ভাষা আন্দোলনই স্বাধীনতার অনিবার্য পথযাত্রা

আলী আমজাদ
১৯৪৮ সাল ২রা মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় এক বৈঠকে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সংগ্রাম পরিষদ গঠনে সেদিনের ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগ্রাম পরিষদে অন্যান্য যারা ছিলেন তারা হলো- (১) মোঃ তোহা, (২) তাজউদ্দিন আহমদ, (৩) শহীদুল্লাহ কায়সার, (৪) শামছুল হক, (৫) অধ্যাপক আবুল কাশেম, (৬) অজিৎ গুহ, (৭) রমেশ দাস গুপ্ত, নারী নেত্রী (৮) লিলি খানসহ আরো বেশ কয়েকজন।
সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসার দিন ১১ই মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহবান করা হয়। যার ফলে পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমান সহ বেশ কয়েকজন ছাত্র নেতাকে গ্রেপ্তার করে । শেখ মুজিবুর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে একটি নতুন পথের যাত্রা শুরু হয়। এই সময় মওলানা ভাষানী আসামে ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন ভারতে। শেখ মুজিবুর রহমান, শামছুল হক, অলি আহাদসহ অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আটক। ছাত্রদেরকে গ্রেপ্তার করে মুখ্যমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন স্বস্থিতে ছিলেন না। কারণ গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ সাহেব কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকায় আসবেন। নাজিম উদ্দিন তখন ছাত্রদের দাবী মানার শর্তে একটি চূক্তিনামা করেন। চূক্তি অনুযায়ী ছাত্রনেতাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয় কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে বের হতে অস্বীকার করেন। তাঁর দাবী যতক্ষণ পর্যন্ত সকল রাজবন্দীদেরকে মুক্তি দেওয়া না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি বাহির হবে না। তখন মুখ্যমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন সাহেব সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এই সময় দুই কমিউনিস্ট নেতা রমেস দাস গুপ্ত ও ধরনী রায় রাজবন্দী হিসাবে জেলে আটক ছিলেন, তারাও মুক্তি পায়। ১৫ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তিপান। ১৯৪৮ সাল ১১ই মার্চ পাকিস্তানের স্রষ্টা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় ঘোষণা করেন পাকিস্তানে উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তখনই ছাত্র সমাজ এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। তখন পাকিস্তানের বাঙালি শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুল হক সাহেব উর্দুকেই কেবল মাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে সরকারের কাছে সুপারিশ করেন ।
অধ্যাপক আবুল কাশেমের সম্পাদনায় ১৯৪৭ সাল ১৫ই সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু এই শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। উক্ত পুস্তিকায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক জনাব আবুল মনসুর সাহেব ও জনাব ডা. মুতাহার হোসেনের রচিত দুইটি নিবন্ধ স্থান পায়।
১৯৪৮ সাল ১৯শে মার্চ পাকিস্তানের ¯্রষ্টা গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন এবং ২১শে মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় বলেন যে উর্দুই কেবল মাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে। সাথে সাথে ছাত্ররা প্রতিবাদ জানায় মানব না মানি না।
২৪ মার্চ পুনরায় ঘোষণা করেন পাকিস্তানে উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররা তখন সিংহের মতো গর্জন করে প্রতিবাদ জানায় । পরক্ষণেই শামছুল হুদা চৌধুরী ও শাহ আজিজুর রহমানের নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিমলীগের একটি ছাত্র প্রতিনিধি দল গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ্ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন যে, প্রকৃত পক্ষে ভাষা আন্দোলন করে যারা, তারা পাকিস্তানের শত্রু। মি. জিন্নাহ এই বক্তব্যটি ভালো ভাবে গ্রহণ করেন। জিন্নাহ সাহেব মৃত্যুবরণ করায় লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
লিয়াকত আলী খান ১৯৫১ সাল ৩ই অক্টোবর রাউয়ালপিন্ডির এক জনসভায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ১৯৫২ সাল ২৬শে জানুয়ারি নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন দায়িত্বভার গ্রহণ করে পূর্ববঙ্গ এসে ঢাকার পল্টন ময়দানে একই ভাবে উচ্চারণ করে বলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ১৯৫২ সাল ৩০শে জানুয়ারি মওলানা ভাষানী ২১ শে ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গে হরতাল আহবান করেন। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। তখন সরকার অনির্দিষ্ট কালের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারী করে। বেলা ১টা থেকে ৩টা বেজে গেল নেতারা তখনও মধুর ক্যান্টিনে। হাজার হাজার ছাত্র জমায়েত-স্লোগান দিতে থাকে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, অনেক নেতাই আসেননি। তাই কারো নির্দেশের অপেক্ষা না করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এসেমব্লির দিকে যেতে চাইলে মেডিকেল কলেজ হোষ্টেলের নিকট যেতেই পুলিশ বেপরোয়াভাবে ছাত্রদের উপর গুলি চালাতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রফিক, বরকত, সালাম, জব্বারসহ আরো অনেকই গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদের খাতায় নাম লিখান। ২১শের ঘটনাকে স্মরণ রাখার দাবিতে সর্বপ্রথম রাজশাহীতে শহিদ মিনার তৈরি করা হয়। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে যেখানে শহিদের পবিত্র রক্ত ঝরেছে সেখানেই তাদের স্মরণে শহিদ মিনার তৈরি করা হয়। যা বাঙালিকে শৃংখল মুক্ত করে জাতির পিতার নেতৃত্বে স্বাধীনতার অনির্বায গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু করে।
লেখক : আইনজীবী