমি। বাংলা ১৩৮৫ সন থেকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) ধানমন্ডি মাঠে নিয়মিত এই বৈশাখী মেলার আয়োজন করে আসছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত বিসিক এর বৈশাখী মেলা দেশব্যাপি মানুষের মধ্যে অসম্প্রদায়িকতার প্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে।
মেলা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘‘আমাদের দেশ প্রধানত পল্লীবাসী। এই পল্লী মাঝে মাঝে আপনার বাড়ির মধ্যে বাহিরের বৃহৎ জগতের রক্ত চলাচল অনুভব করিবার জন্যে উৎসুক হইয়া ওঠে। তখন মেলাই তাহার প্রধান উপায়।এই মেলায় আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহবান করে। এই উৎসবে পল্লী আপনার সমস্ত সংকীর্নতা বিস্তৃত করে, তাহার হৃদয় খুলিয়া দান করিবার এই প্রধান উপলক্ষে।’’ মধ্যযুগে বৈশাখী মেলার ইতিহাস সচ্ছ নয়। তবে এ মেলার যে বহুল প্রচলন ছিলো সেটি স্বীকৃত বিষয়। আধুনিককালে এসে পহেলা বৈশাখ ও মেলা ব্যাপকভাবে শহরে প্রবেশ করেছে। ১৯৭৭ সালে সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’-এর সহযোগিতায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। এ মেলার আয়োজনে বরেণ্য চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান, ফোকলারাবিদ শামসুজ্জামান খানসহ আরও অনেকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো । প্রথম বারের মতো আয়োজিত এই মেলার নানামুখী উদ্দেশ্য ছিলো। যার মধ্যে প্রথম ও প্রধানতমটি হলো বাঙালির ঐতিহ্যকে নাগরিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
বৈশাখী মেলা কেবল ‘বৈশাখী মেলা নামেই নয়, আরও অনেক নামে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । এ মেলা কোথাও বর্ষবরণ মেলা কোথায় নববর্ষ মেলা কোথায়‘বান্নি মেলা নামে পরিচিত । বিভিন্ন জেলা শহরে ও গ্রামে বৈশাখী মেলার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
গ্রামীণ সমাজ থেকে বৈশাখী মেলা শুরু হলেও বর্তামানে এ মেলার উপকরণ ও উদযাপনে ভিন্নতা এসেছে। নাগরিক জীবনে পহেলা বৈশাখ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্তমানে আপনারা যাঁরা পঞ্চাশোর্ধ জীবন যাপন করছেন তারাই বৈশাখী মেলার প্রকৃত রূপ দেখতে পেয়েছেন। তাদের কাছে বৈশাখী মেলা উল্লেখযোগ্য স্মৃতি হিসেবে অক্ষত আছে। প্রবীণ লেখক মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ তাঁর বৈশাখী মেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন , ‘‘গরিব লোকেরা সারাবছর এই মেলার অপেক্ষা করতো। তাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিলো এসব মেলা। আমাদের গ্রামীণ মেলায় গান-বাজনা তুলনামূলক ভাবে কম হতো । গ্রামীন ও লোকজ সংস্কৃতির প্রদর্শনীর ব্যাপারটাই ছিলো প্রধান।’’
যে উপলক্ষেই মেলার আয়োজন করা হোক না কেন পণ্য পসরা ছাড়া মেলার কথা কল্পনাই করা যায় না । গ্রামীণ মেলার ঘর গেরস্থালীর দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী, শরীর রূপসজ্জা অঙ্গাভরনের বস্তু থেকে শিশু কিশোরদের আনন্দ ক্রীড়ার উপকরণ ও রসণালোভন খাবারের সমারোহ থাকে। এর প্রসঙ্গে একটি লোকগানের কথা মনে পড়ে গেলো, যেমন: ‘দাদা পায়ে পড়ি রে
মেলা থেকে বউ এন দে…’

এখানে অবোধ অনুজের বিশ্বাস মেলায় সব সামগ্রীই পাওয়া যায়। এমন কি ঘরের বউ তাও মেলায় অপ্রাপ্য নয়; ফলে অগ্রজের কাছে অনুজের এই কাতর প্রার্থনা।
উপলক্ষ যাই থাকুক না কেন মেলার একটা সার্বজনীন রূপ আছে। এই বৈশাখী মেলায় অংশগ্রহণে সম্প্রদায় বা ধর্মের ভিন্নতা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না । কেন না মেলার আর্থ-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সব কিছু ছাপিয়ে প্রকাশিত হয়। তাই বৈশাখী মেলায় সার্বজনীন মানুষের আনাগোনা থাকে। মৈত্রী সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র এই বৈশাখী মেলা।
বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ বৈভবে বাংলার উচ্চবিত্ত জমিদার মহাজন ও মধ্যবিত্ত সংস্কৃতবান হিন্দুসম্প্রদায়ের অবদান যে সর্বাধিক এ সত্য সর্বজন স্বীকৃত। বাংলার এই অভিজাত শ্রেণীর আনুকূল্যেই ধর্মীয় ও সামাজিক নানাবিধ উৎসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গ্রাম বাংলার অনেক মেলার আয়োজন হতো। বৈশাখের পুন্যাহ উপলক্ষেও সারা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠে মেলার সমারোহ। গ্রাম বাংলা ও শহরতলীতে বছরের বিভিন্ন মাসে যতো মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাতে সংখ্যার দিক থেকে বৈশাখী মেলাই হচ্ছে সর্বাধিক। বিসিকের এক জরিপসূত্রে জানতে পারা যায় যে, সারা বাংলাদেশে দু’শ বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। কোন কোন গবেষক বিসিকের এই তথ্যকে অসম্পূর্ণ বলেছেন এবং বৈশাখী মেলার সংখ্যা সারা বাংলাদেশে ছয় শতাধিক বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের এই অভিমত খুব একটা মিথ্যে বলা যাবে না । কারণ বাংলাদেশে মেলার সংখ্যা এখন দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের সুনামগঞ্জ তার বাস্তব প্রমাণ । আগে সুনামগঞ্জ খুব একটা মেলা দেখা যায়নি কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে।
আবহমান কাল থেকে বাংলার পেশাভিত্তিক কতিপয় শ্রেণীর মানুষ লোকশিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলছেন। কুমার, কামার, ছুতার, মালাকার যাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেকযোগ্য। এসব পেশাজীব মানুষেরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার ও চিত্তবিনোদনের উপযোগী নানা ধরনের শিল্প-সম্ভার তৈরি করে এবং সেসব শিল্পদ্রব্য বিক্রয়ের জন্য লোকমেলায় উপস্থিত করে থাকে।
লোকজীবনে লোকসঙ্গীতের সৃষ্টি হয় যেমন স্বতস্ফুর্ত প্রাণাবেগে; লোকবাদ্যযন্ত্রের নির্মাণও ঘটে অনেকটা অনায়াস প্রয়াসে।
ক্ষণস্থায়ী এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয় কাঠ, বাঁশ, লাউয়ের খোল ও শক্ত মাটিরপাত্র যোগে। লোকবাদ্যযন্ত্র হিসেবে লোকমেলায় দেখতে পাওয়া যায়- শিঙা, শঙ্খ, সানাই, করতাল, ঢোল, মাদল, কাঁসর, ডুগডুগি, একতারা, দোতারা, বাঁশি প্রভৃতি।
পান্তা, ইলিশ ভাজা ছাড়াও বৈশাখী মেলায় থাকে- মোয়া, মুড়কি, বিভিন্ন ধরনের খৈ, ঝুড়ি, নাড়– প্রভূতি। এছাড়াও বৈশাখী মেলায় এসব খাবারের পাশাপাশি বর্তমানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের চটপটি সহ বাহারি ফলের আচারও।
সুপ্রাচীন কাল থেকে বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হিসেবে হাডুডু (কাবাডি) ও লাঠিখেলা লোকক্রীড়ার মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে । বর্তমানে চট্রগ্রামে চালু হয়েছেÑ‘বলীখেলা’।
বৈশাখী মেলা উপলক্ষে রাজশাহী আঞ্চলের গম্ভীরায় পরিবেশিত নানা-নাতির ‘রসিক নৃত্য’ আলকাফের ‘ঝুমুর নৃত্য’ লাঠি খেলার সময় লাঠিখেলোয়ারের ‘লাঠিনৃত্য’ ঢাকিনৃত্য’ বাউল সঙ্গীত পরিবেশনের সময় বাউলের মৃদু-মন্দ কোমর দোলায়িত লঘুনৃত্য’ যাত্রামঞ্চের‘উদ্দাম নৃত্য’ হচ্ছে বৈশাখী মেলার লোকনৃত্যের মধ্যে অন্যতম।
কিছু কিছু মেলা বেশ প্রাচীন ও আদৃত। ঐতিহ্যবাহীও বটে। চট্রগ্রামে বৈশাখী মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে ‘জব্বারের বলি খেলা। এই বলি খেলা দেখতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে সমবেত হয় অসংখ্য মানুষ। চৈত্রের শেষে চট্রগ্রামের বৌদ্ধসম্প্রদায় আয়োজন করে ‘মহামুনির মেলা’। এই মেলা বর্ষবরণেরই একটা অংশ। চট্রগ্রামের আদিবাসী মারমা, চাকমা, ও ত্রিপুরাদের বর্ষবরণ উৎসব পরিচিত সাংগ্রাই, বিজু বা বিহু নামে। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলা গ্রামের বৈশাখী মেলা একটি দেশ বিখ্যাত মেলা হিসেবে পরিচিত। উত্তরবঙ্গের উল্লেখযোগ্য বৈশাখী মেলার মধ্যে দিনাজপুর আমবাড়ি মেলা ,বগুড়ার গাঙনগর মেলা, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির শীতলী মেলা , রংপুর জেলার সিন্দুরমতি মেলা, যশোরের নিশিনাথতলার মেলা ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বিত্তিপাড়ায় ঘোড়াপীরের আস্তানায় ওরস উপলক্ষে বৈশাখ মাসে বিশেষ মেলা বসে । এই মেলা চলে মাসব্যাপি। বরিশালে বাকালের মেলাও বিখ্যাত। এমন অসংখ্য মেলায় মুখরিত থাকে বাংলাদেশের এই নববর্ষের দিনগুলো।
বর্তমানে বৈশাখী মেলা আমাদের ঐতিহ্য ও চেতনার অংশ হয়ে ওঠেছে। বর্ষবরণকে ঘিরে নানামুখী আয়োজন। তার প্রধান বৈশাখী মেলা। এই মেলা এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশেও বেড়েছে তার ব্যাপ্তি। বর্তমানে বর্ষবরণ ঘিরে বাঙালির অন্যতম লোক উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রাণের এই উৎসবে রয়েছে সুদীর্ঘ এক ইতিহাস।
বাংলার এই জনপদে পয়লা বৈশাখে বাংলা সনের প্রবর্তনের সময় থেকেই নববর্ষের সূচনা হয়েছে । অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরি সনের ২৮ রবিউল আখের মোতাবেক ১০ অথবা ১১ মার্চ ১৫৫৬ খ্রি. থেকে বাংলা সন গণনার তারিখ কার্যকর করা হয়েছিল। এই সন প্রবর্তনের পূর্বেও বঙ্গদেশে লক্ষণসেন প্রচলিত গণনা পদ্ধতি বলবত ছিলো। স্বয়ং আকবরনামায় এর প্রমাণ পাওয়া যায় । নববর্ষের ঐতিহ্যগতভাবে বৈশাখী মেলা , খেলাধুলা , গঙ্গা ¯œান, পুন্যাহ, হালখাতা, ঘোড়াদৌড়, ভূমিকর্ষণ, নতুন পোষাক পরিচ্ছেদ, নৃত্য, যাত্রাপালা ইত্যাদির আয়োজন করা হয় । এগুলো এখন নববর্ষের ঐতিহ্যিক বৈশিষ্ট্যে পরিচিত হয়েছে।

পহেলা বৈশাখ, বাঙালির নববর্ষ। বাঙালির নববর্ষের এই প্রথম দিনটির সব উপকরণ ও উজ্জলতা যেন উৎসব হয়ে ধরা দেয়, আনন্দঘন এক নতুন রঙের আবাহনে। প্রতিবছরই নববর্ষে বৈশাখী উৎসবের সাথে বৈশাখী মেলা যেন একই সূত্রে গাঁথা রয়েছে। বৈশাখী মেলা ছাড়া এই দিনটির কথা এবং সব ধরনের আয়োজন যেন অপূর্ণই থেকে যায়। অসাম্প্রদায়িক এক মহা মিলনের অবগাহন করে। একই সমতলে সমবেত হওয়ার প্রেরণা জুগায়, বাংলা নববর্ষের এই বৈশাখী মেলা। বাঙালি ও মেলা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ । বৈশাখী মেলা বাঙালির সার্বজনীন উৎসবের এক ভগ্নাংশ মাত্র। বর্তমানে এটি একটি লোক উৎসবে পরিণত হয়েছে সারা বাংলাদেশ। পরিশেষে বলা যায়,‘বৈশাখী মেলা বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির আয়না বিশেষ।

তথ্যসূত্র:
আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ সম্পাদিত
নববর্ষ ও বাংলার লোক-সংস্কৃতি
ইন্টারনেট
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক