ভ্রমণ- মালয় থেকে মালয়েশিয়া-১৫

স্বপন কুমার দেব
পেনাং সিটি ও রঙিন প্রজাপতি/শেষ পর্ব
মালয়েশিয়া ঘুরতে গেলে অনেকেই পেনাং ঘুরে আসেন। মূল উদ্দেশ্য হলো ‘লংকাইয়া’ নামের একটি দ্বীপ ভ্রমণ। পেনাং এর নিকটবর্তী হওয়ায় আসা যাওয়ার পথে উপরি পাওনা পেনাং দর্শন। ‘লংকাইয়া’ প্রাকৃতিক পরিবেশে সবুজ এক খ- দ্বীপ। দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন দু’দিন কাটানো। কিন্তু ‘লংকাইয়া’ যাইনি। এমনকি যাওয়ার কোন প্ল্যান প্রোগ্রামও ছিল না। তবে ভাবা উচিত হবে না যে পেনাং একক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরঞ্চ তার উল্টো। পেনাং মূলত মালয়েশিয়ার একটি ছোটখাটো দ্বীপ রাজ্য। পেনাং নগরী যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাছে ঐতিহাসিক ভাবে পরিচিত বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে পেনাং এর পত্তন হয় ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৪১খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জাপানীদের দখলে ছিলো। পরবর্তী সময়ে ফেডারেশন অব মালয়েশিয়ায় যোগদান। কলিং কোড বা টেলিফোন কোড ‘+৬০৪’। পেনাং নামের প্রতি আমার ছোটবেলা থেকেই বেশ একটা আকর্ষণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নানা ঘটনায় সিংগাপুর এবং পেনাং এর নাম উঠে এসেছে। ছোট বেলায় যখন একচেটিয়া দেশী বিদেশী গোয়েন্দা সিরিজের বই পড়তাম তখনও বিভিন্ন দুর্ধর্ষ ঘটনায় পেনাং নামটি পাওয়া গেছে। সেই থেকে বোধ হয় পেনাং এর প্রতি অবচেতন মনে একটা দুর্বলতার সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই কাছাকাছি এসে ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ না করে কিভাবে চলে যাই। তদুপরি একটি দেশে কেবল একটি শহরকে ভিত্তি করে ঘুরাঘুরিতে ভ্রমণ কেমন যেন ঘাটতি থেকে যায়। সামনে ২৫ শে ডিসেম্বর বা বড়দিন। চারিদিকে উৎসবের হৈ চৈ। টিকিট, হোটেল বুকিং ইত্যাদির যোগাড়যন্ত্র বেশ ঝামেলার ব্যাপার। কুয়ালালামপুর থেকে বেশ উত্তরে সড়ক পথে ৩৫৫ কি.মি দূরত্বে পেনাং সিটির অবস্থান। বাসে গেলে সময় লাগবে প্রায় চার ঘন্টা। এমন কি পাঁচ ঘন্টাও লাগতে পারে। ছুটি ছাটা উৎসবের সময়ে মহাসড়কেও কিছু কিছু জ্যাম লেগে যায়। কুয়ালালামপুর থেকে এরোপ্লেনেও পেনাং যাওয়া যায়। আকাশ পথে দূরত্ব কম। সময় লাগবে মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট। কিন্তু খরচ অনেক বেশী। সড়ক পথে ভ্রমণ বেশীর ভাগ যাত্রীই পছন্দ করেন। যেমন উপভোগ্য তেমনি আরামদায়ক। নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে। তেমনি মসৃন চার লেনের রাস্তা আর সবার উপরে অতি আরামদায়ক বিভিন্ন কোম্পানীর বাহন অর্থাৎ বাস। পেনাং এর উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮ ঘটিকায়। আটটা মানে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় আট। বিভিন্ন টার্মিনাল আছে। একটি বাস ছবিতে যত সুন্দর করে আঁকা যায় তার চেয়ে দৃষ্টিনন্দন বড় বড় বাসগুলি। কিন্তু ভেতরে উঠে সিট নাম্বার মিলাতে গিয়ে মনটা একেবারেই খারাপ হয়ে গেলো। একদম পেছনের সারির লম্বা সিট। চারজনের বসার জায়গা। স্বদেশে আমরা খুব ঠেকায় না পড়লে পেছনের দিকের টিকেট কিনতে চাইনা। আর একদম পেছনের সারিতে তো নয়ই। তা যত নামী দামী এসি গাড়ীই হোক না কেন। আরাম করে বসা কিংবা হেলান দেয়া যায় না। গা ঘেঁষাঘেসি আর ঝাঁকুনির কষ্ট তো আছেই। এবারে মালয়েশিয়ায় এসে এই দুরবস্থায় পড়লাম। মন বেজার করে আমরা সিটে বসতেই আশ্চর্য্য ঘটনা। মন ভালো হয়ে গেলো। একদম পেছনের সারির সিটের কোন বদগুণ নেই। হেলান দিয়ে বসা যায়। একজনের শরীর আরেকজনের শরীরে লাগে না। সামনে পা লম্বা করার প্রচুর স্পেস। এখন চলার পথে দেখি কোন ঝাঁকুনি কিংবা অস্বস্তি নেই। সবই আরামদায়ক। তার উপর চাক্কার উপর সিট যেভাবে আমরা এড়িয়ে যাই তেমন কোন ব্যাপারও নেই। বাসের সিট বিন্যাসও ভিন্ন ধরণের। একদিকে ফাঁক ফাঁক করে সিঙ্গেল সিট। তেমনি অন্যদিকে ডাবল। পেছন থেকে বাসের মেঝে কিছুটা ঢালু হয়ে নেমেছে। অনেকটা সিনেমা হলের কিংবা আধুনিক অডিটরিয়ামের মতো। বাসের ভেতরে বেশ একটা ঘরোয়া মেজাজ। শহর ছেড়ে গাড়ী চলেছে প্রশস্ত হাইওয়ে দিয়ে। গতি টের পাওয়া যায় না। দুদিক থেকে পিপিলীকার মতো গাড়ীর সারি। কিন্তু কোথাও কোন সাড়া শব্দ কি জোড়ালো হর্নের আওয়াজ নেই। একটা ব্যাতিক্রমী জিনিস লক্ষ্য করা গেলো সে দেশের সর্বত্র। রাস্তাঘাটে মোটর সাইকেল চলাচল প্রায় নেই বললেই চলে। দৈত্যাকার প্রচণ্ড গতি সম্পন্ন মোটরসাইকেল নেই বললেই চলে। যে স্বল্প সংখ্যক দু’চাকার যান আছে তা কম গতি সম্পন্ন স্কুটার বা স্কুটি। মাথায় হেলমেট পরা একেকজন নিরীহ আরোহী। বড় সাইজের মোটর সাইকেল যে কয়েকটি দেখা যায় তার সব আরোহীই হাইওয়ের পুলিশ। যাই হোক পেনাং এর পথে দু’দিকে বন পাহাড়ী সবুজ পরিবেশ। রাস্তাও মাঝে মাঝে ঢেউ খেলানো। বেশীর ভাগ যাত্রীই কম বয়সী ছেলে মেয়ে। কানে ইয়ার ফোন। হাতে ল্যাপটপ কিংবা বড় বড় স্মার্ট ফোন। অনেক আগে যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ বইতে এই ধরণের একটি বিষয় পড়েছিলাম – বিজ্ঞান যেমন আমাদের অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে তেমনি আবেগকে করেছে দূর। লেখক জীবিত থাকলে এখনকার অবস্থাকে কিভাবে প্রকাশ করতেন জানিনা। রাস্তায় মাঝে মাঝে সামান্য জ্যাম পাওয়া গেলেও তা আদৌ ভয়াবহ নয়, বলা যায় চলমান জ্যাম। একটু পরেই ফ্রি। প্রায় সাড়ে চার ঘন্টায় পেনাং শহরের বাস টার্সিনালে বাস পৌঁছে গেলো। হোটেল ও ট্যাক্সি ক্যাব কুয়ালালামপুর থেকেই ঠিক করা ছিলো। চায়নাম্যান ড্রাইভারকে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে আরো আধ ঘন্টা সময় চলে গেলো। পেনাং আসার পথে যেটি দেখার মতো বেশী সুন্দর ছিলো তা হলো সাগরের উপর দিয়ে সাড়ে তেরো কি.মি. দীর্ঘ পেনাং ব্রীজ। এই ব্রীজটিই মালয়েশিয়ার মূল ভূখ-কে সাগর পাড়ি দিয়ে পেনাং রাজ্যকে যুক্ত করেছে। ১৯৮৫ সালে এই ব্রীজটির নির্মাণ কার্য্য সম্পন্ন হয় এবং চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। আমরা পেনাং সিটির ভেতর দিয়ে চলেছি। বাড়ীঘর, রাস্তাঘাট সব কিছুই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম। হঠাৎ রাস্তার এক পাশে চোখে পড়ল ইংরেজীতে লেখা Ñ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম, পেনাং। বিরাট ক্যাম্পাস। মনে মনে ঠাকুরকে প্রণাম করলাম। এদিকে আমাদের হোটেলটি ছিলো বেশ দূরে। রাস্তাও হঠাৎ সরু হয়ে গেছে। সামনে বড়দিনের উৎসব। দু’দিকে গাড়ীর আসা যাওয়া। কিছুটা যানজটের কষ্ট পেতেই হলো। তারপর সময়ও অনেকটা অপচয় হলো। অবশেষে সমুদ্রের পাড় দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে আমাদের হোটেল। নির্জন এলাকা। আর দেরি নয়। ঝটপট রেডী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় যাই। ড্রাইভারই ভরসা। প্রথমেই সী বীচ। কালো সমুদ্র, পাথুরে পাহাড়। ঢেউ পাথরে এসে আছড়ে পড়ছে। ছোট খাটো সরু বীচ। সে রকম জমকালো নয়। তবে প্রচুর লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে উপভোগ করতে এসেছেন। বীচের বালুতে পাটি বা চাদর পেতে বসেছেন। সঙ্গে আনা খাবার দাবাড়। আমরাও বসলাম। ভালোই লাগছে। দূর সমুদ্র যেনো অধিক কালো হয়ে আসছে। ঝড়, বৃষ্টি আসবে নাকি ভাবতে ভাবতে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে লাগলো। আমরাও তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে গাড়ীতে উঠে গেলাম। পরবর্তী গন্তব্য স্থান কোথায় হবে। ড্রাইভার কাম গাইডের পরামর্শ মতো চললাম Butterfly Farm এর উদ্যেশ্যে। অর্থাৎ প্রজাপতির ফার্ম। রং বেরং এর প্রজাপতির প্রজনন আর উড়াউড়ি। বিশাল বিল্ডিং কমপ্লেক্স। চড়া মূল্যের টিকেট। এখন আর ফেরা যায়না। নানা দরজা দিয়ে আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন কর্মীরা। ভেতরে অনেকটা গোলক ধাঁধার মতো। মনে হয় মাটির নিচে কোন জগতে চলে এসেছি। বিশাল পাথুরে পাহাড় কেটে কেটে গুহার মতো তৈরী করা হয়েছে। প্রায়ান্ধকার পরিবেশ। অসংখ্য বিভিন্ন জাতের ফুলের গাছ। আর ডালে ডালে বিভিন্ন রং ও ধরণের অসংখ্য প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে কিংবা রঙিন পাখা মেলে বসে আছে। অপূর্ব দৃশ্য। কাজেই ফটো উঠানোর শেষ নেই। বাঙালি কবিরা প্রজাপতি নিয়ে তাদের অপূর্ব অনুভূতি অজস্র গানে আর কবিতায় প্রকাশ করে গেছেন। মালয়েশিয়ার কবিরা প্রজাপতি নিয়ে কি ভাবেন জানিনা। ভেতরে অনেক জায়গা কিন্তু সবকিছুই সেই গোলক ধাঁধার মতো। অন্ধকার গুহায় অনেক পুরানো প্রাণির রেপ্লিকা আছে। সরু আলো আঁধারী পথে সেখানে যেতে হয়। আছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ছোট্ট লেক। কৃত্রিম উপায়ে অজস্র ধারায় বৃষ্টির মতো জল পড়ছে আর বেরিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা। অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি হয়ে গেছে। এবার বেরুতে হবে। কিন্তু বেরুবার রাস্তা আর পাই না। ঘুরে ফিরে একই জায়গায়। অবশেষে জিজ্ঞাসা করতে করতে একটি হলরুমে। সেখানে ছোটদের পোষাক আশাকের বিরাট মার্কেট। সেটি পেরিয়ে অবশেষে বাইরে। অত:পর হোটেলে প্রত্যাবর্তন। অনেক বাংলাদেশী বাঙলিরা আছেন পেনাং এ। রীতিমতো ব্যবসা বাণিজ্যে করছেন ও বিয়ে শাদী করে ঘর সংসার পেতেছেন। তাদেরই একটি রেঁস্তোরায় রাতের খাবার খেলাম। অনেকদিন পর খাঁটি ডায়াবেটিক খাবার। লাল আটার নরম রুটী। ঘন সবুজ সবজী, ডাল ইত্যাদি। আমার স্ত্রী ও মেয়ে খেলো অন্য কিছু। হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালের বাসে আবার কুয়ালালামপুর। এবারে সিট সামনের দিকে। কুয়ালালামপুর হোটেলে আবার একরাত। পরদিন সম্ভবত: ২৪ শে ডিসেম্বর দিনের ফ্লাইটে আবার চার ঘন্টার আকাশ যাত্রায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। পরিচিত ভিড়-ভাট্টা, হাঁক-ডাক আর আর যানজটের গন্ধ নাকে আসে। তবুও ভালো লাগে স্বদেশ। কিছু কিছু ঘটনা রইল বলার বাকী। থাক সেগুলি। বিদায়। সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকার সম্পাদক সহ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ। (সমাপ্ত)
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক