মনস্তত্ত্বের অবনতি রোধ না হলে জাতি হিসাবে টিকে থাকা মুশকিল

কোনো একটি সিএনজি-অটোরিক্সা পথচারী এক গরুকে ধাক্কা দেয়। তাতেই বেঁধে যায় লঙ্কাকাণ্ড। দুইপক্ষ মত্ত হয় মারামারিতে। লালু মিয়া নামের ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন এতে। তাকে সিলেট ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে মৃত্যু হয় তার। ওই মারামারিতে আহত হয়েছেন আরও অনেকে। রবিবারে সংঘটিত এই ঘটনাটি শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের। একটি গরুকে কেন্দ্র করে এতো বড় মারামারির কোনো বাস্তবসম্মত কারণ না থাকলেও এখন মানুষ এতোটাই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে যে, একটা কিছু উপলক্ষ পেলেই একজন আরেকজনের রক্ত দেখতে উন্মত্ত হয়ে উঠে। এরকম তুচ্ছ কারণে মারামারি ও প্রাণহানির ঘটনা সংবাদপত্রসূত্রে প্রায় প্রতিদিনই আমরা দেখতে পাই। সামাজিক অবস্থা কোন্ পর্যায়ে অবনত হলে কিংবা মানুষের মানসিকতা কোনো নীচু স্তরে চলে গেলে পরে এমন রক্তারক্তি কাণ্ডে মানুষ জড়িত হতে পারে সে নিয়ে আমাদের দেশে কোনো গবেষণাধর্মী কাজ হয় না। তবে আমরা এটুকু বুঝতে পারি মানুষের এই অসহিষ্ণু মনোভাব একদিনে তৈরি হয়নি। যদিও মানুষ কখনও শান্তিপ্রিয় ছিলো না, সভ্যতার শুরু থেকেই শক্তিমত্তরা দুর্বলের উপর গায়ের জোরে আধিপত্য খাটিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা শুরু করে। তবুও আমরা যখন আধুনিক সময়ে উত্তরণ ঘটাতে থাকলাম তখন প্রত্যাশা ছিলো, মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা এই হিংস্রতা ক্রমশ কমতে থাকবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, মানুষের এই উন্মত্ততা তো কমেইনি বরং ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এমন এক অবস্থায় শান্তিপ্রিয় মানুষের বসবাসের জন্য বুঝি আমাদের বহু জনপদ এখন অযোগ্য হয়ে উঠেছে। মানুষের এই হীন মানসিক অবস্থার কারণে অনেকে লজ্জা পেলেও এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কোনো সামাজিক-রাষ্ট্রীক উদ্যোগ নেই। সুতরাং জয়কলস গ্রামের লালু মিয়ার মৃত্যুতে আমরা সাংঘাতিকভাবে বিষন্ন হলেও মূলত এক অজানা অন্ধকারই বুঝি বা আমাদের ভবিতব্য।
গত দেড় সপ্তাহ ধরে আমরা এক অশান্ত বাংলাদেশ দেখে আসছি। দুর্গাপূজার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। সর্বশেষ রবিবার গভীর রাতে রংপুরের পীরগঞ্জের পল্লীতে এক জেলে পল্লী পুড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখেছে অসহায় দেশ। এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পিছনেও গণমানুষের মানসিক অসহিষ্ণুতা দায়ী বলে আমরা মনে করি। যুক্তি বুঝে এমন কোনো মানুষ হুজুগে চলে না। একমাত্র বোধহীন মানুষরাই এরকম হুজুগের পিছনে ছুটে জঘন্য কাজে মেতে উঠতে পারে।
এমনসব সামাজিক অশান্তি ও দুর্বৃত্তপনা দূর করতে হলে সমাজের ভিতর থেকেই সংঘটিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক শক্তি কার্যকরভাবে ক্রিয়াশীল থাকলে রাষ্ট্র কখনও এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিতে পারত না। সরকারের একেবারে উঁচু থেকে চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণের পরও যখন রংপুরের পল্লীতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী সবগুলো শক্তিকেন্দ্রই এখন চরম নিস্পৃহ। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে কেবল পরস্পরকে দোষারূপ করা ছাড়া প্রতিরোধের জন্য আর কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেননি। আমরা দেশে এখন পর্যন্ত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করার জন্য কোনো বড় কর্মসূচি দেখতে পাইনি। অবস্থাদৃষ্টে যে কারও মনে হতে পারে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য কার্যত কারও কোনো দায় নেই। এই নিস্পৃহতা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অতিশয় বিপজ্জনক।
জয়কলসে গরু নিয়ে মানুষের প্রাণ ঝরুক কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুর মন্দির-বাসস্থানে হামলা করে নিরীহ কারও প্রাণ কেড়ে নেয়া হোক, সর্বক্ষেত্রেই কার্যকারণ একই। একটি জাতির মনস্তত্ত্বের এই অবনতি রোধ করতে না পারলে জাতি হিসাবে টিকে থাকা ক্রমশ মুশকিল হয়ে উঠবে।