ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়, কয়লা উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞা বাতিল

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বড়ছড়া, চারাগাঁও শুল্কস্টেশন আবার চাঙা হতে পারে। ভারতের উচ্চ আদালত গত ৩ জুলাই শর্তসাপেক্ষ কয়লা উত্তোলনের পক্ষে আদেশ দিয়েছেন। ভারতের নর্থ ইস্ট টুডে পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে ৩ জুলাই এই সংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক গ্রুপের সচিব রাজেশ তালুকদার শনিবার জানিয়েছেন, রপ্তানীকারকদের পক্ষ থেকে তাদেরকেও উচ্চ আদালতের এই আদেশের কথা জানানো হয়েছে, তবে এই সংক্রান্ত কোন চিঠি এখনো তাদের দেওয়া হয়নি।
রাজেশ তালুকদার জানান, মেঘালয়ের রপ্তানীকারকরা তাদেরকে মৌখিকভাবে জানিয়েছে গত ৩ জুলাই ভারতের সুপ্রিমকোর্ট কয়লানীতি অনুসরণ করে কয়লা উত্তোলনের আদেশ দিয়েছেন। আদেশের উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, পরিবেশ দূষণ না করে বৈজ্ঞানিক পন্থায় কয়লা উত্তোলন করা। উপজাতীয়দের জমিতে কয়লা খনি থাকলে, তারাই এটি’র মালিক হবে।
রাজেশ তালুকদার জানান, এখন বৃষ্টির মৌসুম, বৃষ্টি মৌসুমে কয়লা উত্তোলন হয় না। আগামী অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আবার কয়লা উত্তোলন শুরু হবে।
ভারতের নর্থ ইস্ট টুডে পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে ‘মেঘালয়: কনরাড, প্রেস্টন হিল খনন সংক্রান্ত এসসি আদেশ, ঐতিহাসিক রায়’ শিরোনামে গত ৩ জুলাই উল্লেখ করা হয় ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নিষিদ্ধ করা নিষেধাজ্ঞা সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছেন। গত বুধবার রাষ্ট্রের বেসরকারি ও কমিউনিটি মালিকানাধীন ভূমিখনি পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে। রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে উপজাতি অধিকার স্বীকৃত। এতে বলা হয়েছে জমি ও সম্পদের মালিক জনগণ। এই রায়কে প্রধান বিচারপতি জনগণের বিজয়, বিশেষত উপজাতি সম্প্রদায়ের বিজয় হিসাবে গণ্য করেন। বিচারপতি বলেন, মেঘালয়কে কয়লা খনির উপর নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনীতির উপর তার প্রভাব সম্পর্কে উপলব্ধি করতে হবে। তিনি যথাযথ বৈজ্ঞানিকভাবে খনির কাজ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন। রায়ে বিচারপতি অশোক ভূষণ ও কে এম জোসেফের সুপ্রীম কোর্ট বেঞ্চ রাজ্য প্রশাসনকে কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড (সিআইএল) থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত কয়লা হস্তান্তর করার নির্দেশ দেন। এর নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ রাজ্য সরকারের তহবিলে জমা দেবে।
এদিকে, সুপ্রীম কোর্টের ঐতিহাসিক” রায় ঘোষণা করে ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী প্রেস্টন টেনসং বলেন, সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চিত করেছে যে মেঘালয় সংক্রান্ত জমি, খনি এবং এর সম্পদের উপজাতীয় জনগণের সাথে থাকবে। এটি একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন, কারণ সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যটিতে কয়লা খনি নিষিদ্ধ করার জন্য জাতীয় গ্রীন ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) এর রায় বাতিল করেছে। এনপিপি নেতৃত্বাধীন এমডিএ সরকার গত এক বছর যুদ্ধ চালিয়েছে এবং এই বিষয়টিকে অনুসরণ করার পর রায় এসেছে। রাজ্য সরকার কর্তৃক দায়ের করা পিটিশনকে সামনে রেখে সুপ্রিম কোর্ট রায় পাস করেছে বলে আমরা আনন্দিত।
ওদিকে, মেঘালয়ের অন্যতম ইংরেজি দৈনিক শিলং টাইমস শনিবার উল্লেখ করেছে, আগামী ১২ জুলাই ৩২ লাখ মেট্রিক টন উত্তোলিত কয়লার নিলাম নিয়ে দায়িত্বশীলদের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিপি কাটাকির নেতৃত্বে ন্যাশনাল গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) প্যানেল ১২ জুলাই তারিখে উত্তোলিত কয়লা নিলাম সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে। গত শুক্রবার এক সরকারি সূত্র জানায়, এনজিটি কমিটির বৈঠকে ভারত সরকার ও রাজ্য সরকার কর্মকর্তাদের বৈঠক হবে। ৩২ লাখ মেট্রিক টন উত্তোলিত কয়লার নিলাম ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ৩ শুল্ক বন্দরে প্রায় ৬০০ আমদানী কারক কয়লা আমদানী করেন। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় কয়লা শুল্কস্টেশন এগুলো। শুল্কস্টেশন চালু থাকলে কমপক্ষে ৫০ হাজার শ্রমিক এসব বন্দরে কাজ করেন। ২০১৪ ইংরেজি’র ১৩ মে থেকে এই শুল্কবন্দরগুলোর দুর্দিন যাচ্ছে। বেশিরভাগ সময়ই এই বন্দরগুলো দিয়ে কয়লা আমদানী হয়নি। একারণে এই উপজেলাসহ জেলা শহর সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোণা জেলা শহরেও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে। কয়লা ব্যবসায়ীদের ব্যবসা সচল না থাকায় এই দুই জেলা শহরে জমি-জমার মূল্যও কমে গেছে।
ভারতের মেঘালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন ডিমাহাসাও জেলা ছাত্র ইউনিয়নের আবেদনের ভিত্তিতে ২০১৪ ইংরেজির ১৭ এপ্রিল ন্যাশনাল গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) মেঘালয় সরকারের অবৈধ কয়লা খনন ও পরিবহন বন্ধের নির্দেশ দেন। একই বছরের ৬ মে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় মূখ্যসচিব এব্যাপারে প্রতিটি জেলায় নির্দেশ জারি করেন। গ্রীণ ট্রাইব্যুনালের এই নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয় মেঘালয়ের জেলা প্রশাসকদের। এ কারণে ২০১৪ ইংরেজির ১৩ মে থেকে মেঘালয়ের সীমান্ত জেলাগুলোয় ১৪৪ ধারা জারি করে কয়লা পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শুল্কবন্দর সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বড়ছড়া-চারাগাঁও ও বাগলী দিয়ে কয়লা আমদানী বন্ধ হয়ে যায়।
রপ্তানীকারকরা আইনী লড়াই করে প্রথমে উত্তোলিত কয়লার রাজস্ব জমা দিয়ে ৩ মাস (এপ্রিল, মে ও জুন’২০১৫) রপ্তানীর সুযোগ পান। পরে এই সময় ৫ দফায় বাড়িয়ে গত প্রায় ৫ বছরে ২১ মাস উত্তোলিত কয়লা রপ্তানী হয়।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তোলিত কয়লা রপ্তানীর সুযোগ দেয়। অথচ. এই সুযোগ কোন প্রকার নোটিশ বা চিঠি ছাড়াই ১৫ জানুয়ারি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর আবারও রপ্তানীকারকরা আইনী লড়াই শুরু করেন। সর্বশেষ গত ১০ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৩১ মে পর্যন্ত উত্তোলিত অবশিষ্ট কয়লা রপ্তানী’র সুযোগ দেয়।
তাহিরপুর কয়লা আমদানী কারক গ্রুপের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের বলেন, ভারতের সুপ্রিমকোর্ট শর্তসাপেক্ষে শুনেছি কয়লা উত্তোলনের সুযোগ দিয়েছেন। রপ্তানীকারকদের পক্ষ থেকে আদালতের রায়ের কপি পাওয়া গেলে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।