ভেজাল খেয়েই যতদিন বেঁচে থাকা যায়, মন্দ কি!

রমজান মাসের শুরু থেকে রাজধানী ঢাকায় ভেজাল বিরোধী ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে দেশের নামী-দামী ব্র্যান্ডশপ ও চেইনশপগুলোকে জরিমানা করা হচ্ছে। চেইন সপ- স্বপ্ন, আগুরা, মিনাবাজার, খাদ্যদ্রব্য সরবরাহকারী কেএফসি, আফতাব মিল্ক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানকে মানবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, অতিরিক্ত মূল্য আদায় ইত্যাদি কারণে বড় অংকের জরিমানা করার খবর সংবাদপত্রসূত্রে আমরা জানতে পেরেছি। উপরে সামান্য যে ক’টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এর বাইরে আরও অনেক নামী প্রতিষ্ঠান এরূপ শাস্তির সন্মুখীন হয়েছেন। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার কারণে দেশব্যাপী গড়ে উঠেছে এসব সুপারশপ বা চেইনশপ। মানুষ মানসম্পন্ন জিনিস কেনার জন্য একটু বেশি দাম হলেও এসব দোকানে ভিড় জমান। কিন্তু ব্র্যান্ড নামের আড়ালে এসব প্রতিষ্ঠান যে সর্বাবস্থায় সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণ বা অন্যসব নিয়মকানুন পরিপালন করেন না চলমান ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে শাস্তি পাওয়া থেকে সেটি প্রমাণিত হয়। এইসব বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানেরই যদি এমন অবস্থা হয় তখন বাজারের সাধারণ দোকানগুলোর অবস্থা কেমন তা সহজেই অনুমেয়। অর্থাৎ আমরা নিদারুণ এক স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পন্ন বাজার ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান বজায় রেখে গাঁটের টাকা খরচ করে রোগ জীবাণু কিনে আনছি। গ্রাহকের বিশ্বাসকে প্রতারণা করা হচ্ছে এই বাজার ব্যবস্থায়। একে কী বলা যায়? আসলে পূঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থায়ও এক ধরনের নীতি নৈতিকতা থাকে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তারা গ্রাহকের বিশ্বাস স্থাপনে আগ্রহী হয়। কিন্তু আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা ওই ন্যুনতম পূঁজিবাদী নীতি নৈতিকতারও আর অবশিষ্ট কিছু রাখছেন না। বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে চরমভাবে প্রতারণাপূর্ণ কেবলমাত্র যেকোন উপায়ে টাকা কামানোর এক ব্যবস্থা বিশেষ। এই উদগ্র লোভী বাজার ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ আজ বড় বেশি অসহায়।
একটি টিভি টক শোতে চেইনশপ স্বপ্ন’র একজন বড় কর্তা স্বীকার করেছেন তাদের বিরুদ্ধে অতীতে অন্তত দশবার ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করেছেন (টকশোর অন্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য অনুসারে এ ধরনের অভিযান সংখ্যা আরও বেশি)। ভ্রাম্যমান আদালত কোন প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এই ধরনের অভিযান থেকে ব্যবসায়ীদের সংশোধনের একটি সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু যখন একটি নামকরা বহুল পরিচিত চেইনশপে অন্তত দশবার অভিযান পরিচালনা করার পরও তাদের জরিমানা করার মত বাস্তবতা পাওয়া যায়, তখন আমাদের প্রশ্ন হল, এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনার সনদপত্র বাতিল করা হচ্ছে না কেন। কিছুদিন আগে আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ পাস্তুরাইজড প্যাকেট দুধেই ভেজাল রয়েছে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনের পর সরকার কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন এমন সংবাদ জানা যায় না। মূলত বৃহৎ ব্যবসায়ীরা এখন ক্রমশ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকের মত হয়ে উঠছেন। ফলে এরা ক্রমাগত অন্যায় করে চললেও লোকদেখানো মামুলী কোন ব্যবস্থার বদলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। তাই ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানের মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে চরমভাবে নৈতিকতাহীন বাজার ব্যবস্থাকে সংশোধন করা যাবে এমন আশা সংগত নয়।
তবু আমরা বেঁচে আছি। ভেজাল খেয়ে বোধ করি আমাদের পাকস্থলি ভেজালসহা হয়ে উঠেছে। এই ভেজালসহা পাকস্থলি, দেহ ও মন নিয়ে যতদিন বেঁচে থাকা যায় সেটাই মন্দ কি।