ভূমিদাতাদের প্রতি এই অবজ্ঞা চরম হীনমন্যতার পরিচায়ক

এটি চরম হীনমন্যতার পরিচায়ক। সংবাদে প্রকাশ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় শুক্রবার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের যে সাড়ম্বর উদ্বোধন হল সেখানে আমন্ত্রণ পাননি ভবনের ভূমিদাতারা। ভূমিদাতারা শহীদ পরিবারের সন্তান, একাত্তরে পাক হানদাররা ওই উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা গয়ানাথ তালুকদারকে ( তারানাথ তালুকদার নামেও তিনি পরিচিত) গুলি করে হত্যা করে। তেঘরিয়া গ্রামটি স্বাধীনতা যুদ্ধকালে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্বভাবতই শহীদ গয়ানাথের সন্তান গোপেন্দ্র কুমার তালুকদার ও অতুলকৃষ্ণ তালুকদার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। সংবেদনশীলতার এই জায়গা থেকেই তারা উপজেলা সদরে অবস্থিত তাদের মূল্যবান ১৫ শতক জায়গা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য দান করেছিলেন। শুধু এই কমপ্লেক্সই নয়। উপজেলা সদরের আরও দুইটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাÑ শহীদমিনার ও প্রেসক্লাবের জন্যও তারা ভূমি দান করেছেন। আজকাল যেখানে বেশি পয়সা পাওয়ার জন্য জমি অধিগ্রহণ করাতে প্রায় সকল মানুষের আগ্রহ বেশি এবং যখন কেউই কিছু দান করতে অনাগ্রহী সেখানে বিনা মূল্যে মূল্যবান জায়গা দান করার এই নজির উচ্চ প্রশংসা ও মূল্যায়ন পাওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু ন্যূনতম মূল্যায়ন কিংবা সম্মান তাঁদের কপালে জোটেনি। উপজেলা প্রশাসন কিংবা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে তাঁদের আমন্ত্রণ পর্যন্ত করেননি। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের জন্য ভূমি দান কালে গোপেন্দ্র ও অতুল প্রথমে ভবনে তাঁদের শহীদ পিতার নাম লিপিবদ্ধ করার দাবি করেছিলেন কিন্তু ‘মৃত মানুষ দাতা হতে পারেন না’ অজুহাতে সেই প্রস্তাব নাকচ করা হয়। পরে ভবনে ভূমিদাতা হিসাবে গোপেন্দ্র-অতুল ভ্রাতৃদ্বয়ের নাম লিপিবদ্ধ করার বিষয়ে সম্মত হন। কিন্তু ভবন নির্মাণ ও উদ্বোধনের সময় দেখা গেল ভবনের কোথাও ভূমিদাতা হিসাবে তাদের নামটুকুও নেই। এইভাবেই কমপ্লেক্সের ভূমিদাতাদের চরমভাবে অবজ্ঞা, উপেক্ষা ও অসম্মান করা হলো। এটিকে হীনমন্যতার বাইরে আর কী বলা যায়?
তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো ও না জানানোর ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ও সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার পরস্পরকে দোষারোপ করছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার গণমাধ্যমকে বলেছেন ভূমিদাতাকে আমন্ত্রণ জানানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল সাবেক উপজেলা কমান্ডারকে। সাবেক উপজেলা কমান্ডার বলছেন, ‘আমরা এখন কমান্ডের দায়িত্বে নেই। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কমান্ডের দায়িত্বে।’ তবে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে ভূমিদাতাদের আমন্ত্রণ না জানানোর পিছনে সকল পক্ষেরই অবহেলা কাজ করেছে। তাঁদের কাছে ভূমিদাতাদের গুরুত্ব থাকলে এমন কা- ঘটত না। তবে পরিকল্পনামন্ত্রী মহোদয়ের চোখে বিষয়টি ঠিকই ধরা পড়েছে। তিনি অনুষ্ঠানস্থলে ভূমিদাতাদের খোঁজ করেছেন। ভবনে ভূমিদাতাদের নাম দ্রুত লাগানোর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
এই উন্নাসিকতা ও অবজ্ঞার সংস্কৃতি পরিত্যাগ করতে হবে আমাদেরকে। ভাল কাজ যারা করেন তাঁদেরকে সম্মান না জানানো হলে এমন মানুষ ভবিষ্যতে আর খোঁজে পাওয়া যাবে না। ভূমিদাতাদের আমন্ত্রণ না জানানো কিংবা ভবনের ফলকে তাঁদের নাম অন্তর্ভূক্ত না করার মধ্য দিয়ে তাঁরা যে অপরিসীম মনোবেদনার শিকার হয়েছেন সেটি মূলত আমাদের লজ্জিত করেছে। অবশ্যই তাদের মনোবেদনা দূর করতে হবে। আমরা মনে করি ভবনের গায়ে শহীদ গয়ানাথের নাম লাগানো কঠিন কোন কাজ ছিল না। পরিকল্পনামন্ত্রী মহোদয়ের সাথে আলোচনা করলে, আমাদের বিশ্বাস তিনি অনায়াসে এই ভবনের নামকরণ গয়ানাথের নামেই করার সম্মাতি দিতেন। যাহোক যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন সংশোধন করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের নাম যদি শহীদ গয়ানাথ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স হয় তাহলে মূলত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকেই মহিমান্বিত করা হবে। ভূমিদাতা হিসাবে গোপেন্দ্র-অতুল ভ্রাতৃদ্বয়ের নাম লিখা তো আবশ্যকীয় কর্তব্যই।