ভ্রমণ- মালয় থেকে মালয়েশিয়া-১২

স্বপন কুমার দেব
টুইন টাওয়ার

নাইন ইলিভেনের পর নিউইয়র্ক সিটির বিখ্যাত টুইন টাওয়ার/ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এখন শূন্য। নতুন নামকরণ হয়েছে গ্রাউন্ড জিরো। সেটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। যাই হোক্, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর শহরের বিখ্যাত টুইন টাওয়ার এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর চেয়ে সুউচ্চ ভবন মালয়েশিয়ায় কেন, অনেক দেশেও নেই। তবে এই সম্মানের সময়ও শেষ হয়ে আসছে। হয়তো ভাবছেন এটিও কি তাহলে কোন না কোন ভাবে গ্রাউন্ড জিরোতে পরিণত হবে? না তা নয়। খোদ কুয়ালালামপুর শহরে চলছে আরেকটি সুউচ্চ ভবনের শেষ পর্যায়ের নির্মাণ কাজ। আগামী দু’বছরের মাথায় উদ্বোধন হবে। বর্তমান টুইন টাওয়ার থেকে অনেক উঁচু। কাজেই বর্তমান টুইন টাওয়ারের গৌরবের দিন শেষ হতে চলেছে বলা যায়। বর্তমান জোড়া টাওয়ারটি পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার বলে মালয়েশিয়ায় সুপরিচিত। পেট্রোনাস সম্পর্কে পরে বলছি। টুইন টাওয়ার কে সহজ বাংলায় কি নামে ডাকা যেতে পারে? Twin মানে জমজ বা জোড়া। tower মানে সুউচ্চ দালান/মিনার/বুরুজ/গম্বুজ ইত্যাদি। তাহলে Twin tower কে একত্রে বলা যেতে পারে, দেখতে একই রকম এক জোড়া স্কাই স্ক্র্যাপার বা আকাশ চুম্বি টাওয়ার সদৃশ ইমরাত বা বিল্ডিং। কল্পনা যে ভাবেই করা হোক না কেন কিংবা ছবিতে যেভাবেই দেখা হোক না কেন সামনা সামনি অবলোকন করার অনুভূতিই আশ্চর্য্য রকমের আলাদা। পৃথিবীতে মানুষের প্রযুক্তি কতদূর এগিয়েছে তা কিছুটা আঁচ করা যায়। উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কুয়ালালামপুরের এই টাওয়ারটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বা আকাশচুম্বি বিল্ডিং বলে পরিচিত ছিলো। টাওয়ারটি দেখতে অনেকটা লম্বা টিউব আকৃতির। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ভবন এবং টুরিস্টদের কাছে আকর্ষনীয় করে নির্মিত হয়েছে। সর্বত্র বিজ্ঞাপনে মালয়েশিয়াকে চেনাতে টুইন টাওয়ারের ছবি প্রতীক কিংবা লগো হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই এটি যেমন ধারে কাটে, তেমনি ভারেও কাটে। সিসার পেল্লি নামে একজন আর্জেন্টাইন স্থপতি টুইন টাওয়ারের ডিজাইন বা নক্সা তৈরী করেন। কুয়ালালামপুরের যে এলাকায় টাওয়ারটির অবস্থান তার নাম জালান আমপাং (সম্ভববত: জালান এভিনিউ)। শুরুতে স্থান নির্ধারন নিয়ে আরেক মহাযজ্ঞ। মাটি, পরিবেশ, আবহাওয়া, বাতাস ইত্যাদি সম্পর্কে কঠিন সব পরীক্ষা নিরীক্ষা। আধুনিক ডাক্তারী চিকিৎসার টেস্টের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বাতাস পরীক্ষা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়ের একটি ছোট্ট গল্প। বর্ধমানের মিষ্টি খাবার সীতাভোগ ও মিহিদানা স্বাদে ও গন্ধে অত্যন্ত নামকরা। রাজা মশাই একবার বর্ধমানে গিয়ে সেখানকার সীতাভোগ, মিহিদানা খেয়ে অত্যন্ত প্রীত ও সন্তুষ্ট হন। নিজ রাজ্যে ফিরে গোপাল ভাঁড়কে নির্দেশ দেন বর্ধমান থেকে ঐ মিষ্টির কারিগর ও মালমশলা নিজ রাজ্যে নিয়ে আসতে। উদ্দেশ্যে রাজপ্রাসাদে বসে নিয়মিত সীতাভোগ, মিহিদানা খাবেন। গোপাল ভাঁড় যথারীতি আদেশ পালন করলেন। তৈরী হলো বিখ্যাত মিঠাই। মহারাজা মহা আগ্রহে খেলেন বটে তবে বর্ধমানের স্বাদ ও গন্ধ পেলেন না। এবার গোপাল ভাঁড়ের গর্দান যায় আর কি। মহারাজের জলদ গম্ভীর জিজ্ঞার উত্তরে গোপাল ভাঁড় করজোড়ে নিবেদন করলেন মহারাজ, বর্ধমান থেকে সবই আনা হয়েছে কিন্তু বায়ু বা বাতাস তো আনা সম্ভব নয়। এজন্যই গন্ডগোল। মহারাজ সন্তুষ্ট হয়ে গোপাল ভাঁড়কে পুরস্কৃত করলেন। কাজেই বাতাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাতাসের গতিবিধি নির্ণয় করা আধুনিক যুগে অত্যন্ত জরুরী। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে তো বটেই। কাজেই টুইন টাওয়ার নির্মাণে বাতাস পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অত:পর শুরু মাটি খুঁড়াখুঁড়ির কাজ। এই কাজ চলতো রাতে। উদ্দেশ্য দিনের বেলায় যাতে লোক চলাচলে অসুবিধা না হয়। পাঁচশত ট্রাক মাটি সরিয়ে নেয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলো। সমতল থেকে বিশাল আকৃতির গর্ত করা হয় ১০র্০ ফিট গভীর পর্যন্ত। সেই অতল গহ্বর থেকে শুরু হয় যমজ শিশুর জন্মের কার্যক্রম। ১৯৯২ সনে শুরু হয়েছিলো মাটির নিচের কাজ। ভিট পর্যন্ত আসতে সময় লাগে এক বৎসর। ১৯৯৩ সনে প্রাথমিক কাজ শেষ হয়। অত:পর চলতে থাকে সাজসজ্জা ও আনুসাঙ্গিক কাজকর্ম। ১৯৯৯ সালের কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে জোড়া টাওয়ারটির দ্বার উন্মোচন ঘটে। মোট খরচা হয়েছিলো তৎকালীন সময়ে মোট ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টাকায় কত হয় আমি গুনতে পারবো না। প্রতিটি টাওয়ারের উচ্চতা ১৪৮র্৩ ফিট। উপরের দিকে ৮৮টি ফ্লোর। মাটির নিচে ৫টি। মোট ফ্লোর এরিয়া বিয়াল্লিশ লক্ষ বায়ান্ন হাজার স্কোয়ার ফিট। প্রতিটি টাওয়ারে লিফট আছে চল্লিশটি করে। অগ্রভাগ কিছুটা সূঁচালো বা চিকন। সর্বোচ্চ ফ্লোরের আয়তন ১২৩র্০ ফিট। কাঠানো তৈরী করেন আলাদা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী। দুটি টাওয়ারের মাঝে সংযোগ ব্রিজটি তৈরী করে আরেকটি প্রকৌশলী সংস্থা। তেমনি দুটি টাওয়ারের জন্য পৃথক দুটি কোম্পানী কনস্ট্রাকশনের দায়িত্বে ছিলেন। আর.সি.সি বিল্ডিং। কিন্তু লাখ লাখ টন ইস্পাত, রড, বালু, সিমেন্টের ব্যবহারে ছিলো না কোন ভেজাল, কারচুপি কিংবা প্রতারণা ও দুর্নীতি। যাতে ভেঙে না পড়ে। যার ফলে টুইন টাওয়ারটি আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রতীক হয়ে এখনও গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বেশির ভাগ ফ্লোর এরিয়া পেট্রোনাস্ কোম্পানীর বিভিন্ন অফিসের দখলে। মালয়েশিয়ার সরকারী মালিকানাধীন সবচেয়ে বড় তেল গ্যাস কোম্পানীকে সংক্ষেপে বলা হয় পেট্রোনাস। তাদের হেড অফিসটিও এই টাওয়ারে অবস্থিত। পেট্রোনাস পুরোটা হলো NATIONAL PETROLIUM LTD. MALAYSIA। বিশ্বের পাঁচশতটি বড় কোম্পানীর মধ্যে পেট্রোনাস একটি। যাই হোক, টুইন টাওয়ারের সৌন্দর্য বর্ণনায় আসা যাক। কুয়ালালামপুর এক অর্থে টাওয়ারের শহর। আরো অনেক সুউচ্চ টাওয়ার আছে। তবে সেরা হলো টুইন টাওয়ার। দিনের বেলায় অনেকটা আটপৌরে দেখালেও রাতে হরেক রকমের আলোরমালায় এক মোহময়ী রূপ ধারন করে। এত লোক আর লোক। দুর্নিবার আকর্ষণ। চত্বরে চত্বরে আলোর মেলা। একদিকের ছোটখাটো লেকে জলের খেলার সঙ্গে আলোর মিশ্রণে পরিবেশ প্রকৃতি অপরূপ হয়ে উঠে। শুরু হয় ত্রিশ মিনিটের মিউজিক সেশন। সুরের মূর্চ্ছনায় মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে পৌঁছে যাওয়ার অনুভূতি জন্ম নেয়। লেকের জলে যে আলোর ছন্দময় কারুকাজ প্রদর্শিত হয় তা এক কথায় অপূর্ব। আলো আঁধারী পরিবেশ আর লেকের চার পড়ে অসংখ্য দর্শনার্থী। প্রতি রাতে এই দৃশ্যের যে ফটো উঠানো হয় তা গুনে শেষ করা যাবে না। টুইন টাওয়ারকে সামনে পেছনে ও সাইডে রেখে আরো যে সব ফটো সেশন চলে সেগুলির কথা না হয় বাদই দিলাম। রাতের টুইন টাওয়ার আর আশেপাশের দৃশ্য যেন পৃথিবীর নয়। অন্য কোন অতি উন্নত গ্রহের বাসিন্দা যেন আমরা সবাই। তবে সময়ের সঙ্গে কোন কিছুই পাল্লা দিতে পারে না। ঘড়ির কাঁটায় রাত ক্রমশ: গভীর হচ্ছে। স্তিমিত হয়ে আসছে কোলাহল। সময় ঠেলে দিলো বাস্তবতায়। মন না চাইলেও টুইন টাওয়ার চত্বর থেকে প্রস্থান করলাম। বাইরের রাস্তায় লোকজনের অনেক ভীড়। ফাস্ট্ফুডের বিখ্যাত চেইন শপ ম্যাক্ডোনাল্ড থেকে আমার মেয়ে রাতের কিছু খাবার কিনে নিলো। পিজা ইত্যাদি। লম্বা লাইন। খাবার হাতে আসতে বেশ সময় লাগে। অত:পর মোহাবিষ্টের মতো গাড়ীতে উঠে হোটেলের দিকে রওয়ানা দেই। (চলবে)
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক



আরো খবর