ভ্রমণ বেড়াতে ভারত-উত্তর থেকে উত্তরাখ-১৯

স্বপন কুমার দেব
হরিদ্বার-ঋষিকেশ-কনখল
হরিদ্বারের গঙ্গায় ‘হর কি পেইড়ী’ ঘাটে প্রতি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় সন্ধ্যারতি। আরতি চলে ত্রিশ মিনিট। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কি ঝড় বাদল, বৃষ্টিতে সন্ধ্যা আরতির কোন বিরাম বা বিরতি নেই। সময় ত্রিশ মিনিট হলেও লোক সমাগম হতে থাকে কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই। সন্ধ্যারতি দেখতে বা উপভোগ করতে কিংবা অংশ নিতে হাজার হাজার লোকের আগমন ঘটে। এমনই আকর্ষণীয় ও ভক্তি রসে আপ্লুত এই অনুষ্ঠান, যে শুধু প্রতিদিন সন্ধ্যারতি দেখার জন্য দিনের পর দিন হরিদ্বারে থেকে যাওয়া যায়। সূর্য্যদেব যখন গঙ্গাতটে পশ্চিম দিগন্তে অস্তমিত হতে থাকেন তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় সন্ধ্যারতির আয়োজন। ঘাটের দু’পাড়ে হাজার হাজার লোকের ভীড় জমে উঠে। ধাপে ধাপে সিঁড়ি লোকে লোকারণ্য। সবাই সুবিধা মতো জায়গায় বসা বা দাঁড়ানোর জন্য ব্যস্ত। তবে বিশৃংখলা নেই। প্রচুর ভলান্টিয়ার আছে। দু’পাড়ে দীর্ঘ জায়গায় সমবেত ভক্তদের হাতে হাতে প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ আর ফুলের থালি। আরতি শুরু হলে এগুলি ভাসিয়ে দেয়া হবে পবিত্র গঙ্গার ¯্রােতধারায় পরিবার আর প্রিয়জনের মঙ্গল কামনায়। উঁচু উঁচু বেদীতে পুরোহিতরা বসে আছেন। তাদের কাছে অনেকে তর্পন করছেন। থরে থরে ফুলের থালি আর প্রদীপের পসরা সাজিয়ে বিক্রির শেষ নেই। মুহূর্তে যেন নি:শেষিত হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার ফুল আর প্রদীপ। আমরা ইতিমধ্যে ঘাটে পৌঁছে গেছি। কিন্তু দেরী হয়ে গেছে। আরতি শুরুর সময় অতি সন্নিকটে। বসার জায়গা নেই। এমনকি দাঁড়াতে গিয়েও উপযুক্ত স্থান পাচ্ছি না। পাদুকা রেখে এসেছি এক কোণায়। সেখানে হাজার হাজার জুতার  স্তুপ। আরতি শেষে ছত্রভঙ্গ হলেও জুতা হারায় না। এখানে বলে রাখছি, যে কদিন হরিদ্বারে ছিলাম প্রতিদিন আগেভাগে গিয়ে প্রাণভরে আরতি উপভোগ করেছি আর গঙ্গা জলে ভাসিয়ে দিয়েছি প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ আর পুষ্প রাশি। একদল পুরোহিত একই রং এর শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান  করে আরতিকালীন সময়ে মন্ত্র উচ্চারণ করেন। ইতিমধ্যে পুরোহিত দল সিঁড়ির শেষ ধাপে ¯্রােতধারার পাশে বিশেষ স্থানে অবস্থান নিয়েছেন। সেই বিশেষ মুহূর্ত এসে গেল। অস্তগামী সূর্য্যরে লাল আভা দিগন্তে মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে হাতে হাতে থাকা হাজার হাজার প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ দু’পাড় থেকে জলে ভেসে প্রচন্ড ¯্রােতে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরতে থাকে। একই সঙ্গে হাজার হাজার ফুলের ডালি অনুসরণ করতে থাকে প্রজ্জ্বলিত সারি সারি প্রদীপকে। অপূর্ব সুন্দর সেই দৃশ্য। গঙ্গাদেবী যেন বিয়ের কনের সাজে সজ্জিত হয়েছেন। বিশেষ পুরোহিত দলের বিশুদ্ধ সংস্কৃত ভাষায় সুরেলা কন্ঠের ছন্দময় মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে কাসর ঘন্টার আওয়াজ সমস্ত গঙ্গাতটে এক স্বর্গীয় এবং অবিস্মরণীয় দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। মিষ্টি ধুপের গন্ধ বাতাসে ঘুরপাক