মঈনুদ্দীন আহমদ জালালের অকাল মৃত্যু- এই শোক ফুটে উঠুক আদর্শে ও চেতনায়

মঈনুদ্দীন আহমদ জালাল মাত্র ৫৫ বছর বয়সেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতা, পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠক ছিলেন। তাঁর জন্ম সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্টেশনে। পড়াশোনা ও রাজনীতির পাঠও গ্রহণ করেছেন এই শহরে। পরবর্তীতে নিজ পিতৃভূমি সিলেটে চলে যান স্থায়ীভাবে। প্রগতিশীল চেতনার ভিত্তিতে এর পর সিলেটে যত আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে তার সবগুলোতেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ছাত্র ইউনিয়ন-যুব ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন তিনি। কিন্তু দলীয় ওই বৃত্ত অতিক্রম করে তিনি এই অঞ্চলের সকলের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন ভীষণ রকমের পরোপকারী। পরিচিত জনের অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা, তিনি সকলের আগে ছুটে গেছেন সেখানে। আন্তরিকভাবে সহায়তা করেছেন। জালাল স্বপ্ন দেখতেন একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশের যেখানে প্রতিটি মানুষ চিন্তায় ও চেতনায়, আচরণে ও অনুশীলনে হবে আধুনিক, প্রগতিবাদী তথা মুক্তচিন্তার। তাই যেখানেই মুক্তচিন্তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। নিজের প্রতি খুব বেশি উদাসীন ছিলেন জালাল। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। প্রায়শই চিকিৎসা নিতে হত। শরীরের এই জটিল অসুখগুলোকে তিনি পাত্তা দিতেন না। মনের এতটাই জোর যে, তিনি জটিল এই রোগ নিয়েই ছুটে বেড়াতেন এখান থেকে ওখানে । বিদেশ ভ্রমণের প্রতিও ছিল তাঁর ঝোঁক। সেই বিদেশে গিয়েই অবশেষে তিনি পৃথিবী ছাড়লেন। সবসময় হাসিখুশি ও মানুষের সাথে সংলগ্ন থাকতেন বলে নিজের অসুস্থ শরীর যেরকম জীবন যাপন সমর্থন করত, তা থেকে দূরেই থাকতেন এই মানুষটি। ফলে ওইসব অসুখ এতোটাই মারাত্মক রূপ ধারণ করল যে শেষ পর্যন্ত প্রাণটাই ছিনিয়ে নিল। স্বল্পায়ু জীবনে মহৎ আদর্শনিষ্ঠ কর্মবীর এই মানুষটির মৃত্যুতে সিলেটে ও সুনামগঞ্জে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকস্তব্ধ হয়েছেন বহু মানুষ। মাত্র ৫৫ বছরের জীবনেই তিনি দেখিয়ে দিলেন কেমন মানুষ হলে তবে অন্য সবের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে যাওয়া যায়।
মঈনুদ্দীন আহমদ জালাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের অন্যতম একজন উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। সুনামগঞ্জ থেকে নিয়মিত একটি দৈনিক পত্রিকা বের করার মত কঠিন স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বদাই তিনি সাহস ও উৎসাহ জুগাতেন। গণমানুষের আকাক্সক্ষা ধারণ করে এই যে পথ চলা সেখানে জালাল ছিলেন আমাদের সাথী। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন পরম সুহৃদ হারালাম।
মানুষ বেঁচে থাকে কর্মে। ব্যক্তি জালালের উপস্থিতি আমাদের চোখের সামনে আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু এ কথা সত্য, মহৎপ্রাণের কোন মৃত্যু নেই। শত সহ¯্র মানুষের মাঝে যে চেতনা জাগ্রত করেছিলেন তিনি, সেইসব প্রাণেই সকলে খোঁজে নিবেন জালালকে। মৌলবাদ ও কূপ-ুকতার বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার প্রতিবাদ ছিল আজীবন । আমরা বিশ্বাস করি, ওই চেতনার মাঝেই সকলে অন্তর্হিত জালালকে আবিষ্কার করবেন। এইভাবে সদাহাস্যময় সহজ সরল এই মানুষটি অমরত্ব পাবেন জনচিত্তে। আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা সংগ্রামী এই মানুষটির প্রতি। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য; এই অমর আদর্শ বোধ যত বেশি ছড়িয়ে দিতে পারব আমরা পুরো সমাজে ততই উজ্জ্বল হবে তাঁর স্মৃতি। ওই লক্ষ্যেই নিবেদিত হোক আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।