ভরা বর্ষায় ধানের দাম নেই- কৃষকরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ

বিন্দু তালুকদার
বৈশাখ-জৈষ্ঠের পর আষাঢ় মাস প্রায় শেষ হওয়ার পথে। জেলার ছোট-বড় সকল হাওরেই নৌ চলাচল করছে। হাওরে পানি হওয়ায় সারাদেশেই নৌপথে ধান পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভরা বর্ষায়ও ধানের প্রকৃত মূল্য পাচ্ছেন না হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
বর্ষাকালে খোলাবাজারে ধানের প্রকৃত দাম না পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে বিরাজ করছে হতাশা আর ক্ষোভ। সরকারিভাবে খাদ্য গোদমে কৃষি কার্ডধারী কৃষকদের কাছ থেকে ২৬ টাকা কেজি দরে প্রতি মণ ধান ১০৪০ টায় ক্রয় করা হচ্ছে। জেলায় ৩ লাখের উপরে কৃষক রয়েছে কিন্তু ধান কেনা হচ্ছে মাত্র ৬ হাজার কৃষকের কাছ থেকে ১ মে. টন করে ৬ হাজার মে.টন। এতে করে অধিকাংশ কৃষক গ্রামে ধান বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সরকারি খাদ্য গোদামে জেলার ১১ উপজেলায় ১৫০০ মে. টন ধান কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছে।
হাওরপাড়ের বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামে ধান কেনা-বেচা হচ্ছে কোথাও ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা মণ, আবার কোথায় ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা মণ হিসেবে। জামালগঞ্জ, দিরাই, শাল্লায় মোটা ধান ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, চিকন ধান ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। মধ্যনগর বাজারে ৮০০ টাকা করে চিকন ধান কেনা বেচা হচ্ছে। আবার যাদের ধানে দু’একটা চারা গজিয়েছিল বা ধানের গায়ের রং একটু কাল সেই ধান আরো কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের মুছাপুর গ্রামের কৃষক ও মৌসুমী ধান ব্যবসায়ী বিষ্ণুপদ বৈষ্ণব বলেন,‘ ভরা বর্ষায় ধানের দাম বাড়ার কথা, কারণ নৌকায় হাওরের ধান পরিবহন করতে সুবিধা হয়। কিন্তু এই বছর চলছে উল্টো, এখন ধানের দাম বাড়ার পরিবর্তে কমছে। কেন ধানের দাম কম ভেবে পাই না। দেশের অন্যতম ধান-চালের বাজার আশুগঞ্জেই ধানের দাম কম। ৫০০ মণ ধান পেয়েছি, অন্তত ৪০০ মণই বিক্রি করতে হবে। কিন্তু ধানের দাম নেই, কিছুদিন আগে একটু বেশী ছিল। এখন আবার ধানের দাম কমে গেছে। কষ্ট করে জমি করে কী লাভ ? ’
তিনি জানান, দিরাই-শাল্লায় চিকন ধান দুই সপ্তাহ আগে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল এখন বাজার দর ৬৫০-৬৬০ টাকা, মোটা ধান প্রতিমণ ৭০০ টাকার স্থলে ৬০০-৬২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
একই উপজেলার হবিবপুর গ্রামের গৃহস্থ জগদীশ পুরকায়স্থ বলেন,‘ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে এবছর। ২০০ মণ ধান পেয়েছি। ১০০ মণ বিক্রি করব। কিন্তু এখন ধানের দাম কমছে। ধান চাষ করে আমরা কী করব, জমি করতে খরচ বেশী, উল্টোদিকে ধানের দাম কম থাকে সব সময়। ’
দিরাই উপজেলার কালীকুটা হাওরপাড়ের রফিনগর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হাসান বলেন,‘ধান করে কৃষকরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েন। ধান চাষাবাদে আগের চেয়ে খরচ অনেক বেড়েছে। ধান কাটার সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না। রোদ না থাকলে ধান পচে নষ্ট হয়। এরপর বিক্রির সময় কৃষকরা প্রকৃত দামও পায় না। সরকারি গোদামে হাতেগুণা কিছু লোক ধান বিক্রির সুযোগ পেলেও অধিকাংশ কৃষকই বাড়িতে ধান বিক্রি করেন। চিকন ধান ৭৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মণ ও মোট ধান ৬০০-৬৫০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। তবে ধান পাইকারদের মধ্যে আবার সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা ইচ্ছাখুশি দাম কমায়-বাড়ায়।’
এদিকে সুনামগঞ্জের সর্ববৃহৎ ধানের আড়ৎ মধ্যনগর বাজারেও বর্ষাকালে ধানের প্রকৃতমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। মধ্যনগর এলাকায় ধানের ছোট পাইকারদের মধ্যেও সিন্ডিকেট রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মধ্যনগর সদর ইউনিয়নের মাছিমপুর গ্রামের বাসিন্দা আনিসুল হক বলেন,‘ধানের দাম কম থাকার নানা কারণ রয়েছে। শীর্ষ ব্যবসায়ীদের নানা কৌশল রয়েছে। হাওর এলাকার ধান পাইকার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রয়েছে। তারাও ধানের দাম কম রাখার চেষ্টা করেন। কৃষকরা কষ্ট করে ধান ফলিয়ে কোন সময়েই সঠিক দাম পায় না। ’
মধ্যনগর বাজারের ধানের আড়ৎদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুকি ট্রেডার্সের প্রোপাইটর মাহবুবুল আলম ফারুকি বলেন,‘ মধ্যনগরে দাম কমানোর কোন সিন্ডিকেট নেই, বিভিন্ন কারণে এবছর ধানের দাম কিছুটা কম। বৈশাখে বৃষ্টিপাতের কারণে সুনামগঞ্জের ধানের গুণগত মান কিছুটা কমেছে এবং বাইরের ধান ক্রেতা এখন আগের মত আসে না। বড় ব্যবসায়ীদের টাকা মওজুদকৃত চালে আটকা রয়েছে। একসময় আশুগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, নারায়নগঞ্জ থেকে পাইকাররা আসত ধান ক্রয় করতে। এখন তাদের এলাকায়ই কম দামে ধান ক্রয় করতে পারেন। এখন বাজারে প্রতি মণ চিকন ধান ৮০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।’ তবে সাধারণ কৃষকদের প্রয়োজনে ধানের দাম অন্তত ১০০০ টাকা মণ হওয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করেন তিনি।