ভ্রমণ- মালয় থেকে মালয়েশিয়া-১১

স্বপন কুমার দেব
চকোলেটের গল্প – ছোটদের পর্ব

শিশুদের ও ছোটদের সন্তুষ্ট রাখতে চকোলেটের মত বিকল্প জিনিস বোধ হয় এখন অব্দি তৈরী হয়নি। হলেও চকোলেট কে টেক্কা দেয়া সম্ভব হয়নি। শিশুদের জন্য উপহারের তালিকায় চকোলেটের স্থান সর্বাগ্রে। এশিয়ার মধ্যে মালয়েশিয়া চকোলেট সাম্রাজ্য হিসেবে শ্রেষ্ঠ। সেখানকার শিল্পখাতে চকোলেটের মর্যাদা আমাদের গার্মেন্টস-ইন্ডাস্ট্রির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। রপ্তানী ও বিক্রি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তারা। তবে বিশ্বে চকোলেট উৎপাদনে সর্বাগ্রে সুইজারল্যান্ড। আপনি মালয়েশিয়া যাবেন আর সেখানকার স্বাদু চকোলেট বাচ্চাদের জন্য নিয়ে আসবেন না, তা হয় না। চকোলেটের জন্য আলাদা সব দোকান। সব সময় গমগমে ভীড়। সেলসম্যানরা মেশিনের মত ঘুরপাক খাচ্ছেন। বর্তমানকালের অভিভাবকেরা দাঁতের ক্ষয়ক্ষতি সহ নানা ধরনের অসুখ বিসুখের কারণে বাচ্চাদের চকোলেট খেতে বারন করলেও আপতকালীন সময়ে চকোলেটই শেষ সমাধান। কাজেই চকোলেটের জয়জয়কার ও অগ্রগতি অব্যাহত আছে। পাশ্চাত্য দেশে বড়দের কাছেও চকোলেট প্রিয়। চকোলেটের ইতিহাস একটু আলোচনা করা যেতে পারে। ‘ক্যাকেও’ নামে এক ধরনের গাছের ফলের বীজ বা বিচি থেকে চকোলেট বানানো হয়। বীজ দিয়ে কাই তৈরী হয়। অত:পর গরম জল বা দুধের মিশ্রণে সৃষ্টি হয় সুস্বাদু চকোলেট। মিশানো হয় কলা সহ ইত্যাদি আরো কিছু উপাদান। ‘ক্যাকেও’ নামের মহামূল্যবান বৃক্ষটি সাধারণত: দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে জন্মে থাকে। চকোলেট ফার্মের মালিকেরা এই ফলের বীজ সংগ্রহ করে ফ্যাক্টরীতে নিয়ে আসেন। চকোলেটে রূপান্তরের মূল প্রক্রিয়াটি সাধারণের কাছে রহস্যজনক বা গোপনীয়। চকোলেট ফার্ম/ফ্যাক্টরি ব্যবসায় নামলে আপনিও নিয়ম কানুন মেনে রহস্যের চাবিকাঠি জানতে পারবেন। চকোলেট আর মালয়েশিয়ার মধ্যে এতো মাখামাখি শুরু হলো কিভাবে তা সবাই জানতে চাইবেন। ১৭০০ খৃ: এর মাঝামাঝি সময় থেকে ১৮০০ খৃ: এর মাঝামাঝি সময়ে মালয়েশিয়ায় চকোলেটের সূত্রপাত ঘটে। ঐ সময় সেখানে চকোলেট বৃক্ষ বা ‘ক্যাকেও’ বৃক্ষের চাষ শুরু হয়েছিলো। স্থান সেই ঐতিহাসিক মালাক্কা। কিন্তু ১৮৫৩ খৃ: এর পূর্বে বাণিজ্যেকরণ শুরু করা যায়নি। বীজের আবরণ তৈরীতে আরেকটা সহযোগী জিনিসের আবাদ করতে হয়। সেটি শুরু হলে মালয়েশিয়ায় মহা ধুম্ধামে চকোলেট ফার্ম/ইন্ডাস্ট্রি নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সনের মধ্যে সেখানে নানা ধরনের চকোলেট বাজারজাত হতে থাকে। ‘ক্যাকিও’ বা সংক্ষেপে ককো ফলের বীজ/বীচির পাউডার, বিচি থেকে উৎপন্ন মাখন ইত্যাদির উচ্চমান বজায় রাখতে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। অত:পর মালয়েশিয়ায় চকোলেটের চরম উন্নতি। চকোলেটেরই আরেক ধরনের সংক্ষিপ্ত প্রডোকশনের নাম ক্যান্ডি। সেরকম আরেকটি নাম টফি। সবগুলিই স্বাদে মূলত মিষ্টি। তবে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য সুখবর আছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় উন্নত মানের সুগার ফ্রি চকোলেট বাজারে এসে গেছে। তবে মূল্য চড়া। মালয়েশিয়ার বাজারে প্রায় ২৪৮৩ (দুই হাজার চার শত তিরাশি) ধরনের চকোলেট, টফি ও ক্যান্ডি পাওয়া যায়। পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় তালিকায় চকোলেট ফার্ম অনেক আগেই তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। ফার্ম/কাম দোকানগুলিতে উপচে পড়া ভীড়। কুয়ালামপুর, মালাক্কা ইত্যাদি শহরেই আছে অনেকগুলি বড় বড় চকোলেট শপ্। নির্জন হাইওয়েতে হঠাৎ পাওয়া যায় সারি সারি গাড়ী পার্ক করে আছে। কারণ সামনে চকোলেটের দোকান। সর্বত্র নানা রং ও জাতের চকোলেট। তেমনি সাইজেও বৈচিত্র। আছে প্যাকেট বন্দী ও খোলা দু’ধরনেরই। দুধের স্বাদ, ফলের স্বাদ, বাদামের স্বাদ ঝাল, মিষ্টি, টক, নেই কোনটি? কোন কোন দোকানে উপহারের জন্য বিশেষ ধরনের চকোলেট পাওয়া যায়। ‘ইয়াম্মি’ চকোলেটে আবার অসাধারণ স্বাদ। ক্যান্ডি, টফি ও চকোলেটের এক ধরনের গিফট বক্সও পাওয়া যায়। সেগুলি আবার স্বাস্থ্য সম্মত। এমন কি উচ্চ রক্তচাপ, সুগার, ক্যালোরি নিয়ন্ত্রন পর্যন্ত করতে পারে। বিখ্যাত সব চকোলেট ব্র্যান্ডের মধ্যে আমাদের দেশে পরিচিত ‘ক্যাড্বেরি’ এবং ‘কিট কাট’ এর নামও আছে। কিট কাট এর প্রথমে নাম ছিল KIT CAT. পরে হয় KIT KAT । এছাড়া মার্স, গ্যালাক্সী ইত্যাদি হরেক রকমের নামকরা সব ব্র্যান্ড আছে। খোলা, বক্সে, মোড়কে নানা ভাবে বাজারজাত হয়ে থাকে। চকোলেটের দোকানে এত বিক্রি আর ভীড় যা না দেখলে বুঝা যায় না। উচ্চ মূল্যের বিলাসী চকোলেট সহ মাঝারি ও অল্প মূল্যের চকোলেটে টইটুম্বুর দোকানগুলি। আমরা একাধিক চকোলেটের দোকান ও ফার্মে ঢু মেরেছি। মেয়ের বান্ধবীদের ফরমায়েশ ছিল চকোলেট নিয়ে যাবার জন্য। তদুপরি আমাদেরও অনাগ্রহ নেই। দোকানে ঢুকার সঙ্গে সঙ্গে একটি মজার ব্যাপার আছে। সেল্স এর মেয়েরা নানা ধরনের পাত্র হাতে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসেন। পাত্রের মধ্যে খোলা চকোলেট ও ক্যান্ডি। আপনি একটা’দুটো খাবেন। একদম ফ্রি। মাগনা খাওয়া কেউ ছাড়েনা। কিন্তু ব্যবসার মূল মন্ত্রও এখানেই। নুন খেলে তো গুণ গাইতেই হয়। কাজেই কিছু একটা না কিনে দোকান থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। বিবেকে বাধে। চকোলেটের দোকানে বাচ্চাদের সব আইটেমই পছন্দ। স্বাদ ও সাধ্যের মধ্যে মিল রেখে এবং একই সঙ্গে ছোটদের হাসি আনন্দ অমলিন রেখে কেনাকাটার দায়িত্ব অভিভাবকদের। বেশ কঠিন কাজ। রাতের বেলায় চকোলেটের দোকানগুলি আলোর মালায় ঝলমলে এবং অধিক আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। শপিংয়ে সুবিধা হলো, যেমন বেশী মূল্যর আবার তেমনি কম মূল্যেরও চকোলেট পাওয়া যায়। মূল্য কম হলেও ভেজাল নেই। গুণগত মানও ভালো। স্বাদে একটু কম বেশী আর কি। আমাদের ছোটবেলায় ছিলো লজেন্স বা লেবেনচুষ্। কাচের বয়ামের ভেতরে রেখে বিক্রি হতো। নানা বিচিত্র স্বাদের। কোনটি খোলা আবার কোনটি রাংতায় মোড়ানো। চুষে খেয়ে শেষের দিকে দাঁত দিয়ে কড়মড় করে খাওয়া যেতো। লজেন্স বিক্রেতাদেরকে তখন আমাদের কাছে মনে হতো, এরা অতি ভাগ্যবান ব্যক্তি। যাই হোক, সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলির অধ্যায় কবেই পেরিয়ে গেছে বলতে পারি না। মেঘে মেঘে বেলাও অনেক হয়ে গেলো। এবার শেষ বিকেলের রোমন্থন। (চলবে)
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক