ভ্রমণ-চলতে পথে যেটুক দেখা

রোকেস লেইস
লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন শেষে ভারতের চ্যাংড়াবান্দা, দু’দিকেই অবকাঠামোগত অবস্থা মানসম্মত নয়। যে কোন পরিবহন এর কোচ ঢাকা থেকে রাতে ছেড়ে সকালে পৌঁছায় বুড়িমারী। পৌঁছানোর পর প্রাতঃক্রিয়াদি ও প্রাতরাশ সেরে নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয় ইমিগ্রেশন এর জন্য,দু’টোর ক্ষেত্রেই ‘সারতে হয় তাই’ সেরে নেয়া। প্রত্যেক যাত্রীর ইমিগ্রেশন পর্ব সামলানোর দায়িত্ব পরিবহন কতৃপক্ষ আগেই নিয়ে নেন, এতে প্রতিটি কোচের যাত্রীকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সামনে নিজ নিজ কোচের নির্দিষ্ট লাইনে শুধুমাত্র ছবি উঠানোর জন্যই দাঁড়াতে হয়, সাথে পাসপোর্ট ইত্যাদিও যাচাই করে নেয়া। কারেন্ট থাকলে সবকটি ক্যামেরা ঠিক মতো কাজ করলে, বিষয়টি স্বল্প সময়ের। তবে, জানা যায় প্রায়ই কারেন্ট না থাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষায় কষ্ট পেতে হয়, ওয়েটিং রুম চলনসই। এদিককার পর্ব শেষে পায়ে হেঁটেই ভারতীয় ইমিগ্রেশন, ওখানে চেকিং বা ফরমালিটি তাও কোচ কর্তৃপক্ষই সারিয়ে নেন। পাসপোর্ট হাতে পেয়েই পাশে থাকা মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ডলার ভাঙ্গিয়ে (অবশ্যই রসিদ নিয়ে) নির্দিষ্ট কোচে চড়ে বসলেই চ্যাংড়াবান্দা থেকে শিলিগুড়িমুখী যাত্রা শুরু, দু’পাশে খোলা মাঠ, সবুজ বিভিন্ন ফসলময়, বাংলাদেশ “একই আকাশ একই বাতাস…….”। বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে তিন রাস্তার মিলনস্থল। সোজা সড়কটি ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, হাসিমারা, জয়গাঁও হয়ে চলে গেছে ভূটানের ফুন্টসলিং । ডানেরটি জলপাইগুড়ি হয়ে শিলিগুড়ি তবে, মূল সড়কটি চলে গেছে আসাম। বাম দিকের সড়কটি ধরে জলপাইগুড়ি শহর বা’পাশে রেখে ঘন্টা দুয়েক চললেই শিলিগুড়ি। সুদীর্ঘ পুরাতনের স্বাচ্ছন্দ্য ধারণ করেই ছিমছাম পরিপাটি শিলিগুড়ি শহরটি; একই সাথে আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিস্ফুট। নতুন পুরাতনে অসামঞ্জস্য নয় বরং মেলবন্ধনে ঋদ্ধ, পুরাতন দু’চালা টিনের ঘরের পাশেই আধুনিক বহুতল ভবন, বহুতল মল। বেশকিছু সরকারী আধাসরকারী কার্যালয়। ঐতিহ্যমন্ডিত পুরাতন কাঠামোর গৃহাদিতে পরিচালিত হচ্ছে। সুপার মার্কেট, বিধান মার্কেট এলাকাটি মধ্যশহর বলেই মনে হলো, এখান থেকে যে কোন এলাকায় যাওয়ার পাবলিক পরিবহন সহজলভ্য, ভাড়া সহনীয়। আন্ত জেলা সড়ক ব্যবস্থা যথেষ্টই উন্নত, এশিয়ান হাইওয়ে এ শহরকে ছুঁয়ে যাওয়া উন্নত যোগাযোগ কাঠামোর প্রমাণ। উনিশ শতকের প্রায় প্রথমাবস্থা থেকেই রেলের দৃঢ়ভিত্তি রয়েছে শিলিগুড়িতে, যা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত রূপ। শহরের তিন প্রান্তে তিনটি আধুনিক মানসম্পন্ন রেলষ্টেশন। নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকেট কেটে ঐ দিনে চলাচলকারী যে কোন ট্রেনে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। পূর্ব প্রান্তে শিলিগুড়ি টাউনষ্টেশন। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে নিউ জলপাইগুড়ি (এনজিপি) যা যথার্থই বিরাট ও ব্যস্ততম, মূলত কলকাতা-গোয়াহাটিগামী ট্রেনসহ অন্যান্য  গন্তব্যের ট্রেন এখান ছুঁয়েই সারা ভারত জুড়ে চলাচল করে । আর শহরের উত্তর প্রান্তে শিলিগুড়ি জংশন, যা ‘জংশন’ নামেই পরিচিত। সেখান থেকে বিহার, উওর প্রদেশসহ অন্যান্য-সারা ভারত, সাথে দার্জিলিং-এর টয়ট্রেন চলাচল করে। ব্রডগেজ, মিটারগেজ এর সাথে ছোট বেলাতেই পরিচয় ,এবার নেরোগেজ যা শিলিগুড়ি জংশন থেকে দার্জিলিং এর ঘুম’ পর্যন্ত বিস্তৃত। সড়ক পথে যেতে তিস্তা নদীর উপর সেতু পার হতে হয়, একই সমান্তরালে রেলেরও দীর্ঘ সেতু। একটু অবাক হতে হয় চলমান বর্ষা মৌসুমে নদীটিকে পানিহীন দেখে। জানা যায় উত্তরে গজলডোবা নামক স্থানে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের দ্বারা পানি প্রবাহ শিলিগুড়ি শহরের ভিতর দিয়ে বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে নেয়ায় এমন অবস্থা। শহরের ভিতরে ক্যানেলটি টলমল পানিতে টইটুম্বুর, এর আশপাশের ভূমি সতেজ ফসলময়, যা জলপাইগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত। শিলিগুড়ি এমন একটি মহকুমা শহর যার উত্তর অংশের ভূমি দার্জিলিং আর দক্ষিণাংশের ভূমি জলপাইগুড়ি জেলার অংশ সমন্বয়ে কর্পোরেশন হিসাবে পরিচালিত।2 অবস্থানগতভাবে এই মহকুমা শহরটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ। এ শহরটি চারটি পৃথক রাষ্ট্রের নৈকট্য ও স্পর্শে সমৃদ্ধ নেপাল, চীন, ভূটান, বাংলাদেশ। যার ফলে বাণিজ্যিক ও পর্যটন ক্ষেত্রে এর অবস্থান প্রথম সারির, এতে যোগাযোগ ব্যবস্থার ভূমিকাও অপরিসীম । বছর জুড়েই দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যটক চষে বেড়ান শিলিগুড়ি। শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কয়েক’টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে, যেখানে বহিঃবিশ্বের ছাত্র ছাত্রী নিয়মিত শিক্ষা গ্রহণ করেন, শিক্ষার মান প্রশ্নাতীত। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এখানকার হাসপাতালগুলো সুনামের অধিকারী, দেশীয় পর্যায়ে সুনাম অর্জনকারী ডাক্তারগণ এখানে চিকিৎসা প্রদান করেন। বহু বর্ণ, গোত্র, ধর্ম ও বহু ভাষাভাষী মানুষের সহাবস্থানের এক অপূর্ব শহর এটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলানিকেতন বিস্তৃত সবুজময় সমতল থেকে উচ্চভূমি , মহানন্দা, তিস্তার মতো খরস্রোতা আবার ক্ষীণবহা নদী , গরুমারা জঙ্গল সমন্বয়ে প্রাকৃতিক প্রাচুর্য সমৃদ্ধ এক অনন্য দৃষ্টি ও মনকাঁড়া ভ্রমণ উপযোগী শহর শিলিগুড়ি। থাকার জন্য শহরের হোটেল পরখ করার সুযোগ হয় নাই। সে আরেক গল্প। দীর্ঘদিন থেকেই মানিকে’র ছেলেমেয়ে শিলিগুড়িতে লেখাপড়া করে। এড. মানিক লাল দে, বাচ্চাদের পড়ালেখার সূত্র ধরে এক পর্যায়ে শিলিগুড়ি শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে তার স্ত্রী সবিতা’কে সেখানে বাচ্চাদের দায়িত্ব পালনের জন্য রেখে আসে। বড় মেয়েটা প্রায় এগারো বছর ধরে আর জমজ ছেলে দু’টো বছর পাঁচেক হলো, আর ছেলেদের সময় থেকেই ওদের মা’ পরবাসী । বড় মেয়ের চাপাচাপিতে ইন্ডিয়া যাবো বলে আমি যখন মন স্থির করি, বিষয়টি মানিক জানতে পেরে আমার চেয়ে অধিক উৎসাহ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন আমাকে তাগাদা দিতে থাকে এবং তার যাওয়া আসার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে থাকে। তার তাগিদে পাসপোর্ট জমা দেই এবং দু’টি রুট চ্যাংড়াবান্দা ও ডাউকী উল্লেখে ভিসা প্রাপ্ত হই, এর সুফল ভোগ করি এক প্রান্ত দিয়ে ঢুকে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে। মানিক আইনজীবীদের অনেককেই নিয়ে যেতে চেয়েছে কেউই যেতে পারেননি। পুরো পরিবার আমেরিকার ইমিগ্রেন্ট হয়ে যাওয়ায় এবার তার শেষ যাওয়া, সকলকে নিয়ে স্থায়ীভাবে চলে আসবে তাই। তার আপসোস সে ওখানে থাকতে কাউকেই নিয়ে যেতে বা দেখাতে পারলো না। সে জন্যই আমি যাবো জেনে মানিক প্রচন্ড উৎসাহী হয়ে উঠে। সে নিজ দায়িত্বে টিকেট ইত্যাদি করিয়ে নেয়, একসাথে। সিলেট থেকে ট্রেনে রিজার্ভেশন এ ঢাকা, ঢাকা থেকে এস.আর শ্যামলীতে বুড়িমারী। শিলিগুড়ি গিয়ে দুপুরে পৌঁছেই, সবিতার দায়িত্বে গরম খাওয়া দাওয়া। বাচ্চাগুলো আমার মেয়েকে পেয়ে তাদের মতো করে আনন্দে মেতে থাকলো। মানিক আগেই শর্ত দিয়েছিলো কষ্ট করে ফ্লোরিং করে থাকবেন তবু হোটেলে যেতে পারবেন না। ফ্লোরিং করতে হয়নি দু’ রুমের একটিতে আমি ও মেয়ে ছিলাম, ওর বাচ্চারা বাড়িওয়ালার তৃতীয় তলার একটি রুমে। বাড়িওয়ালা বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া লোক, ওখানে জায়গা জমি কিনে প্রতিষ্ঠিত, খুবই অমায়িক স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই, ছোট দু’টি বাচ্চা আছে, মিশুক দম্পতি । মানিক’কে ছোটবেলা থেকেই জানি ঘনিষ্ঠতাও আছে, দীর্ঘদিন থেকে পেশার কারণে সবসময়ই কাছাকাছি থাকায়, বোঝাপড়াও ভালো। সবিতা’কে বিয়েতে দেখেছি, পরে মাঝেমধ্যে দেখা হয়েছে কথাও হয়েছে। কিন্তু, এতোটা জানতে পারতাম না যদি ওর আতিথেয়তায় ক’টা দিন না কাটতো। যখন একটা অবস্থান স্থায়ীভাবে গুটিয়ে ভিন্ন পরিবেশে যাত্রার গুছগাছে ব্যস্ত,যার সবটুকুই করছে সবিতা। ঐ সময়ে অতিথি সামলানোর মন মানসিকতা বা ধৈর্য থাকার কথা নয় বরং বিরক্তই হবে, অন্য সকলেই। অথচ সবিতা, উল্টো আমাদের জন্য সে কিছুই করতে পারলো না বলে আফসোস করতে করতে শেষ হচ্ছিল। তরিতরকারি মাছ মাংস বাজার করা থেকে রান্নাবান্না, ঘর গেরস্থালী বিদেশ বিভূঁইয়ে সবিতা হাসি মুখে নির্বিরোধ নিরলসভাবে সবকিছু একাই সামলে নিয়েছে, বলতে গেলে মানিক’কে কিছুই করতে হয়নি। মানিক সত্যি ভাগ্যবান, সবিতা প্রকৃষ্টই গৃহলক্ষ্মী নারীর উদাহরণ। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী।



আরো খবর