ভ্রমণ চলতে পথে যেটুক দেখা

রোকেস লেইস
(পূর্ব প্রকাশের পর)
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে সেবক মোড় থেকে যতটা সম্ভব সকালে রওয়ানা দেওয়াই উত্তম। জীপ-এ প্রতি সিট একশত ত্রিশ রূপী, নির্দিষ্ট পরিমাণ যাত্রী হলেই যাত্রা শুরু হবে। মহানন্দা নদীর উপর ব্রীজ পেরিয়ে জীপ যতই এগুতে থাকবে, প্রকৃতি সহায় হলে সামনে মায়াবী-নীল পাহাড় সারি চোখ বেয়ে মন জুড়ে ছড়িয়ে দিতে থাকবে নৈসর্গিক ভালোলাগা, যা একান্তই উপলব্ধির, অনুভবের। কখনো গভীর নীল পাহাড়ের নীচ বা উপর থেকে উড়ে চলা ধবল মেঘদল ঢেকে দিচ্ছে দৃষ্টি, আবার কখনো মেঘের পর্দা সরে গিয়ে সতেজ সজীব সবুজ নিমগ্নতায় হারিয়ে যাওয়া,সিক্ত ঘাস পাতা একরাশ পেলব প্রশান্তি। আকাশ যানে মেঘের সমুদ্র পাড়ি দেয়ার বিস্ময়ও যেনো থমকে যায়, সত্যি সত্যি মেঘের ভিতর ঢুকে আবার বেরিয়ে পথ চলা তাও মাটিতে থেকেই, এ এক অন্য অনন্য প্রাপ্তি, ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হয়। সহনীয় গতিতে চড়াই উৎড়াই সড়ক ধরে বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে জীপ উপড়ে উঠছে, ভালোই বোঝা যায়। প্রায়শ এক পাশের খাড়া খাদ কখনো হাজার ফিট কখনো তারো চেয়ে বেশী গভীরতায়, ভীতিকর রোমাঞ্চকর শিহরণ জাগায়। রাস্তা মানসম্পন্ন, বেশ খানিকটা চলার পর গাড়ি থামলো। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটাই ঘর। ড্রাইভার জানিয়ে দিলো চা,নাস্তা খেয়ে ফ্রেস হয়ে নিতে। পাহাড়ি নারী, ত্বরিত গরম গরম হাল্কা নাস্তা রুটি সব্জি,ডাল চা কফি পরিবেশন করছেন যাত্রীদের চাহিদা মতো, বসার ব্যবস্থা চলনসই, মূল্যও যথার্থ। ড্রাইভার নিজ আসনে বসতেই যাত্রীরাও উঠে বসলেন। আবারো উঠছে নামছে বাঁক ঘুরে এগিয়ে যেতে যেতেই বেশ ক’টি বসতি দেখা হলো ; সড়কের কাছ ঘেসে গড়ে উঠেছে,প্রায় সবগুলো ঘরই পাকা, তবে টিন কাঠের ঘরও আছে। আর, দূর পাহাড়ের গা’জুড়ে বাড়িঘর দেখে স্পষ্ট হয়, পাহাড় অগম্য নয়। কখনো সড়কের পাশ ধরে আবার কখনো অন্য কোনো ঘুর পথে নেরোগেজ ট্রেন লাইন এঁকে বেঁকে পাশেপাশেই চলছে। শিলিগুড়ি থেকে ঘুম, ঘুম থেকে বাতাসিয়ালুপ পর্যন্ত ট্রেন লাইন দেখা গেলো। চলতে চলতে পাহাড়ের গায়ে গড়ে উঠা বিখ্যাত ট্রেন ষ্টেশন ঘুম’-এ পৌঁছালাম। আকস্মিক ট্রেনের হুইসেল, সেই কয়লা চালিত ইঞ্জিনের; যা বহুদিন শোনা হয় না, কবে ছোটবেলায় শুনতে পেতাম। এবার পাহাড়ের বাঁক ঘুরে পাহাড় কেটে তৈরী দোতলা দালানের নীচ ধরে উকি দিল বাষ্পশকট আস্তে আস্তে পেরিয়ে যেতে দেখলাম সমতল থেকে প্রায় আট হাজার ফিট উপরে নেরোগেজ লাইন ধরে চলা টয়ট্রেন। সত্যি বিস্ময়াবিভূত হতে হয়, আজ থেকে প্রায় দু’শত বছর পূর্বের মানব সৃষ্টি দেখে। ঘুম’ থেকে শিলিগুড়ি এঁকে বেঁকে চলা ট্রেন লাইন, যতটুকু জানা যায় সরাসরি চলাচল বন্ধ আছে কিছুদিন থেকে। তবে, ভিন্ন রাস্তায় ফেরার পথে কার্শিয়ং পর্যন্ত পাশে পাশে চলতে দেখলাম টয়ট্রেন। চড়া হলো না সময় স্বল্পতার জন্যই, অন্তত দিন পাঁচেক আগে টিকেট  নিতে হয়।4
