মনের ঘরটা কে মেরামত করে দেবে?

রাজীব নূর
রণেশ ঠাকুরের ঘরটা আবার তুলে দেওয়া কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু তাঁর মনের ঘরটা কে মেরামত করে দেবে? মানুষ তো নিজের ঘরেই সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করে— সে সুরম্য অট্টালিকা বা পর্ণকুটির, যাই হোক। সেই ঘর যখন পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন? রণেশ ঠাকুরের অবশ্য বসতঘরটি আছে। আগুনে দেওয়া হয়েছে তাঁর আসর-ঘরে।
আমাদের গ্রামে উত্তীর্ণ কৈশোরে এমন ঘর জ্বলা আগুন দেখেছিলাম আমি। সেই আগুন আমার মনে যে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল, বহুবছর পর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লিতে আগুনের পর সেখানকার মানুষগুলো কেমন আছে, জানতে গিয়ে জেনেছিলাম, অভিন্ন আতঙ্কের মধ্যে বড় হচ্ছে সাঁওতালপল্লির শিশুরা। ২০১৬ সালের নভেম্বরের ৬ তারিখের ওই দিনটি সাঁওতাল শিশুদের কাছে ‘সেঁঙ্গেল মাহা’ বলে পরিচিত। শিশুরা শুধু নয়, ওই দিনটিকে সাঁওতালপল্লির বড়রাও এই নামে স্মরণ করে থাকে। ‘সেঁঙ্গেল মাহা’ মানে ‘আগুনের দিন’। ‘সেঁঙ্গেল’ শব্দের অর্থ আগুন, ‘মাহা’ অর্থ দিন। তবে মাহা শুধুই দিন নয়, বিশেষ দিন এবং সেটা ভালো-মন্দ দুই অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে। এখানে মন্দ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আগুনের স্মৃতি আমাকে বিচলিত করে। আমি কায়মনে প্রার্থনা করি, এমন দিন যেন কোনো শিশুর জীবনে না আসে। আমাদের গ্রামে আগুন দেওয়ার পরের দিন আমার শিক্ষকদের কয়েকজন আলোচনা করছিলেন, সামান্য কয়েকটি বাড়ি পুড়েছে— এটা খবর হিসেবে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি যে স্কুলটিতে পড়তাম, তার শিক্ষকদের অন্তত তিনজন প্রত্যক্ষভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন, হয়তো তারা সেদিনের খবরের কাগজে আগের দিন তাদের পাঠানো খবরটি এত ছোট করে ছাপা হয়েছে কেন, তা নিয়ে আলাপে এই কথা বলেছিলেন। আমার শিক্ষকদের কাছে যে আগুন সামান্য ছিল, সেই আগুন আমাকে বিপন্ন বিস্ময়ে তাড়িত করে বেড়াচ্ছে এখনো। বহুবছর পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিন যশোরের অভয়নগর উপজেলার চাঁপাতলা গ্রামের মালোপাড়ায় যখন আগুন দেওয়া হলো, তার পরদিন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম এবং শুনছিলাম সহকর্মীদের কেউ কেউ বলছেন, গোটাদশেক ঘর পুড়েছে; এ সামান্য আগুন। আমি কিন্তু সামান্য আগুন দেখে আবারও গুমরে কেঁদেছিলাম সেদিন। খাবারের জন্য কাঁদছে যে শিশুটি, তাকে দেখলাম। কাঁদছেন ওর মা-ও। কারণ, ঘরে খাবার নেই। খাবার আসবে কোথা থেকে? ঘরই তো নেই! ঘরদোর, সহায়-সম্বল গেছে এমন ১২২টি সংখ্যালঘু পরিবারের। নির্বাচনের দিন রাতে চাঁপাতলা গ্রামের মালোপাড়ায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় অন্তত ১০টি বাড়ি। সেখান থেকে যশোর শহরে ফিরতে ফিরতে আমি আমার শৈশবে ঢুকে পড়ি, ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছিলাম আবারও। তবু যশোর শহরে ফিরে আমি লিখেছিলাম, সামান্য আগুনে যে অসামান্য ক্ষতির শুরু হয়েছে, তার গল্প— ‘চাঁপাতলায় শুধুই কান্না’। সঙ্গে ছাপা হয়েছিল মা-মেয়ের ছবিটি, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনোত্তর সহিংসতার প্রতীক হয়ে আছে ওই কান্নার ছবি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আবারও গিয়েছিলাম ওই গ্রামে। ২০১৪ সালে যে মেয়েটি ছিল মায়ের কোলে, সে তখন পড়ছে দ্বিতীয় শ্রেণিতে, মহাকাল মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়-সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বছর পাঁচেক আগের ওই দিনটির কথা ওর মনে থাকার কথা নয়। তাণ্ডবের দিনে ওর বয়স ছিল চার বছরেরও কম। তবে শিশুটির দাবি, অনেক কিছুই মনে আছে ওর। বড় কোনো ঘটনা শিশুমনেও গভীর রেখাপাত করতে পারে। তাই সে ভোলেনি, কোনো এক সন্ধ্যায় ওদের ঘরদোর ভাঙচুর করে গিয়েছিল খারাপ মানুষেরা।
২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর ভোলার লালমোহনে যে মানুষগুলো নির্যাতিত হয়েছিল, তাদের খুঁজতে গিয়েছিলাম এবার, জানলাম প্রায় সবাই দেশত্যাগ করেছেন। আমরা কি রণেশ ঠাকুরকেও বিতাড়িত করতে চাই?
রণেশ ঠাকুরের আসরঘর পুড়িয়ে দেওয়ার খবরটি সম্পর্কে জানবার জন্য কথা বলেছিলাম সহকর্মী, সমকালের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি Ponkoj Dey-কে। তিনি জানালেন, ২০১০ সালে শাহ আবদুল করিমের বাউল আসরে যারা হামলা করেছিল, তারাই রণেশ ঠাকুরের আসর ঘর পুড়িয়েছে বলে এলাকাবাসী সন্দেহ করছেন। উজানধলে যারা গিয়েছেন তাদের জানা আছে, শাহ আবদুল করিম আর রণেশ ঠাকুরের বাড়ির মাঝখানে একটা মাঠ আছে। ওই মাঠটি দখল করাই উদ্দেশ্য। করিমের অপরাধ তিনি বাউল, রণেশ ঠাকুরের অপরাধ দ্বিগুণ, তিনি হিন্দু এবং বাউল।
উজানধলের রবনী মোহন চক্রবর্তী কীর্ত্তনীয়ার দুই ছেলে রুহী ঠাকুর ও রণেশ ঠাকুর। বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের শিষ্য এই দুই ভাই। ওস্তাদ শাহ্ আব্দুল করিম ও বড় ভাই রুহী ঠাকুর মারা যাবার পর ভাটি অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে যে কজন বাউল জনপ্রিয়, তাঁদের একজন রণেশ ঠাকুর। করোনাকালের আগপর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই বাউল আসর বসতো রণেশ ঠাকুরের বাড়িতে। বসতঘরের উল্টোদিকে তাঁর আসর ঘর। ওখানেই তাঁর নিজের ও শিষ্যগণের যন্ত্রপাতি থাকতো। চার দশক ধরে রণেশ ঠাকুরের সংগ্রহ করা সব যন্ত্রপাতি, গানের বই-পত্র পুড়ে ছাই হয়েছে।
লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি সমকাল