ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি- নাজিম ও মাহবুবের পরিবারে শোকের মাতম

বিশেষ প্রতিনিধি
তিউনিসিয়া উপকূলে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিহত নাজিম উদ্দিন ও মাহবুবের মা-বাবাসহ স্বজনদের আহাজারিতে ছাতকের নুরুল্লাপুর দিরাইয়ের চন্ডিপুরে এখন শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।
নাজিমের মা সাবিরুননেছা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন,‘আমার পরিবারেতো অভাব আছিল না। আমার পুয়াটারে (ছেলেটাকে) লোভ দেখাইয়া দালালরা নিয়া ঠকছে তো ঠকছেঔ, আমার বুকও খালি করছে। আমার পুয়ার মুখ দেখতাম চাই আমি।’
নাজিম উদ্দিন ছাতক উপজেলার নুরুল্লাপুরের আজির উদ্দিন ও মোছাম্মৎ সাবিরুন নেছার ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে বড় সন্তান। সিলেটের মদন মোহন কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সিলেট লেকসিটি আবাসিক এলাকার ২৮ নম্বরের মুছন মঞ্জিলে (নিজেদের বাড়ি) থেকে পড়াশুনা করতো সে।
গত বছরের ২৩ মে বুধবার (৭ রমজান) তেরাবির নামাজ শেষে নুরুল্লাপুরের বাড়ি থেকে গ্রামের শরিফ উদ্দিন ও শহীদ আহমদসহ নাজিম উদ্দিন লিবিয়ায় যাবার উদ্দেশ্যে ঢাকা যায়। এরপর আর বাড়ি আসেনি।
নাজিম উদ্দিনের চাচা শাহীন আহমদ জানান, ছাতকেরই গোবিন্দগঞ্জের পাশের উজিরপুরের শামীম আহমদের মাধ্যমে সরাসরি ইতালী যাবার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ে তারা। এজন্য ৭ লাখ টাকা করে পৌঁছার পর দেবার চুক্তি হয়। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ছাতকের ধারণবাজারের পাশের কাইকরা গ্রামের লিবিয়ায় থাকা কাসেম তাঁদেরকে জানায়, ইতালিতে ‘গেইম দিতে’ (ইতালিতে ট্রলারে ছাড়তে হলে) হলে আরও দেড় লাখ টাকা করে দিতে হবে এবং ওই ৭ লাখ টাকাও দিয়ে দিতে হবে। পুরো টাকা দেবার পর ৫ মাসের মাথায় একবার দালালরা প্রথমে ইতালির উদ্দেশ্যে এদের গেইম দেয়। ওই সময়েও ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। লিবিয়ার কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে আটক করে। পরে আবার ১ লাখ টাকা করে দিয়ে এদের ছাড়ানো হয়।
গত শুক্রবার ৬ মাস লিবিয়ায় জেল খেটে দেশে ফেরৎ আসা এই ৩ জনের একজন শরিফ উদ্দিন জানায়, লিবিয়ায় পৌঁছার পর বেনগাজি নামের একটি স্থানে তাদের ১০-১২ দিন রাখে। এরপরই দালালরা বলে ইতালিতে যেতে হলে টাকা দিতে হবে, না হয় মাফিয়াদের কাছে তোদের তুলে দেব। এরপর বাড়ি থেকে টাকা পাঠালে একটি প্লাস্টিকের বুটে করে তাদের গেইম দেয়। ৩-৪ ঘণ্টা চলার পরই বুট ফেটে ডুবে যায়। পরে ৮ ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর লিবিয়ার কোস্টগার্ড উদ্ধার করে তাদের জেলে পাঠায়। ওখান থেকে দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে ছাড়া পাবার পর আবার গেইম দেয় দালালরা। ওই গেইমের সময় পানামা নামের একটি স্থানে গিয়ে কোস্টগার্ডের কাছে আটক হয়ে ৬ মাস জেল খাটার পর গত শুক্রবার দেশে এসেছেন শরিফ। কিন্তু নাজিম উদ্দিন লিবিয়ায়ই ছিল।
নাজিম উদ্দিনের চাচা শাহিন আহমদ জানান, গত ৮ মে ভোর ৬ টায় নাজিম দিরাইয়ের মাহবুবের ফোন থেকে ম্যাসেজ পাঠায় ‘ইতালির উদ্দেশ্যে আমি গেইমে ওঠেছি, তোমরা সবাই দোয়া করো।’ এরপর আর খোঁজ নেই নাজিমের। সুনামগঞ্জ রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে মঙ্গলবার সকালে খবর পেয়ে রেড ক্রিসেন্ট অফিসে গিয়ে সকল তথ্য দিয়ে এসেছেন তারা।
গোবিন্দগঞ্জের পাশের উজিরপুর গ্রামের শামীম আহমদ বলেন,‘আমি নাজিম উদ্দিন বা অন্য কাউকে ইতালিতে পাঠাইনি। আমার ভাই যাদের মাধ্যমে ইতালিতে গেছে, তাদের মাধ্যমে আমি নাজিম উদ্দিনসহ নুরুল্লাপুরের ৩ জনকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছি। এরপরের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
এদিকে, একই বুটে লিবিয়া থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে গেইম দেওয়া দিরাই উপজেলার চন্ডিপুরের আব্দুস সবুর ও রেনুকা বেগমের ছেলে মাদ্রাসা শিক্ষক মো. মাহবুব’এর সলিল সমাধি হয়েছে।
ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মো. মাহবুবের মৃত্যুতে কেবল তাঁদের পরিবার নয়, পুরো গ্রামেই শোকের ছায়া বিরাজ করছে।
মাহবুরের ভাই রেজাউল করিম জানান, ইমুর মাধ্যমে লিবিয়ায় থাকা পারভেজ আহমদ নামের এক দালালের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল মাহবুব’এর। প্রথমে তাঁর সঙ্গে কথা ছিল ইতালিতে পৌঁছে দেবার পর ৭ লাখ টাকা দিতে হবে। পরে লিবিয়ায় পৌঁছার পর বাংলাদেশের একটি ব্যাংক হিসাবে (এখন নাম ভুলে গেছেন) সাড়ে ৪ লাখ এবং গেইম দেবার সময় আরো আড়াই লাখ টাকা দিতে হয়েছে। গেইমের আগের দিন মঙ্গলবার ভাইয়ের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে, তাঁর জন্য দোয়াও চেয়েছে সকলের কাছে। কিন্তু এক সপ্তাহের মাথায় মঙ্গলবার সকালে রেডক্রিসেন্টের অফিস থেকে এই খবর পেয়ে বাড়ির সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।
রেড ক্রিসেন্টের সুনামগঞ্জ অফিসের ইউনিট অফিসার কনিকা তালুকদার জানান, রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিচয় বৃত্তান্ত সংগ্রহ করে উর্ধ্বতন পর্যায়ে পাঠানো হচ্ছে। পরবর্তী ব্যবস্থার বিষয়টি রেডক্রিসেন্টের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবেন।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লিবিয়ার উপকূল থেকে ৭৫ জন অভিবাসী একটি বড় নৌকায় করে ইতালির উদ্দেশে রওয়ানা হন। গভীর সাগরে তাদের বড় নৌকাটি থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি নৌকায় তোলা হলে কিছুক্ষণের মধ্যে সেটি ডুবে যায়।