ঘুম’ পেরিয়ে দার্জিলিং-এ ঢুকছি কেমন যেনো পরিবর্তন চলে আসছে, আকাশ জুড়ে সাদাসাদা মেঘ ভাসছিলো। সামনে পাশে সবই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু,এবার বাতাসে কনকনে শীতের আবহ একটু একটু বাড়ছে, ভাবছিলাম গরম কাপড় না এনে হয়তো ভুলই হলো। যতই সামনে যাচ্ছি পুরোপুরি মেঘের ভিতর ঢুকে কেমন বর্ষাদিনের ঘনঘোর আঁধিয়ার হয়ে গেলো চারিধার, এভাবেই পৌঁছে গেলাম দার্জিলিং। জীপ থেকে নেমে ঢাল বেয়ে উপরে উঠতেই লামা রোড,’মাউন্ট প্লেজেন্ট’ হোটেল এর খোঁজ নিতে গিয়ে মিলে গেলো এক অনাহুত উপদ্রব, মধ্যবয়সী এক গোর্খা, উপযাজক হয়ে হোটেল দেখিয়ে দেয়ার চেষ্টায় কথা জমাতে চাইছে, পাত্তা না দিয়ে একটু ধীরে হেঁটে রিসিপশনে পৌঁছি, দেখি লোকটি আগেই সেখানে গিয়ে বসে আছে। ওখানে সিট না থাকায় অন্য একটি হোটেলের ঠিকানা নিয়ে অল্প হেঁটেই সেখানে পৌঁছে গেলাম, ঐ লোকটিও আগে আগেই পৌঁছালো। ‘ড্রাগন লজ’ হোটেল, ম্যানেজার মধ্যবয়সী। তার সাথে ইংরেজী, হিন্দি, পরে পরিষ্কার বাংলায় কথা হলো, বাড়ি অরুনাচল প্রদেশে ‘ওয়েল বিহেভড’ রুম দেখাতে নিয়ে গেলে জানতে চাইলাম অনাহুত ঐ লোকটা সম্পর্কে, বললো এরা চিট। রুমে যাওয়ার পথে লোকটি টাকা চাইলো, কারণ জানতে চাইলে বললো হোটেল দেখিয়ে দিলাম যে, একটু বিরক্তি নিয়ে পুলিশের প্রসঙ্গ তুলতেই কেটে পরলো। হোটেলে রুম নেয়ার ক্ষেত্রে কি কি সুবিধা আছে ইত্যাদি আগেই জেনে নেয়া ভালো, অন্যথায় অতিরিক্ত মাশুল গুণতে হতে পারে, একটু দরদাম করে নিলে কিছুটা হলেও ছাড় পাওয়া যায়। নাস্তা, খাওয়া ইত্যাদির ব্যবস্থা একই প্যাকেজে থাকলেও, পছন্দের বিষয়টি থাকে না। সেক্ষেত্রে নাস্তা, খাওয়া বাইরের রেস্টুরেন্টে যাচাই করে করাই শ্রেয় এবং সাশ্রয়ী। এন্ট্রি ইত্যাদি সেরে রুমে ঢুকে গরম পানিতে হাত মুখ ধুয়ে খেতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই জানালা দিয়ে দেখি মুষল ধারায় ঝরছে বৃষ্টি। রুম সার্ভিসের ছেলেটির নাম আলম, বাড়ি শিলিগুড়ি, বেশ চটপটে। জানালো, বৃষ্টি থামার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ দিকে খিদায় পেট চুঁ চুঁ, তার উপর হাড় কাঁপানো না হলেও শীতের অনুভূতি বাড়ছে। বৃষ্টি কিছুটা কমতেই হোটেল থেকে বেরিয়ে ছাতা কিনলাম, মেয়ের জন্য কেনা হলো হুডি। খেতে ঢুকলাম ইসলামিয়া হোটেলে। বেশ পরিপাটি, গরম গরম খাওয়া সেরে কফি পানের পর রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে কাটানোর সিদ্ধান্তই নিতে হলো বৃষ্টি আর ঠান্ডার কারণে। রুমে ফেরার পথে বেশ ক’জন ড্রাইভার “ঝবাবহ ঢ়ড়রহঃ ভড়ঁৎঃববহ যঁহফৎবফ” বলে ডাকাডাকি করছে। মাঝ বয়সী একজনের সাথে কথা হলো রফা হলো আটশত পঞ্চাশ রুপীতে, মারুতি সুজুকী কার। জানা গেলো ড্রাইভার নিজেই মালিক, এটাই পেশা। রুমে যাওয়ার চেয়ে গাড়িতে ঘুরাঘুরি মন্দ হবে না, উঠে বসলাম। জেনে নিলাম কি কি দেখাবে, দু’টো টেম্পল, তেনজিং রক, চিড়িয়াখানা, রুপওয়ে, টি গার্ডেন, ইত্যাদি। তবে ভিজিটরদের প্রচন্ড চাপ থাকায়  প্রচুর গাড়ির লাইন, গাড়ি চালানোই ছিলো কষ্টকর, কোনো গাড়িই কিউ ভাঙ্গছিল না, হর্ন বাজাচ্ছিলো না। আর, বৃষ্টি তো ঝরছিলই অবিরাম। সাধ্যমত দেখানোর চেষ্টা করলো ভুটানী ড্রাইভার ‘মামা’। মাঝেমধ্যে থেমে থেমে চা কফি খাওয়া, প্রায় ঘন্টা পাঁচেক ভালোই কাটলো। জাপানিজ পিস পেগোডা, মহাকাল মন্দির, দীরধাম টেম্পল, রুপওয়ে, চিড়িয়াখানা, টি গার্ডেন ইত্যাদিতে যাওয়া হলো অল্প বিস্তর দেখা হলো। মহাকাল মন্দির ১৭৮২ সন, পিস পেগোডা ১৮৫০ সন, জামা মসজিদ ১৮৫০ সন, দীরধাম মন্দির ১৯৩৯ সন। মূলত ১৭০০ শতকে হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসীগণ, ১৮০০ শতক থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং খৃস্ট ধর্মাবলম্বী ও ঐ শতকেই মুসলিম ধর্ম বিশ্বাসীগণ দার্জিলিং-এ নিজ নিজ উপাসনালয় সমূহ তৈরি করেন। প্রতিটি মন্দির, পেগোডা, গীর্জা, মসজিদের নির্মাণ শৈলীর ভিন্নতা ও কারুকাজ এতোটাই মনোমুগ্ধকর যা দেখলে চোখ ফিরিয়ে নেয়া যথার্থই কষ্টকর হয়ে পরে, শুধুই দেখতে ইচ্ছে করে। কোনো কোনোটি পুনঃনির্মাণ, আবার কোনোটি সংস্কারের পর বর্তমান অবস্থায় আছে। এরই মাঝে নিজেদের মধ্যে ছোট বড় মতাদর্শী, বিশ্বাসীরা নিজ নিজ মনের মাধুরী মিশিয়ে যার যার স্থাপনাগুলো করেছেন অলংকরণ। ভিন্নমত, পথ, ধর্ম অনুসারীরা শতশত বছর ধরে সহাবস্থানের এক অনন্য কীর্তি রচনা করে গেছেন, যা আজো বহমান। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ খাওয়া দাওয়া সেরে রুমে ফিরলাম। ম্যানেজার জানিয়ে গেলেন ভোরে সূর্যোদয় দেখাতে নিয়ে যাবেন, রেডি থাকতে, সম্মতি দিয়ে ঘুমাতে গেলাম। ভোরে ঠিকই ডাকতে আসলেন তিনি, আগের দিনের বৃষ্টি আর কনকনে শীতের কথা ভেবে শুয়েই থাকলাম, মেয়ে তো জানিয়েই দিলো আব্বু গতকাল যা অবস্থা ছিলো এতে ঘুমটাও যাবে। যা হোক, ঘন্টাখানেক পর দ্বিতীয়বার ডাকতেই উঠে পরি। মেয়েকে বললাম এতো কাছে এসে চান্স না নিয়ে চলে গেলে আফসোস থাকবে, তারচেয়ে চলো লাক ট্রাই করে আসি। ঝটপট মিনিট দু’তিনেই রেডি হয়ে গিয়ে জীপে বসলাম, বেশ ক’টি জীপ ইতিমধ্যেই চলে গেছে, এটাই লাস্ট, আমরা উঠতেই চলতে শুরু করলো। বাহ, আকাশটা গভীর নীল, ভোরের মৃদুমধুর বাতাস অন্য এক আবহ নিয়ে এলো, গতকালের ভিজে স্যাঁতসেঁতে বাতাস নেই, নেই ঠান্ডার লেশমাত্র। গাড়ি চলছে একের পর এক, লম্বা লাইন প্রায় সবগুলোই জীপ কিছু কিছু মিনিবাস কার’ও আছে। ঘুম’ ষ্টেশন এর পাশদিয়ে প্রায় ঘন্টা খানেক চলার পর পৌঁছে গেলাম টাইগার হিল, যেখানে শতশত গাড়ি করে হাজার হাজার দর্শনার্থী আগে থেকেই অপেক্ষায় আছেন পাহাড়ের আড়াল থেকে সূর্যকে বেরিয়ে আসতে দেখার জন্য। আমরা সর্বশেষে পৌঁছালাম। আর পৌঁছাতেই, পূবাকাশে অদ্ভূত স্বর্ণালী রক্তিম রং ছড়িয়ে বহু দূরের পাহাড়ের পিছন থেকে উঁকি দিয়ে একটু একটু করে বেরিয়ে আসতে থাকলো প্রতিদিনকার চির চেনা সূর্য, ভিন্নমাত্রা ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন আবেশ ছড়িয়ে, এ দৃশ্য একান্তই অনুভবের। শুধুই অনুভবের, হৃদয় মনে ধারণের। ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হয়, কেউ কেউ বারবার গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন এমন আবেশ ছড়ানো মন ছুঁয়া দৃশ্য অবলোকন করতে না পেরে । খেয়ালী প্রকৃতির দু’ই ভিন্ন রূপের সাথে পরিচয় হলো দু’দিনে। আজকের দিনটি ঝা চকচক সূর্য নাওয়া, বাতাসে ধুলো বালি না থাকায় যেনো স্বচ্ছ কাঁচে মোড়া গাছ,পাতা, ফুল, ফল সব সব। সকলকে ডেকে নিয়ে ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো ফিরতি পথে, বাতাসিয়ালুপে ওয়ার মেমোরিয়াল-এ থামলো, টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে সুন্দর সাজানো ফুল বাগান পাহাড়ের ঢাল জুড়ে, আর অনেকটা জায়গা নিয়ে ছড়ানো ছিটানো দর্শনীয় সব বস্তু । গ্রানাইটের স্মৃতিস্তম্ভ, ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য । উল আর পশমি কাপড়ের লোভনীয় পসরা নিয়ে বসেছে মহিলারা, দামও সস্তাই মনে হলো, কেনাকাটা নয় দেখাটাই মুখ্য, তাই কফি খেয়ে এদিক ওদিক ঘুরে দেখা। বাইনোকুলার নিয়ে একটি লোক ডাকছে “আইয়ে দেখিয়ে” বলে, কাছে গিয়ে জানা গেলো তিনটি চূড়া কৈলাস, এভারেষ্ট, আর অন্যপূর্ণা দেখা যায়। মেঘের উপর সূর্যরশ্মি শিকড়ে পরলে যেমন চকচক করে, খালি চোখে তেমনি তিনটি কৌণিক চূড়া দেখা যাচ্ছিলো, তবে আরো পরিষ্কার দেখা গেলো বাইনোকুলারে। ছবি তুলে দেখি দূরত্বের কারণে ফ্লাট মনে হচ্ছে। ওখান থেকে বেরিয়ে জীপে বসতেই পাশে থাকা মেয়েটি পরিষ্কার বাংলায় জানতে চাইলোÑ বাংলাদেশ থেকে এসেছি কি-না ? উত্তর দিয়ে তাকে প্রশ্ন করতেই বললো বাড়ি নেপাল, ঢাকায় প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়ে ফিফথ ইয়ার, বাবা ইউনিভার্সিটির ভিসি। জানালো, পড়া শেষে কাজ পেলে বাংলাদেশে থেকে যাবে। সাথের ছেলেটি স্বামী, সেও ডাক্তার, নেপালে চাকুরী করে। ওরা এখান থেকে যাবে সিকিম। সিকিম না-কি আরো বৈচিত্রময়। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী।



আরো খবর