মজলিসী রচনায় অনন্য তিনি

সজীব দে
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও রম্য রচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর করিমগঞ্জ শহরে। দেশ ভাগের পূর্বে করিমগঞ্জ সিলেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে করিমগঞ্জ তাঁর আসাম প্রদেশের কাছাড় জেলার অন্তর্ভূক্ত। পিতা সাব-রেজিস্ট্রার খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী ও মাতা আয়তুল মান্নান খাতুন। তাঁর পৈত্রিক ভিটা হবিগঞ্জের উত্তরসুর গ্রামে। ভ্রমণকাহিনির জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয় বহুভাষাবিদ এই মানুষটির রচনা একইসঙ্গে বৈদগ্ধ ও রম্যবোধে পরিপুষ্ট। সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষায় হাতেখড়ি সুনামগঞ্জ শহরের পাঠশালায় ১৯০৮ সালে। পিতার বদলির চাকরির সুবাদে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কাটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ১৯১৫
সালে ভর্তি হন মৌলভীবাজার হাইস্কুলে, পরের বছর সিলেট হাইস্কুলে ভর্তি হন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে।
১৯১৯ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটে এসে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আকাক্সক্ষা সম্বন্ধে বক্তব্য দেন। সৈয়দ মুজতবা আলীর বয়স তখন ১৪ বছর। বক্তৃতা শুনে তিনি রন্দ্রীনাথ ঠাকুরের কাছে চিঠি লিখেন। জানতে চান-আকাক্সক্ষা উচ্চ করতে হলে কী করা প্রয়োজন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন সিলেট থেকে আগরতলায় চলে গিয়েছিলেন। কিছুদিন পর কবির হাতের লেখা চিঠি তিনি পান। কবি লিখেছেন, আকাক্সক্ষা উচ্চ করিতে হইবে-এই কথাটির মোটামুটি অর্থ এই যে, স্বার্থই যেন মানুষের কাম্য না হয়। দেশের মঙ্গলের জন্য ও জনসেবার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ কামনাই মানুষকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। তোমার পক্ষে কী করা উচিত তা এতদূর থেকে বলে দেয়া সম্ভব নয়। তবে তোমার অন্তরের শুভেচ্ছাই তোমাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে।’
১৯২১ সালে তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে শান্তিনিকেতনে যান পড়াশুনো করতে। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথম দিকের ছাত্র। এখানে তিনি সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান ও ইটালীয় ভাষা শিক্ষালাভ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি এখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার্থে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে তিনি ১৯২৭ থেকে ’২৯ সাল পর্যন্ত কাবুলের একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন। ১৯২৯ সালে দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়নের জন জার্মান সরকারের বৃত্তি নিয়ে বন বিশ্ববিদ ালয়ে ভর্তি হন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে গবেষণার জন ১৯৩২ সালে তিনি ডিফিল ডিগ্রি লাভ করেন। বন ছাড়াও তিনি ইউরোপের বার্লিন, প্যারিস এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ১৯৩৪ সালে একবছরের জন্য তিনি কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে ১৯৩৫ সালে তিনি বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানে তিনি আট বছর কাটান। এরপর দিল্লিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন কিন্তু সরকারি কাজে মন না টেঁকায় তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং বন্ধুবর আবু সায়ীদ আয়ুবের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। গৌরী-আয়ুব দম্পতির সঙ্গে দক্ষিণ ভারত ভ্রমণকালে তিনি দেশ পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি দেশে-বিদেশে লিখতে শুরু করেন। লেখাটি ১৯৪৮ সালের মার্চ সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে। দেশভাগ-পরবর্তীকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় তিনি সেখানে বেশিদিন থাকতে পারেননি। কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খ-কালীন প্রভাষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫০ থেকে ’৫২ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেসনস্-এর সচিবের পদ অলংকৃত করেন। এসময় তিনি সাকায়াত উল হিন্দ (ভারতীয় সংস্কৃৃতি) নামে একটি আরবি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৯৫৩ সালে তিনি শিক্ষাবিদ রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। পঞ্চাশের দশকে তিনি কিছুদিন আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টরের দায়িত্ব নিয়ে পাটনা, কটক, কলকাতা এবং দিল্লিতে কাটান। ১৯৬১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে বিশ্বভারতীর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার পদে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে তিনি জ্যেষ্ঠসন্তান ফিরোজকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন এবং পাঠভবনে ভর্তি করে দেন কিন্তু ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে ফিরোজকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন। তাঁর স্ত্রী তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা দপ্তরে কর্মরতা। ১৯৬৫ সালে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরগ্রহণ করেন। শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় মুজতবা আলী বিশ্বভারতী নামে হাতেলেখা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন; পরবর্তীকালে সত্যপীর, ওমর খৈয়ম, টেকচাঁদ, প্রিয়দর্শী প্রভৃতি ছদ্মনামে দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ, মোহাম্মদী প্রভৃতি পত্রিকায় কলাম লিখতেন। বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন অনবদ্য সব ভ্রমণকাহিনি। এছাড়াও লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা। বিবিধ ভাষা থেকে শোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর ম্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার অনায়াস দক্ষতায় তিনি বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসন অধিকার করে নেন। তাঁর রচিত বইয়ের সংখ্যা ৩০। তাঁর ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস ও রম্যরচনার মধ্যে দেশ বিদেশে, জলে ডাঙ্গায়, অবিশ্বাস, শবনম, চাচা কাহিনী, শহরইয়ার, টুনি মেম, পঞ্চতন্ত্র, ময়ূরকণ্ঠী উল্লেখযোগ। অতি সাধারণ পরিবেশন ভঙ্গি তার লেখাকে অসাধারণ মাত্রা দিয়েছে। জ্ঞানপিপাসু মনের নয় সৈয়দ মুজতবা আলী পাঠকের আনন্দপিপাসু মনের খোরাক যুগিয়েছেন। বিস্ময়কর পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। এক ‘দেশে বিদেশে’ ভ্রমণ কাহিনীতে তিনি ঋগবেদ, মহাভারত, গীতা কোরআন, বাইবেল, কালীদাস, সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, শেকসপীয়ার, গোটে, কবীর, ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, সুমুকার রায়, ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব, ভাষা, বিজ্ঞান প্রত্নতত্ব, লোকসঙ্গীতসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে লিখেছেন। যা ছড়িয়ে আছে সমগ্র রচনায়। সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা পড়ে হাসেননি এমন পাঠক আদৌ আছে কি-না সন্দেহ। বাংলা সাহিত্যে পরিপূর্ণ মজলিসী রচনায় তিনি ছিলেন একক ও অনন্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে বসবাসের জন্য ঢাকায় চলে আসেন। থাকতেন ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কে। তাঁদের দুই পুত্র সন্তান সৈয়দ মোশাররফ আলী (ফিরোজ) ও সৈয়দ জগলুল আলী। ঢাকার আসার কিছুদিনের মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তাঁর শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসায় উন্নতি না হওয়ায় তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানেই ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। বহুভাষাবিদ, পণ্ডিত, হাস্যরসিক, তুমুল আড্ডাবাজ এই লেখক খ্যাতির তুলনায় স্বীকৃতি পেয়েছেন সামান্যই। ২০০৫ সালে মরণোত্তর একুশে পদক ছাড়া ১৯৬১ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। এর আগে ১৯৪৯ সালে পেয়েছিলেন নরসিং দাস পুরস্কার এবং ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন।