ভোগান্তিতে ২৫ হাজার গ্রাহক

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ শহরের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজে অবহেলা-অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা এই অভিযোগ করেছেন। এ কারণে শহরবাসীর বিদ্যুৎ ভোগান্তিও লেগে আছে। সুনামগঞ্জ শহরের ওয়েজখালী গ্রীড সাবস্টেশন থেকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ হলেও অভ্যন্তরীণ লাইনের সমস্যার কারণে প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহককে দিনে বহুবার বিদ্যুৎ যন্ত্রণা সইতে হচ্ছে। শুক্রবার নতুন পুতা একটি বিদ্যুতের খুঁটি’র শক্তকরণ তারে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে শহরের মুহাম্মদপুর এলাকায় একটি মহিষ মারা গেছে। দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে আরেক তরুণ।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গভর্ণমেন্ট অব বাংলাদেশ (জিওবি) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবি)’এর যৌথ অর্থায়নে সুনামগঞ্জ শহরের অভন্তরীণ বিদ্যুৎ লাইনের আপগ্রেডেশনের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে। এক কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১ শ’ পুলে কাজ করার কথা সিলেটের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সানরাইজ ট্রেডার্সের। এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বেশির ভাগ পুল বসানোর সময়ই গর্ত কম করেছে। এ কারণে বিদ্যুতের খুঁটি অনেক স্থানে হেলে পড়েছে। কোথাও কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটি অনেক স্থানে আতঙ্খের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৌর শহরের মুহাম্মদপুর এলাকায় শুক্রবার বিকেলে বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে একটি মহিষ মারা গেছে। মহিষের মালিক এলাকার মহিবুর রহমান।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনের গাফিলতির কারণেই মহিষের প্রাণ গেছে। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন মহিষের সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মুহাম্মদপুর মাজার এলাকায় বিদ্যুতের নতুন খুঁটি বসানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার এই খুঁটিতে বিদ্যুতের তার টানানো হয়। খুঁটিকে সোজা করে আটকানোর জন্য ব্যবহৃত তার নিচে পড়ে ছিল। এলাকার লোকজন বিষয়টি শুক্রবার সকালে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনকে জানান। বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন সেখানে গিয়ে মই আনার কথা বলে চলে আসে। আর কোনো কাজ করেনি। এরপর বিকেলে ওই খুঁটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মহিষটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। এ সময় মহিষের সঙ্গে থাকা মতিউর রহমান নামের এক ব্যক্তি অল্পের জন্য রক্ষা পান।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সুনামগঞ্জের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট খলিল রহমান জানালেন, শহরজুড়ে এই প্রকল্পে দায়সারাভাবে কাজ হচ্ছে। মানুষ ভোগান্তিতে আছেন। অথচ এই কাজটি শহরবাসীর জন্য খুবই গুরুত্বর্পূণ। এ কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নজরদারি রাখা উচিত। মুহাম্মদপুরে কম গর্ত করে রাখা কয়েকটি খুঁটি হেলে আছে, যে কোন সময় এগুলো পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শুক্রবার বিদ্যুতের খুঁটির তারে এলাকায় একটি মহিষ মারা যাবার পর বিক্ষুব্ধ লোকজন বিদ্যুৎ কর্মীদের আটকে রাখে, পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তিনি জানান, যেহেতু বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতির কারণে দূর্ঘটনা ঘটেছে তাই মহিষের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। না হলে আইনি পদক্ষেপ নিতে তাদের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শহরের বাঁধন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সবিতা চক্রবর্তী জানালেন, শহরে নতুন বিদ্যুতের খুঁটি পুতার সময় কম গর্ত করেই বেশিরভাগ খুঁটি পুতা হয়েছে। এগুলো দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনের আপগ্রেডেশন শুরু হয়। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ৬৪ টি ট্রান্সফরমার বসানো এবং ১১ শ’ নতুন পুলের কাজ করার কথা। আগস্ট মাসে এই কাজের মেয়াদ শেষ হবে। অথচ এখনো অনেক কাজ বাকী। বিদ্যুতের অভ্যন্তরীণ লাইনের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ভোগান্তিও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
শহরের হাছননগরের বাসিন্দা পারভেজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, সুনামগঞ্জে বিদ্যুতের গ্রীড স্টেশন হবার পর বিদ্যুৎ ভোগান্তি কমে যাবার কথা। এই গ্রীড স্টেশনে শুনেছি গত এক বছরে বিদ্যুৎহীন ছিল একেবারেই কম সময়। কেবল অভ্যন্তরীণ লাইনে কাজ বা ত্রুটি’র কারণে বিদ্যুৎ ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে। ট্রান্সফরমার এবং বিদ্যুতের খুঁটি বসানো নিয়ে কোন কোন এলাকায় ক্ষোভ রয়েছে।
শহরের নবীনগর এলাকার বাসিন্দা দুলন মিয়া জানালেন, নবীনগরের অনেক স্থানে এখনো জরাজীর্ণ লাইন রয়েছে, সেগুলো সংস্কার করা হয়নি। অথচ একটি ব্যক্তিমালিকাধীন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নতুন একটি ট্রান্সফরমার বসানো হয়েছে। অথচ পাশেই রয়েছে জরাজীর্ণ বিদ্যুৎ লাইন। সেগুলো মেরামত করা হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের আপগ্রেডেশন প্রকল্পের সুনামগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কনসালটেন্ট মিরাজ আহমদ মিরাজ বলেন, মুহাম্মদপুরে নতুন একটি পুল পড়ে একটি মহিষ মারা গেছে শুনেছি। এই খুঁটি যেখানে পুতা হয়েছিল সেখানে বালু মাটি ছিল। গত কয়েকদিনের বর্ষণে বালু মাটি নরম হয়ে সম্ভবত খুঁটিটি পড়েছে।
মুহাম্মদপুরে কয়েকটি খুঁটি কম পুতা হয়েছে স্বীকার করে তিনি জানালেন, এ কারণে ঠিকাদারের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, ওই এলাকায় মাপ মোতাবেক কয়েকটি খুঁটি পুতা হয়নি। শহরের অন্য এলাকায় কোন খুঁটি কম পুতা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী নুরুল হুদা জানালেন, অনিয়ম হয়ে থাকলে খুবই কম হয়েছে, ভাত খেলেওতো কিছু পড়ে, এ রকম হয়তো হয়েছে। কারো বাড়ি’র ভেতরে ট্রান্সফরমার বসানো হলেও এটি হয়তো অনেকের বাড়ি-দোকান কাভার করছে। ছোট খুঁটি সাড়ে চার ফুট, মধ্যম ৬ থেকে সাড়ে ৬ ফুট এবং বড় খুঁটি ৮ ফুট বসানোর কথা। সেভাবেই বসানো হয়েছে। কোথাও হয়তোবা নীচে গ্যাস লাইন, পানির লাইন বা শক্ত কোন পাকার আস্তরণ পড়েছে, যা ভাঙা যায়নি, সেখানে হয়তো কম পুতা হয়েছে। খুঁটি হেলে থাকলে এখনো কাজ শেষ হয়নি, সোজা করে বেশি করে পুতে বসানো হবে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সানরাইজ ট্রেডার্সের মালিক আবু তাহের দাবি করলেন, গর্ত কম করে খুঁটি পুতার অভিযোগ ঠিক নয়। এগুলো দেখার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষ টিম রয়েছে। মাটি নরম বা নীচে বালু মাটি থাকলে খুঁটি হেলে থাকতে পারে। আমার কাজ শেষের দিকে, কিন্তু এখনো কাজের মেয়াদ ৭ মাস বাকী রয়েছে।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন জানালেন, সুনামগঞ্জে আপগ্রেডেশনের কাজ অর্ধেক হয়েছে। ট্রান্সফরমার বসানোর এবং উপকেন্দ্রের জমি পেতে বিলম্ব হওয়া সহ নানা কারণে কাজ বিলম্ব হচ্ছে।