ভয়াল নদী ভাঙন গিলছে দোয়ারা

বিশেষ প্রতিনিধি ও আশিক মিয়া
নদী ভাঙনে বিলীন হতে চলেছে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদসহ দোয়ারাবাজারের বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের ভয়াবহতায় উপজেলা সদরসহ আশপাশের গ্রামের অস্তিত্ব টিকে থাকবে কি-না, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয়রা। ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রাজপথে নেমেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের জনতা। স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও ভাঙন প্রতিরোধ কমিটির নেতারা বলেছেন, ‘যেভাবে ভাঙছে, এভাবে ভাঙলে দোয়ারাবাজার উপজেলার কোন স্থাপনাই  থাকবে না।’
গত প্রায় ১০ বছর ধরে সুরমা নদীর দোয়ারাবাজার এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। সদর ইউনিয়নের মুরাদপুর, মাছিমপুর, মংলারগাঁও ও মাজেরগাঁও গ্রাম একে একে গ্রাস করে নিয়েছে সুরমা। ১০ বছর আগে এই গ্রামগুলো যারা দেখেছেন, এখন দেখলে চিনতেই পারবেন না। গ্রামগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে গেছে। এসব গ্রাম গ্রাস করতে করতে সুরমা নদীর দিক পরিবর্তিন হয়েছে। ইতিপূর্বে ৭০ টি দোকান, দুটি মসজিদ, ১ টি মাদ্রাসা, দোহালিয়া সরকারী খাদ্য গোদাম, উপজেলা পরিষদের সামনের ছাতক – দোয়ারা সড়কের মির্জাপুর অংশ, হাসপাতালের সামনের মাস্টারপাড়া অংশের সড়ক, সুরমা নদী পাড়াপাড়ের খেওয়াঘাটের সিঁড়ি এবং কমপক্ষে ২০০ বাড়ি-ঘর বিলীন হয়ে গেছে। এখন নদী এগুচ্ছে উপজেলা পরিষদ ভবনের দিকে। ২০ থেকে ২৫ গজ দূরেই উপজেলা পরিষদ ভবন। উপজেলাবাসী নদী ভাঙন ঠেকাতে বার বার মিছিল-সমাবেশ স্মারকলিপি-মানববন্ধন করলেও কোন কর্তৃপক্ষই দোয়ারাবাজারবাসীর এই সংকটের বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না।
নদী ভাঙন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম বলেন,‘প্রকল্প বিড়ম্বনায় পড়েছি আমরা, কেবল প্রকল্প হচ্ছে, হবে শুনছি, স্থানীয় সংসদ সদস্য সংসদে কথা বলেছেন, পানিসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বার বার দেখা করেও কথা বলেছেন, কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে না কিছুই। নদী ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা না হলে আমরা নৌ-পথ অবরোধসহ অনশন কর্মসূচি দেব।’
দোয়ারাবাজারের মুরাদপুরের বাসিন্দা খালেদা বেগম বলেন,‘৫ বার ঘর বানাইছি, ৫ বার ভাঙছে, এখন আর ভাঙলে নিজের কোন জমিন (জমি) নাই ঘর বানাইয়া থাকার, অন্য কোন জাগাত (জমিতে) গিয়া আশ্রয় নেওয়া লাগবো।’ তিনি জানালেন, নদী ভাঙনের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছেন কমপক্ষে ২০০ পরিবার।’
দোয়ারাবাজারের বাসিন্দা আব্দুল হালিম বীরপ্রতীক বলেন,‘বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে দোয়ারাবাজারের প্রায় ৮৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিয়েছেন। অনেকে শহীদ হয়েছেন। ৪ জন বীরপ্রতীক এখনো জীবিত আছেন। অথচ. এই জনপদটি এভাবে বিলীন হয়ে যাবে। এটি ভাবতেও কষ্ট হয় আমাদের। বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম, এই মহান নেতার কন্যা শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী, তিনি নিশ্চয়ই আমাদের আবদার গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন’।
দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক বলেন,‘দোয়ারাবাজারের নদী ভাঙন প্রতিরোধের জন্য ইতিপূর্বে গ্রহণ করা প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। এখন আবার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সেটি প্রাথমিক অনুমোদন লাভ করেছে। আমরা আশা করছি এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। অন্যথায় উপজেলাবাসীকে নিয়ে আমরা আন্দোলনে নামবো।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেন,‘নদী ভাঙনে ছাতক- দোয়ারাবাজারের সড়ক বিচ্ছিন্ন হবার পথে। উপজেলা পরিষদসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থাপনা-গ্রাম হুমকির মুখে। জাতীয় সংসদে এই ভাঙনের বিষয়ে বার বার কথা বলেছি আমি। পানি সম্পদ মন্ত্রীরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই জনপদ রক্ষা করা যাবে না।’
সুনামগঞ্জ পাউবো’র উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন,‘দোয়ারাবাজারের নদী ভাঙন এবং নদী খননের জন্য ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’