ভাটির হাওরের সিংহপুরুষ শহিদ জগৎজ্যোতি দাস

অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ‘দাস পার্টি’ ছিলো পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। জগৎজ্যোতি ছিলেন সেই ‘দাস পাটির্’র নেতা। মুক্তিযুদ্ধে ভাটি এলাকায় মানুষের মুখে মুখে ছিলো ‘দাস পার্টি’র বীরত্বের কাহিনি। অসংখ্য লড়াইয়ে শত্রুকে ধরাশায়ী করেছেন জ্যোতি। এমনই এক সম্মুখ লড়াইয়ে জগৎজ্যোতি আত্মাহুতি দেন। শত্রুরা তার প্রাণহীন দেহ নিয়ে মেতে উঠে উন্মত্ত খেলায়। খুঁটির সাথে পেরেক ঢুকিয়ে তাকে টাঙ্গিয়ে রাখে ২ দিন। মুক্তিযুদ্ধে জ্যোতির বীরতের¡ জন্য পরাধীন দেশের অস্থায়ী সরকার সর্বোচ্চ খেতাব দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো। জগৎজ্যোতি তার কথা রেখেছেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা এতে দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীন দেশের স্থায়ী সরকার কথা রাখেনি।
হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ থানার জলসুখা গ্রামে জগৎজ্যোতি ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-জিতেন্দ্র কুমার দাস, মাতা-হরিমতি দাস। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আদরের জ্যোতিই সবার ছোট। সবাই আদর করে ডাকতো শ্যাম বলে। রাজমিস্ত্রি বাবার অভাবের সংসার, তবু জ্যোতি প্রাইমারি পেরিয়ে স্থানীয় বিরাট গ্রামে ‘আজমিরিগঞ্জ বীরচরণ হাইস্কুল’ থেকে ১৯৬৮ সনে দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। ন¤্র-ভদ্র আচরণের জন্য শিক্ষকসহ গ্রামের সবাই তাকে ¯েœহ করতেন। অভাবের সংসার, আর তো সামর্থ্য নেই, বাপ-ভাইয়ের ইচ্ছা চাকুরিতে ঢুকে সংসারের হাল ধরতে। কিন্তু জগৎজ্যোতির মনে অন্য আগুন জ¦লছে। তাই ভাবলেন আরও লেখাপড়া করতে হবে। বিরাট হাইস্কুলে পড়ার সময়ই জগৎজ্যোতি শরিফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে স্থানীয় ছাত্র আন্দোলন করে বামধারার সকল নেতাদের চোখে খুচা দেন, তখন তাঁর বয়স হলেই আর কত হবে। এসময় আসামে লিখা চিঠির কাকার প্রত্যুত্তর জীরনের নতুন দিগন্ত খুলে যায়। বাবা-ভাই বাধা দেন নাই। আসাম পৌঁছার খরচ মাসি ষাট টাকা দেন। নওগাঁ কলেজে ভর্তি হয়ে জ্যোতি এইচএসসি পাশ করেন। হঠাৎ কাকা মারা যাওয়ায় আবারও জ্যোতির জীবনে ছন্দপতন ঘটে। শিলচরে পিসততু ভাই হারান চন্দ্র দাস সেনাবাহিনীতে চাকুরি করেন। বিএ পড়ার অদম্য ইচ্ছা জ্যোতির তবু হারানদার মন রক্ষার্থে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে হিন্দি ও ইংবেজি ভাষাটা ভালো করে রপ্ত করেন যা পরবর্তী জীবনে খ্যাতি এনে দিয়েছিলো। প্রশিক্ষণ শেষ, তবে চাকুরিতে যোগদানের দু’দিন আগে জ্যোতি সোজা আজমিরিগঞ্জ চলে এসে হারানদাকে চিঠিতে জানান আমি বিএ পাশ করতে চাই এখনই চাকুরিতে আবদ্ধ হতে চাই না। আবার সাথী হন বাল্যবন্ধু ‘আজাদ’। আজাদের মামা ন্যাপনেতা ডা: তৈয়ুবুর রহমান ও কৃষকনেতা মো: মঈন উদ্দিন তাদের বাম রাজনৈতিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতেন। জলসুখা গ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের একটি সক্রিয় গ্রুপ ছিলো। জগৎজ্যোতি, আজাদ, আব্দুর রশিদ, সুকুমার, আজিজুর রহমান, পিন্টু ভট্টাচার্য ও সুভাষ এই গ্রুপে ছিলো। এই গ্রুপটি বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন ছাড়াও প্রগতিশীল যুবকদের বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালাত। এছাড়া আর্থিক ফান্ড গঠনে সম্মিলিতভাবে আজমিরি, বানিয়াচং, শাল্লা, দিরাই, সুনামগঞ্জ পর্য়ন্ত সচ্ছল ব্যক্তিদের কাছে অর্থসংগ্রহ করতো। এভাবেই জ্যোতির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া এবং পরবর্তী জীবনের সকল কর্মকান্ড চিন্তা-চেতনার ধারাবাহিকতা। কিন্তু নিজের আর্থিক অবস্থার জন্য অগত্যা স্থানীয় ‘কৃষ্ণগোবিন্দ পাবলিক হাইস্কুলে’ ৭৫ টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। তাও মূল কাজে রেহাই নেই, একবার স্থানীয় জমিদারের দখল থেকে খাস জমি উদ্ধারে তাঁর গ্রুপ তৎপরতা শুরু করে। জমিদারের প্রভাবশালী লোকজন একদিন একা পেয়ে তাকে আক্রমণ করলে খালি হাতে একাই সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করেন। আজমিরি এলাকায় বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং জ্যোতি অপ্রতিরোধ্য ‘ছাত্রনেতা’য় পরিণত হন। আসলে জীবনযুদ্ধই জ্যোতিকে জীবনসংগ্রামী করে তুলেছে যা পরবর্তী জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু বি এ পাশ করা, উচ্চশিক্ষার কী হবে ? তাই কিছু টাকা জমিয়ে প্রথমে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে ও পরে সুনামগঞ্জ কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন।
জাতির সামনে দাঁড়িয়ে গেলো মুক্তিসংগ্রাম। কী আর করা মক্তিযুদ্ধকে জীবনযুদ্ধ বলে ঝাঁপিয়ে পড়াই নিজের কর্তব্য বলে ধরে নিলেন। জ্যোতি ‘৭১’র উন্মাতাল দিনে সুনামগঞ্জে ছাত্র ইউনিয়নের একজন প্রথম সারির কর্মী হিসেবে শহরের সকল আন্দোলন সংগ্রামের কর্মসূচিতে অগ্রভাগে থাকেন। সকলের আগে তাঁর কণ্ঠেই মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ ধ্বণিত হয়। তাঁর দ্রোহী মন উপযুক্ত সময়ে নতুন একটি দেশের স্বপ্নে বিভোর হযে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ পর্বে সুনামগঞ্জের সকল মিছিল মিটিং র‌্যালি শোভাযাত্রায় তাঁর সক্রিয় প্রচেষ্টা ও উপস্থিতি ছিলো সবার কাছে আকর্ষণীয়, প্রশংসনীয়। এবার ‘দেশের ডাক’ মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। চলে যান গ্রামের বাড়ি আজমিরিগঞ্জের জলসুখায়। মা’কে প্রণাম করে ‘মা আবার তোমাকে দেখতে আসবো স্বাধীন দেশে’ বলে বিদায় নেন। বাবা জিতেন দাস, বড়ভাই জীবনানন্দ দাস হতবাকের মত পাশে দাঁড়িয়ে সায় জানান। সহজ সরল অবুঝ মা’ বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না-জড়িত কণ্ঠে বিদায় দেন, আশীর্বাদ করে বলেন তোমাদের মঙ্গল হোক। এটাই মা’র সঙ্গে নাড়ীছেড়া ধন জগৎজ্যোতির শেষ দেখা শেষ কথা।
স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধারা বালাট চলে যান। সেখান থেকে ১১৪ জনের যে দলটিকে শিলঙয়ের গভীর অরণ্যে প্রশিক্ষণে প্রেরণ করা হয় তার নেতৃত্বে ছিলেন জগৎজ্যোতি দাস। মোট ৩২ দিনের ট্রেনিং পর্বে জগৎজ্যোতির মন ছিলো খুব উৎফুল্ল, দলের সবাই বয়সে তরুণ। তিনি দলের সহযোদ্ধাদের প্রতিনিয়ত একটি নতুন দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে উজ্জীবিত রাখতেন। ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে তাকে ইকো-১ ট্রেনিং সেন্টারে সার্জেন্টের মত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। ট্রেনিং শেষে দলটিকে তিনভাগে ভাগ করে জ্যোতির নেতৃত্বধীন দলটি বালাট দিয়ে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে এসে পৌঁছে। এই সেক্টরের অধীনস্থ এলাকা– দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোণার আংশিক। বিভিন্ন ইউনিট স্ব-স্ব নির্দেশিত এলাকায় অভিযানে যেতে প্রস্তুত হয়।
জগৎজ্যোতির মুক্তিযুদ্ধে যোগদান কোনো কাকতালিয় ঘটনা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। শৈশব কৈশোরের দীক্ষা ও পরবর্তীর বৃহত্তর জীবনের আলোক রশ্মি ছিলো তার চেতনায় গ্রথিত মুক্তির প্রসব বেদনা। সুনামগঞ্জে জগৎজ্যোতি ছিলো ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় কর্মী ও তখনকার সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এ ছাড়াও হাওর-নদী বেষ্টিত ভাটি অঞ্চল আজমিরিগঞ্জে জগৎজ্যোতির গ্রাম জলসুখা ছিলো বৃটিশ আমল থেকেই একটি নামজাদা ও বিখ্যাত জনপদ। তাঁর গ্রামে দু’জন ভারত বিখ্যাত লোক খনিজ সম্পদ গবেষণাবিদ স্বদেশপ্রেমী রমাকান্ত রায় ও শিক্ষবিদ সতীশ চন্দ্র রায়ের জন্ম। রমাকান্ত রায় এই হাওর এলাকার ভূ-গর্ভে অমূল্য খনিজ সম্পদ আছে মনে করতেন এবং স্ব-উদ্যোগেই অনেক গবেষণা করেছেন। এ অঞ্চলে সতীশ রায়ই কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকায় শীর্ষস্থান অধিকার করা প্রথম ছাত্র। পরে মেধার স্বীকৃতি স¦রূপ ১৯০৬ সনে বিখ্যাত ‘বলাইচাঁদ’ পুরস্কার পান এবং ১৯০৯ সনে ‘সুরমা উপত্যকা রাষ্ট্রীয় সমিতি’র এক সভায় প্রধান বক্তা হয়ে ঋষি অরবিন্দ আসেন এই গ্রামে।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় তখন আজমিরিগঞ্জ এলাকাটি এমন হয়েছে- না যাওয়া যায় সহজে জেলা শহর হবিগঞ্জে না সুনামগঞ্জে। কিন্তু তখনকার আজমিরিগঞ্জ ছিলো এ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ নৌ-বন্দর। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো জলপথে, জাহাজ-স্টিমারে কলকাতা-শিলচর এবং সুনামগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে হবিগঞ্জ সিলেটের অপরাপর জেলা থেকে আলাদা, অনেক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বÑ বিপিন পাল, বিপ্লবী ঠাকুর দয়ানন্দ, মহেন্দ্র নাথ দে, হেমাঙ্গ বিশ^াস, হেনা দাশ, বারীণ দত্ত, সি আর দত্ত এমন সব মানুষের জন্ম হবিগঞ্জে। কমরেড লালমোহন রায়ের মুখে এই জলসুখা গ্রাম ও এলাকার অনেক স্মৃতিকথায় এইসব ব্যক্তিত্বের কাহিনী জানা যায়। তিনি জলসুখায় থেকে লেখাপড়া করেছেন পরে পার্টির কর্মী হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মগোপন অবস্থায় আজমিরিগঞ্জ, লাখাই, কুলাউড়া, দাশেরবাজার এসব স্থানে ঘুরে ঘুরে কৃষক সমিতিতে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজ করতেন। তাঁরই সৃষ্টি জলসুখার মো: মঈন উদ্দিন ও ন্যাপনেতা ডা: তৈয়ুবুর রহমান ছিলেন জগৎজ্যোতির দীক্ষাগুরু।
জগৎজ্যোতি আজমিরিগঞ্জের বিরাট “বীরচন্দ্র হাইস্কুল” এ পড়া অবস্থায়ই ‘শরীফ কমিশন’ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এ ছাড়াও অনেক ছাত্র আন্দোলন সেখানে গড়ে তুলেছেন ফলে এলাকায় অনেক সুখ্যাতি ছড়ায়। তার পেছনে প্রেরণায় ছিলেন গ্রামেরই দুই নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিত্ব। তাই একথা তো বলাই যায় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া, নিজেকে আত্মোৎসর্গ করা জগৎজ্যোতির ভিতরের সুপ্ত অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ তা তার স্থানীক ও কালিক উত্তরাধিকারেরই বহিঃপ্রকাশ। উদাহরণস্বরূপ যদি বলা যায় রবীন্দ্রনাথ যেমন মুকুন্দ রাম-ভারতচন্দ্র- ঈশ^রগুপ্ত-বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-মধুসূদন-বিহারী লালের উত্তরাধিকারী। তেমনি তিল তিল করে এই ভাটির জলাভূমির আবেশই হাসন-করিম, জগৎজ্যোতিদের জন্ম দিয়েছে। কেউ জনমনের চাপাকান্না তুলে ধরেছেন, কেউ জীবনের বিনিময়ে স্বাধীন মাতৃভূমি দিয়ে গেছেন, সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে তাঁকে যেতেই হতো শহিদ হতেই হতো, তা বিধিলিপি নয়Ñ অবশ্যাম্ভাবী।
‘মুক্তিযুদ্ধে দাসপার্টি’ কেন একটি প্ল্যাটুনের নাম হলো তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক। বড় মাপের অনেক মুক্তিযোদ্ধার কাছেও এর কোন ইতিহাস জানা যায়নি। জগৎজ্যোতির চটপটে চলাফেরা তার পূর্বের অভিজ্ঞতায় অনর্গল হিন্দি-ইংরেজিতে ভারতীয় বাহিনীর সাথে কথা বলা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো এবং সবার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তাকে ‘দাস’ বলে সম্বোধন করতে করতেই পরবর্তীর জগৎজ্যোতির সহকর্মী মানেই ‘দাসপার্টি’র লোক। এভাবেই নামটি ‘ফায়ারিং স্কোয়ার্ড দাস-পার্টি’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় বলে সহযোদ্ধাদের অভিমত। ১৪ জন নিয়ে ট্রেনিং করলেও ‘দাসপার্টি’র সদস্য সংখ্যা ৪২-৫০ জনে পৌঁছে। আজমিরিগঞ্জ জলময় অঞ্চলটি ৪, ৫ এবং ১১ নম্বর সেক্টরের মাঝে সুরমা-কালনী-কুশিয়ারা নদী বেষ্টিত একটি জটিল ও নৌপথের ঘুর্ণায়মান এলাকা। উত্তর-পূর্বে ছাতক, জগন্নাথপুর, শেরপুর ইত্যাদি, পশ্চিম-দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোণার বিভিন্ন থানা ও উত্তর-পশ্চিমে শাল্লা, দিরাই, জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদর, ধর্মপাশা, তাহিরপুর এইসব জায়গাজুড়ে এক ভয়ঙ্কর বিস্তীর্ণ জলরাশি ভেদ করে জগৎজ্যোতি কখনও তার নিজস্ব ৫ নং সেক্টরে, কখনও ৪ নং সেক্টরে পাশে ১১ নং সেক্টরের বিভিন্ন ভিটে প্রত্যেকের সাহায্যে প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হয়েছে, কখনও ক্রস-ফায়ার ক্রস-কমিউনিকেশনেরও ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনাকে মাথায় রাখতে হয়েছে।
জগৎজ্যোতি জলময় নদী-বিল- হাওরে বেড়ে ওঠা তরুণ, মক্তিযুদ্ধের শত্রু নিধনে ট্রেনিং এর বাইরে নিজস্ব ও পূর্ব-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সবাইকে অবাক করে শত্রু পক্ষকে ঘায়েল করেছেন। ভেরামোহনার শত্রুবাহিনীর রসদবাহী কার্গো ধ্বংসের সময় ডুবদিয়ে ‘লিম্পপেট’ না লাগিয়ে নদীর এক পাড়ে পানির নিচে একটি খুঁটি ও ওপর পাড়ে অন্য খুঁটিতে বড় ধরনের শক্ত একটি রশিতে পাঁচ পাঁচটি ‘এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন’ ঝুলিয়ে মাইন ডেটোনেটরের স্থলে ‘পিইকে-১’ ভর্তি করে কার্ডেক্স সিরিজ কানেকশন দিতে সহকর্মীকে নির্দেশ দেন। কার্ডেক্সের শেষপ্রান্তে ডেটোনেটর ও তার মুখে সেফটি ফিউজের সংযোগ দিয়ে দেন। বার্জ রশিতে ধাক্কা লাগা মাত্রই মাইন সিরিজের ফিউজে সেফটি ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। মুহূর্তেই বিস্ফোরণে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যায় গানবোট। ভাটির হাওরের পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছাড়া অন্য এলাকায় অভ্যস্ত কেউ এমনটা চিন্তাই করতে পারতো না।
দিরাই রাস্তায় বদরপুর ব্রিজ ধ্বংসে কমান্ডো নির্দেশ পেয়েও নিজস্ব পদ্ধতি কাজে লাগিয়েছেন। ব্রিজের দু’পাশে দু’দল রাজাকারের পাহারা, একদিকে কায়দা করে একটু কাছে ভিড়ে নিজের দলের একজনকে মেয়েলি কণ্ঠে কান্না করতে পরামর্শ দেন। মেয়ে কণ্ঠ শুনে রাজাকারের দল এগিয়ে এলেই অস্ত্র তাক করে তাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বেঁধে পোশাক পাল্টিয়ে দু’জন মুক্তিকে সেই পোশাক পড়িয়ে ব্রিজে পাহারা দিতে নির্দেশ দেন। এই সুযোগে ব্রিজে বিস্ফোরক সংযুক্ত করে জোরে জোরে রাজাকারদের সুরে কথা বলতে থাকেন, অন্যপাশের রাজাকাররা পাহারায় অমনোযোগী মনে করে ব্রিজে জড়ো হতেই ‘সেফটি ফিউজ’ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্রিজটি ধ্বংস করেন। কিন্তু আফসোস থাকে কথা থাকলেও অনেক অপেক্ষার পরও পাকসেনারা আসে নাই।
জামালগঞ্জের দ্বিতীয় অপারেশনেও এমনি নিজস্ব বুদ্ধি খাটিয়ে ‘পাকসেনাদের বাঙ্কারের প্রায় কাছে পর্যন্ত হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে স্থানীয় ভাষায়-‘আমারে মাইরা লাইছে রে’ বলে আর্তচিৎকার করে খানসেনাদের বোকা বানিয়ে মুহুর্মুহু গ্রেনেড ছুড়ে বাঙ্কারে জড়ো হওয়া বহু আর্মিকে নিধন করেন। এই অপারেশনগুলির জন্য সেক্টর কমান্ডারসহ ভারতীয় মেজর ভাট জগৎজ্যোতিকে আন্তরিক প্রশংসা করেন ও ক’দিন বিশ্রামে থাকার নির্দেন দেন।
জগৎজ্যোতি (শাল্লা-২, দিরাই-৪, তাহিরপুর-২, বানিয়াচং-৪, জামালগঞ্জ, খালিয়জুরি, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ সদরসহ) ষোলটি সফল অভিযান করেছেন। যার অনেকগুলি অভিযান সেক্টর কমান্ডার-মিত্রবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজরেরও কল্পনার অতীত। সতেরো’তে শেষ অভিযানটি তাঁর নিজ এলাকায় আজমিরিগঞ্জের বদলপুর ইউনিয়নের খৈয়াগুপি বিলে নিজ জন্মমাটিতেই আত্মাহুতি দিতে হয়। ‘দাসবাহিনী’র কাছে খবর ছিলো দিরাই-মার্কলী নদীপথে বার্জে পাক-সেনাদের রসদ যাবে। আগে থেকেই ছক করে যথাসময়ে বার্জ আক্রমণ করে, অনেক মালামলের সাথে ১৩/১৪ বছরের একটি কিশোরকে উদ্ধার করে ‘জ্যোতি’ তাকে সাথে করে নেন এবং গচিয়ার কাছে বার্জটি ডুবিয়ে দেন।
কিন্তু পরবর্তী শেষ অপারেশনটিতে নিজভূমে একটু ভুলের জন্য আজমিরিগঞ্জের তথা মুক্তিযুদ্ধের গর্ব জগৎজ্যোতির প্রাণ-প্রদীপ নিভে গেলো। ১৫ নভেম্বর ‘৭১ জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানার অন্তর্গত টেকেরঘাট সাব-সেক্টর থেকে নৌকাযোগে একদল মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র-শস্ত্র রসদ নিয়ে বানিয়াচং-আজমিরির দিকে রওয়ান হয়ে ১৬ নভেম্বর সকালে বদলপুর পৌঁছান। লক্ষস্থলে পৌঁছেই ‘জ্যোতি’ দেখতে পান তিন-চারজন রাজাকার ব্যবসায়ীদের নৌকা থেকে চাঁদা তুলছে। ক্ষুব্ধ হয়ে জ্যোতি এদের ধরে আনার নির্দেশ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেই ওরা পিছু হটতে শুরু করে। তখন নিজেই তাঁর দলবল নিয়ে রাজাকারদের তাড়া করে অনেক ভিতরে চলে যান। অপরদিকে পাকসেনাদের একটি বিশাল বহর অস্ত্র-শস্ত্র গোলাবরুদ নিয়ে ঘাপটি মেরে একটি নিরাপদ স্থানে অপেক্ষা করছিলো। আসলে চাঁদা তুলা পিছু হটা ছিলো তাদের একটা কৌশল। এভাবে মুক্তিযোদ্ধা দলটিকে অনেক ভিতরে ব্যুহের মধ্যে নিয়ে যায় রাজাকার-পাকসেনারা।
কিন্তু পেছানোর উপায় নেই, শুরু হয় সামান্য গোলা-বারুদ নিয়ে দাস-পার্টির সঙ্গে প্রশিক্ষিত পাক-বাহিনীর বিশাল বহরের এক অসম যুদ্ধ। গোলা-বারুদ কমে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়ে যায় দলটি। পাক-বাহিনীর আক্রমণে এক সময়ে টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় দাস-পার্টির সদস্যরা। এক পর্যায়ে তার সদস্যদের ফিরে যাবার নির্দেশ দেন কিন্তু তিনজন সহযোদ্ধা তাকে অনুসরণ করে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একটি এলএমজি, একটি এসএমজি দিয়ে কী আর করা যায় তবু ১৩ জন সহযোদ্ধা নিরাপদে পৌঁঁছা পর্যন্ত তার বেঁচে থাকতে হবে চিন্তা করেও শেষ রক্ষা হলো না। সাবাইকে পালাতে নির্দেশ দিলেও প্রাণ-প্রিয় ইলিয়াস চৌধুরী শেষ পর্যন্ত সঙ্গ ছাড়েননি। ইলিযাসের পাঁজরে গুলি লাগলে জ্যোতি নিজের মাথার গামছা দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চেপে বাঁধেন, বললেন পারলে আমাকে মেগাজিন ভরে দাও। এক পর্যায়ে আশপাশের অবস্থান দেখতে মাথা তুলতেই একটি গুলি ‘জগৎজ্যোতি’র চোখ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ‘আমি যাইগা’ বলে চিৎকার দিয়েই নিরব হয়ে যান। এভাবেই ‘ভাটির সিংহ-পুরুষ, হাওরের অমৃত-পুত্রে, মা’য়ের নাড়িছেড়া ধন’ জ্যোতিÑশ্যাম’র সলিল সমাধি হয়। ইলিয়াস জ্যোতির লাশটা কাঁদায় ডুবিয়ে লুকিয়ে অনেক কষ্টে নিরাপদে চলে যেতে চেষ্টা করেন। সব শেষ হয়ে গেলো। স্বাধীন দেশে মা’কে আর দেখা হলো না। পরদিন নাকি লাশটা কাদা থেকে তুলে নৌকার গলইয়ে করে ঘাটে ঘাটে রাজাকারেরা প্রদর্শন করিয়েছে, পরে আজমিরিগঞ্জ বাজারে পাকিস্তানের বিপক্ষে গেলে কী দশা হয় লোকশিক্ষা দিয়েছে, মানুষকে বুঝিয়েছে। কথায় বলে নাÑ‘হাতিরও পিছলে পা, সুজনেরও ডুবে না (নাও)। দয়া দেখাতে গিয়ে সেদিনের সেই কিশোরটিই নাকি ‘জ্যোতি’র পরবর্তী অভিযান বদলপুুেরর জন্য কাল হয়েছিলো। এই ছেলের বাবা পাকিদের বার্তাবাহক, বেশদিন পর ছেলেটিকে তার বাবা ফিরিয়ে নেয় এবং ছেলেটির কাছ থেকে পরের অভিযানের সমস্ত পরিকল্পনা আন্দাজ করে নেয়। নয়তো জগৎজ্যোতির ছেলেবেলার যে দূরন্তপনার কথা শুনা যায় তাতে তাঁর এলাকায় নদী-হাওরের পথ ভুল করে রাজাকার-পাক-বাহিনীর ব্যুহে ঢুকে দিশেহারা হবার কথা নয়।
যে জগৎজ্যোতির বীরত্বপূর্ণ মৃত্যুতে সারাদেশের মুক্তিকামী মানুষ স্তম্ভিত স্তব্ধ ‘৭১’র অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের পক্ষে ‘স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র’, ‘আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র’ ১৬ নভেম্বর রাতেই বিশেষ বুলেটিন প্রচার করে বলেছে -তাঁকে “বীর শ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি দাস” নামে আখ্যায়িত করে মরণোত্তর সর্বোচ্চ খেতাবে ভূষিত করা হবে। কিন্তু সেই খেতাব আর তাঁর নামের সাথে যুক্ত হয়নি।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কমিউনিস্ট কর্মী ও লেখক অঞ্জলী লাহিড়ীর শিলঙের বাড়িতে জগৎজ্যোতিসহ তাঁর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল আশ্রয় নিয়েছিলো। সিলেটের মেয়ে লাহিড়ী খুব সমাদর করে তাঁর জ¦রের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও অপারেশনে যাওয়ার কথা বলে চলে আসে। পরে তিনি তাঁকে নিয়ে ২০০৩ সালে একটি উপন্যাস লিখেন। হবিগঞ্জের নাট্যকর্মী রুমা মোদক তাঁঁকে নিয়ে একটি মঞ্চনাটক লিখেন তা ঢাকা ও সিলেট বহুবার প্রদর্শিত হয়। সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের উপর পাঁচ/ছ’টি বই লিখা হয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধে দাসপাটির্’Ñরনেন্দ্র কুমার তালুকদার, ‘অনন্য জগৎজ্যোতি’-অপূর্ব শর্মা, ‘দাসপার্টির খোঁজে’- হাসান মুর্শেদসহ তিনটি বই লিখা হয়। আজমিরিগঞ্জে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সহযোদ্ধারাদের নির্মিত ‘ শহীদ জগৎজ্যোতি (বীর উত্তম)’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ এখনও এভাবেই আছে। সুনামগঞ্জের সাবেক ‘জেলা পাবলিক লাইব্রেরি’ ‘শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার’ নামে নামকরণ করা হয়। তাও গত এক বছর আগে নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র হিসেবেÑ শহীদ তালেব, শহীদ গিয়াস, শহীদ জগৎজ্যোতি, শহীদ আলী আজগর স্মরণে একটি মুক্তিচত্বর স্থাপন করা হয়েছে।
পরম শ্রদ্ধা, লাল সালাম জানিয়ে জগৎজ্যোতি দাসের আত্মত্যাগকে শিরে স্থান দিয়ে আগামী প্রজন্মকে জানিয়ে যাব আমার হাওরেও একজন ‘স্পার্টাকাসতুল্য মহানায়ক’ জন্ম নিয়েছিলেন, তোমরা তাঁকে ভুলো না। (জগৎজ্যোতি দাস : ২৬ এপ্রিল ১৯৪৯—-১৬ নভেম্বর ১৯৭১ ইং)