খায়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাজার হাজার ভক্ত পর্যটক জনতা উপভোগ করছেন হরিদ্বারের গঙ্গাঘাটের বিখ্যাত নিত্যদিনের সন্ধ্যা আরতি। বলা যায় অতুলনীয়। কেবল নিজের সঙ্গে নিজেরই তুলনা। আরতি উপভোগ করে যখন হোটেলে ফিরলাম তখন হোটেল সরগরম। এমনিতে শীতকালে এ অঞ্চলে বেড়ানোর মৌসুম নয়। যাওয়ার সময় দেখে গিয়েছিলাম হোটেলে বেশ নিরবতা। বোর্ডার কম। ফিরে দেখি হৈ হুল্লোড় চলছে। আসামের জোড়হাটের এক কলেজের প্রায় দেড়শো থেকে দু’শো জন ছাত্রী এসেছে তিনটি বাস বোঝাই দিয়ে। তাদেরই কলরব চলছে। এদের শীত টীত নেই। আমাদের সঙ্গে দু’তিনটি মেয়ের আলাপ হয়। হোটেলে রাত্রিবাস শেষে এই দল ভোরে রওয়ানা দেবে দেরাদুন, নৈনিতাল, মুসৌরী দর্শনে। এদের সমবেত কলকাকলিতে সারা হোটেলও কল্লোলিত। রাতের ডিনার খেলাম হোটেল ক্যাফেটোরিয়া ‘কৃষ্ণায়’। মেনু কাশ্মিরী পোলাও। নানাবিধ সবজি ও দেরাদুন রাইস দিয়ে তৈরী এ পোলাও অত্যন্ত সুস্বাদু। তেলের মাত্রা কম থাকায় সহজ পাচ্য। ডিনার শেষে রুমে গিয়ে ঘুম। ইতিমধ্যে হোটেল কর্তৃপক্ষ রুমে রুমে হিটার চালু করে দিয়েছেন। শীতের বদলে আরামের উষ্ণতা। দারুণ এক সুখনিদ্রা শেষে পরের দিন হোটেল থেকে বেরুলাম বেলা প্রায় দশটায়। সাধু-সন্ত ছাড়া শহর তখনও জাগেনি। বলা যায় হরিদ্বার সাধুদের শহর। রাস্তায় দলে দলে সংসার ত্যাগী সাধুদের চলাচল চোখে পড়ে। তাদের হাতে মগ ও খাবারের থালা। এরা যাবেন বিভিন্ন ধর্মশালায়। যেখানে গরম চা, পুরী এবং দুপুর ও রাতের খাবার বিনামূল্যে পরিবেশন করা হয়। এদিকে আমরা চলেছি হৃষিকেশের উদ্দ্যেশে। হরিদ্বার শহর থেকে ২৫ কি.মি উত্তরে। তবে হৃষিকেশ দেরাদুন জেলার অন্তর্গত। মহসিন ফোনে একজন গাইড ঠিকঠাক করে রেখেছেন। ২৫ কি.মি সামান্য দূরত্ব। জঙ্গলাকীর্ণ নিঝুম রাস্তা অতিক্রম করে প্রবেশ করলাম হৃষিকেশ মিউনিসিপ্যালটি শহরে। হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্রমতে ভারতের অন্যতম পবিত্র শহর হৃষিকেশ। অবস্থান হিমালয়ের পাদদেশে। প্রকৃত অর্থে এখান থেকেই হিমালয়ে যাত্রা করতে হয়। কথিত আছে ভগবান বিষ্ণুর এক অবতার থেকে হৃষিকেশ নামকরণ করা হয়েছিল। তীর্থযাত্রী এবং দেশ বিদেশের পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। প্রাচীনকাল থেকেই সাধু সন্তরা জ্ঞান অর্জনে হৃষিকেশে পদার্পন করে থাকেন। শ্রী রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ হৃষিকেশ এসেছিলেন। সীতা উদ্ধারে রাবনকে বধ করতে রামচন্দ্র এখানে গঙ্গায় ¯œান করে প্রায়শ্চিত্ত ও কৃচ্ছ্রসাধন করেন। আবার এও কথিত আছে রাম লক্ষ্মণ রাবণ বধের পর হৃষিকেশ আসেন এবং গঙ্গা¯œান করে নিজেদের শুদ্ধ করেন। হৃষিকেশকে বলা হয় বিশ্বের ইয়োগা/যোগ সাধনার রাজধানী। অনেকগুলি ইয়োগা সেন্টার আমাদের চোখে পড়েছে। হৃষিকেশের গঙ্গা শান্ত নিরব। কুলুকুলু ধ্বনিতে বহমান। এখানে গঙ্গার জলের রং আকাশ নীল। চারদিকে সুউচ্চ পাহাড়। কিছুটা দূরে গঙ্গাতটে দেখা যাচ্ছে সাধু/ঋষিরা যোগাসনে বসে তপস্যারত। রামায়ন যুগের আশ্রমিক পরিবেশের একটা ফ্লেভার পাওয়া যায় হৃষিকেশে। ইতিমধ্যে গাইড এসে গেছেন। প্রথমে দেখা হবে লক্ষ্মণঝুলা। রাম লক্ষ্মণ যখন এখানে এসেছিলেন তখন লক্ষ্মণ ঝুলন্ত দড়ির উপর দিয়ে গঙ্গা অতিক্রম করে এপাড় থেকে ওপাড়ে যান। গঙ্গার যে স্থানে ঝুলন্ত দড়ি ছিল সেই স্থানেই তৈরী হয় ঝুলন্ত লোহার ব্রীজ। লক্ষ্মণের নামে নামকরণ হয় লক্ষ্মণঝুলা। আধুনিক লক্ষ্মণঝুলা ব্রীজ প্রথম তৈরী হয়েছিল ১৯২৪ সালে। পরে বন্্যায় ব্রীজটি ভেসে যায়। পরে ১৯২৭-১৯৩০ সনের ভিতর পি.ডব্লু.ডি বিভাগ ব্রীজটি পুন:নির্মাণ করেন। আজ পর্যন্ত এই লোহার ব্রীজটিই বহাল আছে। ব্রীজের স্প্যান দৈর্ঘ্য ৪৫০ ফিট। প্রস্ত ৬ ফিট। লক্ষ্মণ ঝুলার উপর দিয়ে গঙ্গা অতিক্রম করা এক সুখকর অনুভূতি। নিচে আকাশ নীল গঙ্গাজলে মাছেদের খেলা। কেউ কেউ বাদাম ছুঁড়ে দিচ্ছেন। জলে মাছ থাকলেও হৃষিকেশ একেবারেই আমিষ ও এ্যালকোহল মুক্ত। ওপাড়ে এসে গাইড নিয়ে গেলেন লক্ষ্মণ মন্দির দর্শনে। পথিমধ্যে পাশাপাশি দুটি খাবার দোকানে দুটি আশ্চর্য্য জিনিস দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হলো। দুটি দোকানের সামনেই বিশালাকার দুটি পুরুষ মূর্তি। উদাম গা। স্ফীত উদর। বুঝা যায় ভালো খাবার খেতে খেতে এই অবস্থা। মাথায় চুটকী। গায়ের রং ফর্সা, পরনে শুভ্র ধুতি। মনে হয় জীবন্ত। চমৎকার খাবারের বিজ্ঞাপন। কিন্তু হতবাক ও চরম আশ্চর্য্য হওয়ার বাকী ছিল কিছুটা। মূর্তি দুটির সামান্য নড়াচড়া যেন টের পাওয়া যায়। কাছে গিয়ে দেখি আসলে এরা সত্যিই জীবন্ত। রক্ত মাংসের গড়া দীর্ঘকায় ও গায়ে গতরে স্ফীতকায় দু’জন পুরুষ। জীবিকার তাগিদে সারদিন এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আসলে অনেক কষ্ট। লক্ষ্মণ মন্দির দর্শন শেষে বাজারের ভিতর দিয়ে ছুটলাম গীতাভবন দেখতে। সব জায়গায়ই গাইডরা এক রকম। দোকানে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই হলো। বৌদি ফোনে বলে দিয়েছিলেন এখানে রুদ্রাক্ষ বলে একটি বিষয় আছে। কাজেই সাবধান ছিলাম। গাইডের চাপাচাপিতে ঢুকলাম এক দোকানে। দোকানী রুদ্রাক্ষের একটা খন্ড দেখিয়ে বললেন এটি আসল। আর কোথাও পাওয়া যাবে না। আর এটি বিক্রির জন্য নয়। ক্রেতাদের এরকম আসল ও দুর্লভ জিনিস বিনামূল্যে দেখানোর সুযোগ দেয়াই আসল উদ্দেশ্য। তবে আমাদের কাছে যেটি মনে হলো সেটি হলো রুদ্রাক্ষ দেখিয়ে ক্রেতাদের মন গলিয়ে অন্য পাথর বিক্রি করাই আসল উদ্দেশ্য। কৌশলে দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রতি দোকানে একই অবস্থা। অত:পর গীতা ভবনে প্রবেশ করেই মুগ্ধ হয়ে যাই। এত নিশ্চুপ ও শান্ত সমাহিত ভাব আর কোথাও দেখিনি। এ যেন তপোবনের ভিতর এক ঋষির আশ্রম। মূল মন্দিরে অনেকেই নিরবে আসন গেড়ে বসে গীতা পাঠ করছেন আর দু’চোখে অশ্রুধারা বয়ে চলেছে। বিরাট একটি অতিথি ভবন আছে। যারা দরিদ্র কিন্তু জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী তাদেরকে বিনা পয়সায় এই ভবনে থাকার ও খাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। দেখার অনেক কিছু। কিন্তু সবতো আর দেখা যাবে না। এবারে উঠলাম এক জীপ গাড়িতে। প্রায় ৫/৬ কি.মি দূরে গিয়ে থামলো। এখানে গঙ্গার উপরে আরেকটি ঝুলন্ত লোহার ব্রীজ। লক্ষ্মণঝুলার অনুরূপ। তবে দৈর্ঘ্যে একটু বেশী। একই রকম পরিবেশ আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য। এই ব্রীজটি তৈরী হয় ১৯৮৬ সালে। নামকরণ হয় রামচন্দ্রের নামে ‘রামঝুলা’। রামঝুলার উপর দিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে আবার হৃষিকেশ। বাজার থেকে চন্দন কাঠ কেনা হলো। অত:পর গাড়ি ছুটলো কনখলের উদ্দেশ্য। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক