ভ্রমণ- মালয় থেকে মালয়েশিয়া ৪

স্বপন কুমার দেব
কাদামাটির স্তুপ থেকে আধুনিক কুয়ালালামপুর
কুয়ালালামপুর নগরী দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার রাজধানী হিসেবে সকলের কাছেই পরিচিত। এখনও তাই আছে। তবে পরবর্তীকালে কিছুটা ভাগ বসিয়েছে ‘পুত্রজায়া’ নামের আরেকটি আধুনিক শহর। ১৯৯০ সনে উন্নত মালয়েশিয়ার রূপকার ও স্থপতি সকলের কাছে সুপরিচিত মোহাম্মদ মহাথেরো দৃষ্টিনন্দন পুত্রজায়া শহরটি গড়ে তুলেন। কুয়ালালামপুরের উপর চাপ বেশী পড়েছে এ ধরনের চিন্তাভাবনা থেকেই বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে পুত্রজায়ার পত্তন। কুয়ালালামপুর থেকে পুত্রজায়ার দূরত্ব সামান্য। আকাশ পথে শর্টকাট দূরত্ব ২৩ কি.মি। সড়ক পথে একটু ঘুরে যেতে হয়। দূরত্ব ৪০ কি.মি। ঘন্টায় ১১০ কি.মি বেগে গাড়ী চললে সময় লাগবে একুশ মিনিট। এভাবে কমবেশী হবে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারী কার্যালয় সহ অনেক সরকারী দপ্তর ইতোমধ্যে পুত্রজায়ায় স্থানান্তরিত হয়ে সেখানে পুরোদমে কাজকর্ম চলছে। কার্যত: মালয়েশিয়ার রাজধানী এখন দু’ভাগে বিভক্ত। ব্যবসা বাণিজ্য সহ যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চলছে কুয়ালালামপুরে আর প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায়। তবে পার্লামেন্ট ভবন কুয়ালালামপুরে। এ ধরনের ব্যবস্থা বা উদাহরণ বিশ্বের আরো কয়েকটি রাষ্ট্রে আছে। যেমন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক রাজধানী শহর হলো সিডনি আর প্রশাসনিক রাজধানী হলো ক্যান্বেরা শহর। তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রশাসনিক রাজধানী হলো আবুধাবী আর অর্থনৈতিক রাজধানী শহর হলো দুবাই। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রাজধানী হলো জেদ্দা আর প্রশাসনিক রাজধানী হলো দাম্মাম শহর। তবে ঐ সব দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী শহরগুলিই বর্হিবিশ্বে স্ব স্ব দেশের রাজধানী শহর হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশেও ঢাকার উপর থেকে প্রচন্ড চাপ কমানোর জন্য প্রশাসনিক রাজধানী অন্যত্র সরিয়ে নেয়া যায়। যাই হোক পুত্রজায়া দেখে এসেছি। পরবর্তী সময়ে ভ্রমণ কর্মসূচীতে এক সময় পুত্রজায়ার কথাও আসবে। শিরোনামের বিষয়ে আসছি। আধুনিক ঝকঝকে দৃষ্টিনন্দন কুয়ালালামপুর শহরের আবির্ভাবকে কালের সময়ের পটভূমিতে অনায়াসে সাম্প্রতিক বলেই অভিহিত করা যায়। ইংরেজীতে কুয়ালালামপুরকে যে ভাবে লিখা হয় তা হলো `KULA  LUMPUR’। দু’ভাগে ভেঙ্গে লিখা হয়। ‘কুয়ালা লামপুর’। দুই ভাগের দুই অর্থ। এ বিষয়ে একটু পরে আসছি। উনিশ শতকে কুয়ালালামপুর শহরের যাত্রা শুরু। বিংশ শতাব্দীতে রাবার প্লানটেশনের মাধ্যমে প্রভূত উন্নতি। মূলত: মালয় দেশের অন্তর্ভূক্ত সেলেনগর রাজ্যের রাজধানী। অত:পর ক্রমশ: উন্নত মালয়েশিয়ার আধুনিক শহর ও রাজধানী। মূল শহরের আয়তন ২৪৩ স্কয়ার কি.মি, লোকসংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষ। শহর ক্রমশ বর্ধিত হয়েছে। কুয়ালালামপুর বর্তমানে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্রুত উন্নয়নশীল একটি মেট্রোপলিটান সিটি। যাই হোক কাদামাটির স্তুপের ব্যাপারটি কিন্তু পিছিয়ে যাচ্ছে। আর দেরী করা উচিত নয়।  কুয়ালালামপুরের অবস্থান দুটি নদীর সংযোগ স্থলে। নদী দুটির নাম যথাক্রমে `GOMBAK’ এবং Ges `KLANG’। এই দুই নদীর কাদামাটি স্তুপাকার হয়ে ক্রমশ ভরাট হয়ে যায় সংযোগ স্থলটি। যা পরে বসতিতে রূপান্তরিত হয়। মালয়ী ভাষায় `KUALA’ শব্দের অর্থ দুই নদীর সংযোগ স্থল আর মালয়ী ভাষায় `LUMPUR’ শব্দের অর্থ হলো কর্দমাক্ত হওয়া তথা কাদামাটিতে পূর্ণ হওয়া। এই হলো কাদামাটির কুয়ালালামপুর (KULA LUMPUR)। কুয়ালালামপুর শহরের মতো আধুনিক মালয়েশিয়া রাষ্ট্রেরও একটি পূর্ব ইতিহাস আছে। দ্বীপ রাজ্য মালয় সহ বোর্নিও, সারাওয়াক, সাবা ইত্যাদি বেশ কয়েকটি রাজ্য বা অঞ্চল নিয়ে বর্তমান ফেডারেল রাষ্ট্র মালয়েশিয়ার অবস্থান। মালয়েশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ও নগরের নাম ‘মালাক্কা’। gbবিশদ বর্ণনা পরে আসবে। সাতের দশক থেকে তেরো দশক পর্যন্ত মালয় রাজ্যে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং তাও ধর্ম নামে আরেকটি মতবাদের প্রভাব ছিলো খুব বেশী। হিন্দুধর্ম আসে ভারত থেকে আর বাকী দুটি ধর্ম আসে চীন থেকে। চৌদ্দশতক থেকে মালয়ে ইসলাম ধর্মের প্রভাব ক্রমশ: বাড়তে থাকে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এক সময়ে মালাক্কায় মুসলমান সুলতানবর্গ ক্ষমতার আসনে বসেন এবং ‘সালতানাত্ অব মালাক্কা’ কায়েম হয়। পর্তুগীজরা ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে মালাক্কা দখল করে নেয়। পর্তুগীজদের হাত থেকে ডাচ্রা মালাক্কা দখলে নেয় ১৬৪১ সালে। অত:পর ভাগ বসায় বৃটিশরা। বর্তমান মালয়েশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পেনাং সহ সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য জায়গা বৃটিশ বা ইংরেজরা দখল করে নেয়। ইংরেজ ও ডাচ্দের মধ্যে ১৮২৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী সমগ্র অঞ্চলটি তথা বর্তমান মালয়েশিয়া অঞ্চলটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়। ডাচ (নেদারল্যান্ড) শাসিত এলাকা ও ইংরেজ শাসিত এলাকা। ভারত ও চীন থেকে প্রচুর পরিমাণে শ্রমিক আগমন অব্যাহত থাকে। বৃটিশ এবং ডাচদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হওয়ার জন্য প্রচুর জনশক্তির প্রয়োজন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পরাক্রমশালী জাপান বৃটিশ ও ডাচদের হটিয়ে মালয়েশিয়া দখল করে নেয়। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মালয়ান কম্যুনিস্টরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। মালয়, সারাওয়াক, সাবা, বোর্নিও, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি বিভিন্ন রাজ্য ও প্রদেশগুলি একত্রিত হয়ে ১৯৬৩ সালে বর্তমান মালয়েশিয়া রাষ্ট্র গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুর ফেডারেশন অব মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। সকলেই জানেন বর্তমান বিশ্বে সিঙ্গাপুর একটি আলোচিত রাষ্ট্রের নাম। তবে যুদ্ধবাজ হিসেবে নয়। সমুদ্রবন্দরের যথাযথ ব্যবহার করে প্রভূত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে সবাই এক ডাকে সিঙ্গাপুরকে চিনেন। মালয়েশিয়াও খুব একটা পিছিয়ে নেই। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো। আরেক প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সব সময়ই মালয়েশিার স্নুায়ুযুদ্ধ চলছে। ইতোপূর্বে মাঝে মধ্যে সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। মালয়েশিয়ার মূল অধিবাসীদের মনে সব সময় একটি মনস্তাত্ত্বিক আশংকা বিরাজমান আছে। তারা মনে করেন ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা অভিবাসীরা এক সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নেবে। দুই দেশই একদা ব্যাডমিন্টন খেলায় চ্যাম্পিয়ান ছিলো। দুই দেশের খেলায় সময় ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলার মতো উত্তেজনা সৃষ্টি হতো। উন্নত ও আধুনিক মালয়েশিয়ার মূল নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মহাথেরো পুনরায় অতি বৃদ্ধ বয়সে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য রাজনীতির ময়দানে নেমেছেন। শুনা যায় উনার অভিযোগ বর্তমান শাসক দল ইন্দোনেশিয়ান বংশোদ্ভূত। কাজেই তাদেরকে হটাতে হবে। যাই হোক ভ্রমণ কাহিনীতে রাজনীতির আলোচনা মুখ্য নয়। এক ফাঁকে ঢুকে পড়েছে। এখন তো আবার সব ক্ষেত্রেই পলিটিক্স। যাক, ভ্রমণ কাহিনী চলবে ভ্রমণের মতোই। (চলবে)
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক