মইনুদ্দিন জালাল : একটি ‘দুঃখের পোস্টার’

উজ্জ্বল মেহেদী
সিলেট ও সুনামগঞ্জকে নদীমাতৃক করে রেখেছে এক সুরমা। এ নদীর উৎসমুখের একটি স্থান ভারতের টিপাইমুখ। সেখানে বাঁধ নির্মাণের তোড়জোড় চলে। বাঁধ হলে দুই দেশের নদীবাহিক এলাকা হবে মরুভূমি। ঠেকাতে হবে বাঁধ। সুরমার ক্ষোভ ধারণ করে একে একে রচিত হয় প্রতিবাদী কর্মসূচি। নদীতীরের মানুষকে জাগাতে সেই বরাক মোহনা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত ছিল প্রচারণা। নদীতে পায়রা ওড়ানো, পুষ্পবৃষ্টি, নৌযাত্রা, ক্ষমা করো হে নদী—এ রকম কতশত সফট কর্মসূচি। এসবই ছিল নদীসংগ্রাম। নেপথ্যে ছিলেন একজন মইনুদ্দিন আহমদ জালাল। তাঁর পঞ্চাশ পেরোনো জীবনের শেষবেলার নদীসংগ্রামীর কর্মযজ্ঞ জীবনকে নদীর মতো করে রেখেছে। আজ ১৮ অক্টোবর মইনুদ্দিন জালালের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী।
নদীরও আছে অধিকার। নদী যেহেতু মানুষের জন্য উপকারী, তাই এ অধিকারও মানুষের। মুখে নদী নিয়ে বুকে মানুষের জন্য জীবনভর লড়ে যাওয়া এ মানুষটির মূল পরিচয় ছিল যুব—রাজনীতিবিদ। সিলেটসহ দেশের নানা প্রান্ত, রাজধানী ঢাকা, এমনকি দেশের সীমানা ছাড়িয়েও তৎপরতা ছিল। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর অকস্মাৎ চলে যাওয়া মনে হয় এই তো সেদিন! আঠারোর তারুণ্যের বিদায়—বিষাদের দিনটি পরিচিত মহলে শোক হয়ে বইবে। তরঙ্গহীন নদীজলে তৈরি করবে অকালপ্রয়াণের ঢেউ।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে বেড়াতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। চুয়ান্ন বছর বয়সেই চলে যাওয়া। আদি নিবাস সিলেট শহরের প্রান্তিক দক্ষিণ সুরমার ধরাধরপুর। হাজি ইছকন্দর আলী ও সিতারা খানমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে মইনুদ্দিন আহমদ জালাল ছিলেন একমাত্র ছেলেসন্তান। তাঁর বাবা—চাচা সুনামগঞ্জ শহরে আরেক ঠিকানা গড়েন। ১৯৬৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সেখানেই জন্ম মইনুদ্দিন জালালের।
স্কুলছাত্র থাকাকালে প্রগতিশীল শিশু—কিশোর সংগঠন খেলাঘরের সঙ্গে যুক্ত হন। তারপর তারুণ্যে জ্বলে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র—আন্দোলনে। ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল সিলেট ও সুনামগঞ্জজুড়ে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজবন্দীও হয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালে একমাস সুনামগঞ্জ জেলে কারাভোগ করেন। এমসি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সিলেটে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। যুব ইউনিয়নে সিলেটে পরপর দুবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রীয় সহসভাপতি, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। যুবরাজনীতির কল্যাণে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি অনিবার্য মুখ হয়ে ওঠেন। পঞ্চাশ পেরোনো বয়সে ৩২টি দেশে যুব উৎসবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের ৬২টি দেশ।
এক সময় আইনপেশায় জড়ান। সুরমা নদীর মতোই, সিলেট ও সুনামগঞ্জ বারের সদস্য। তবে পেশায় মনোযোগ ছিল না। বোহেমিয়ানের মতো পৃথিবী চষে বেড়ান। যুব উৎসবের পতাকাতলে দেশ থেকে দেশ ভ্রমণ করেন। পরিভ্রমণের শুরুটা ছিল কিউবা থেকে। বিপ্লবী চে গুয়েভারার যুদ্ধক্ষেত্র আর ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতি টান। ডব্লিউএফডিওয়াই আয়োজিত ১৪তম বিশ্ব ছাত্র ও যুব উৎসব ১৯৯৭ সালে কিউবার হাভানা যান। কারণ একটাই, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফিদেল কাস্ত্রোর ঐতিহাসিক উক্তির জন্য। ‘আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি…’। ফিদেল কাস্ত্রোর হাত স্পর্শ করে যেন সেই উক্তির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আসা। এরপর যুবরাজনীতিবিদের জীবন চিরযুবা হয়। একে একে বিশ্বের সব যুব উৎসবে যোগ দেন। আলজেরিয়া, ভেনিজুয়েলা, সাউথ আফ্রিকা, ইকুয়েডর, রাশিয়ায় যুব উৎসবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের মূল ভূমিকা পালন করেন। ২০০৬ সালে বিশ্ব সোশাল ফোরাম পোট এলিগ্রো, ব্রাজিলে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এতো গেল দেশের বাইরে দেশে দেশে তৎপরতা। নিজভূমে কী করেছিলেন, স্থানীয় অঙ্গনে কতটা নির্মোহ ছিল তাঁর চালচলন? দলমত নির্বিশেষে এ তৎপরতায় একজন মইনুদ্দিন আহমদ জালাল চিত্রিত হন বিরল বিনয়ী অনন্য একজন হিসেবে। মানুষের বিপদেআপদে তাঁকে পাওয়া যেত খুব সহজে। স্থানীয় আন্দোলন—সংগ্রামে আদর্শিকভাবে তাঁর জ্বলে ওঠা, স্রোতের বিপরীতে একা, অবিচল থাকা ব্যক্তিটিই মইনুদ্দিন আহমদ জালাল। সর্বশেষ টিপাইমুখের আন্দোলন নিয়ে নদীসংগ্রামী রূপে আভির্ভূত হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন অঙ্গীকার বাংলাদেশের পরিচালক ছিলেন। এর আগে গণআন্দোলনের মুখে সিমিটারের আন্দোলন তথা প্রথম জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। বহুজাতিক গ্যাস কোম্পানি সিমিটারবিরোধী আন্দোলন সিলেটে যুক্ত ছিলেন। সমান সোচ্চার ছিলেন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন মাগুরছড়ায় গ্যাস পুড়িয়ে ধ্বংস করার প্রতিবাদ, বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র রক্ষার আন্দোলন, টেংরাটিলায় নাইকোর গ্যাস পোড়ানোসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, হাওরে ফসলডুবির প্রতিবাদেও।
শিশুসংগঠন থেকে ছাত্র সংগঠন, যুব—রাজনীতি আর আঞ্চলিক আন্দোলনে মইনুদ্দিন আহমদ জালালের প্রেরণায় ছিলেন দুজন। একজনের বসবাস সিলেটে, অন্যজন সুনামগঞ্জে। এ যেন তাঁর দুই বাসভূমের শ্রেষ্ঠ অহংকার। গণমানুষের রাজনীতিবিদ পীর হবিবুর রহমান ও কমরেড বরুণ রায়ের প্রতি ছিল অকৃত্রিম এক শ্রদ্ধা ও মান্যতা। মানুষ, জীবন, সমাজ, পৃথিবীকে ভালোবাসার পাঠ নিয়েছিলেন এ দুজনের সান্নিধ্য থেকে।
সুনামগঞ্জ শহরে তাঁদের পৈত্রিক আবাসিক হোটেল জালালাবাদ ছিল প্রগতিশীল রাজনীতির কেন্দ্রস্থল। সেখানে একটি কক্ষে জড়ো হতেন জালালসহ সহযোগীরা। এরই সুবাদে একটি কবিতা লিখেছিলেন সুনামগঞ্জের আরেক কৃতী সন্তান, বাংলা একাডেমি পুরষ্কারপ্রাপ্ত কবি, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ডক্টর মোহাম্মদ সাদিক। ১৯৮৫ সালে ‘আগুনে রেখেছি হাত’ কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি স্থান পায়। ‘একত্রিশ নম্বরের দুঃখ’ নামে সেই কবিতার শেষ লাইনে হারানো দিনের শ্রুতি, ‘একত্রিশ নম্বরের হা করা দরোজা আজ দুঃখের পোস্টার!’
কী বিস্ময়! সেই কবিতা—চরিত্র জালালও হয়ে গেলেন একটি দুঃখের পোস্টার! কবি কণ্ঠে এ কবিতা আর হোটেলকক্ষটির ভিডিওচিত্র ধারণ করা হয়েছে তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নির্মাণ করা ’দেখবো তোমারে…’ তথ্যচিত্রে। চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে সযতনে স্মরণ করছি আমাদের ‘দুঃখের পোস্টার’ মইনুদ্দিন আহমদ জালালকে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী