ভুয়া পরীক্ষার্থী ও রস্কের দুর্নীতিগ্রস্ততা

রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু এবং আর যেসব শিশু স্কুল আঙিনায় প্রবেশ করতে পারেনি তাদেরকে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে। তারা প্রতিটি উপজেলায় আনন্দ স্কুল নাম দিয়ে এই প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। সরকারের উদ্দেশ্য হল, স্কুলে গমন উপযোগী সকল শিশুই যাতে অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়। প্রকল্পটির তাই সরকারের ওই উদ্দেশ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এই প্রকল্পটি আসলে কেমন কাজ করছে তার সর্বশেষ প্রমাণ গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত ‘ধর্মপাশায় ২০ ভুয়া পরীক্ষার্থী শনাক্ত’ শীর্ষক সংবাদটি। ওই সংবাদ থেকে জানা যায়, চলমান প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় সোমবার ধর্মপাশা উপজেলার দুইটি কেন্দ্রে ২০ জন ভুয়া পরীক্ষার্থী শনাক্ত করে তাদের বহিস্কার করা হয়েছে। এই ২০ ভুয়া পরীক্ষার্থী রস্ক পরিচালিত চারটি আনন্দ স্কুলের নামে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। শনাক্ত ২০ ভুয়া পরীক্ষার্থীরা মহাবিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই ২০ জনের মধ্যে এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সপ্তম/অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ছিল। আনন্দস্কুল এদেরকে তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য পরীক্ষাপিছু ১০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দিচ্ছিল। যথারীতি প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজের দোষ অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের অস্বীকারে এখন আর কিছু যায় আসে না। কারণ দালিলিকভাবে ওই ২০ ভুয়া পরীক্ষার্থী প্রমাণিত হয়েছে। তবে জানা যায়নি উপজেলার অন্য কেন্দ্রগুলোতে আরও কতজন আনন্দস্কুলের এমন ভুয়া পরীক্ষার্থী রয়েছে। তবে দুই কেন্দ্রের ২০ ভুয়া বেরিয়ে আসায় অন্য কেন্দ্রগুলোতেও যে এমন ভুয়া পরীক্ষার্থী থাকতে পারে তা অনুমান করা ভুল কিছু নয়।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তথাকথিত আনন্দস্কুল গুলোর এই রকম অবদানের ঘটনা জেনে আমাদের আতংকিত হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে কত বড় প্রতারণা ও অপরাধমূলক কর্মকা- করে থাকে ধর্মপাশার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আনন্দস্কুলের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে এর আগে বহুবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষকদের বেতনের টাকা থেকে উৎকোচ নেয়া, শিক্ষা উপকরণের বরাদ্দ আত্মসাৎ, নির্ধারিত দায়িত্ব পালন না করা; এমনসব অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মাত্রার। তবে ধর্মপাশার প্রতারণা এইসব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে নিঃসন্দেহে। প্রতারণার নতুন কৌশলের জন্য এখন রস্ক প্রকল্প স্বীকৃতি পেতে পারে। তবে এই স্বীকৃতি তাদের জন্য বাহ্বা পাওয়ার মতো ব্যাপার হলেও জাতির জন্য ভয়ংকর। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে অভিনব প্রতারণার কৌশল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এরা যেমন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক ধাপটিকে কলংকিত করেছে তেমনি শিশু শিক্ষার্থীদের অপরাধবৃত্তির দিকে উৎসাহিত করছে।
এই যে ভয়ংকর অপরাধ করল ধর্মপাশা উপজেলা রস্ক প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তারা সাজাপ্রাপ্ত হবে কিনা আমরা জানি না। কারণ অন্যায় করে রেহাই পেয়ে যাওয়া আমাদের দেশে একেবারেই সহজ বিষয়। তবে প্রকৃত অর্থেই যদি আইন, বিধি-বিধান যথার্থভাবে প্রযুক্ত হয় এবং যেমনটি সকলের অভিপ্রায়, তাহলে এই ভুয়া পরীক্ষার্থী সাজানোর প্রতারণা ও চরম দুর্নীতিগ্রস্ততার কারণে জড়িতদের চাকুরিচ্যুতি সহ তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাই হবে উপযুক্ত।