মনোনয়নপ্রত্যাশীর ভিড়ে বিএনপিও পিছিয়ে নেই

মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যার দিক দিয়ে আওয়ামী লীগের চাইতে পিছিয়ে নেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। মনোনয়নপত্র বিক্রির শেষে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় ৪১১২ জন সম্ভাব্য প্রার্থী দলটির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এক্ষেত্রে তারা আওয়ামী লীগকে টপকে গেছে। কেননা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ৪০২৩ জন। আসনপ্রতি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী যেখানে প্রায় সাড়ে তের জন সেখানে বিএনপি সামান্য এগিয়ে এই গড় ১৪ জনে উন্নীত করেছে। নির্বাচনের আগেই দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশার দিক দিয়ে বিএনপি নিজেদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগকে পেছনে ফেলে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকল বটে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর নিজেদের নির্বাচনী প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে নির্বাচন এক মাস পিছিয়ে দেয়ার দাবি তুলেছিল। কিন্তু মনোনয়ন ফরম বিক্রির সংখ্যা বিবেচনায় নিলে তাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকার কোন লক্ষণের দেখা মিলে না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় এবার দলের নেতারা নির্বাচন করতে কতোটা মুখিয়ে ছিলেন মনোনয়ন প্রত্যাশাকারীদের এই বিপুল ভিড় সেটি প্রমাণ করে। এখন প্রতিটি আসনে জোটের শরিক দলগুলোর সাথে সমন্বয় করে এই বিপুল মনোনয়নপ্রত্যাশীর কত জনকে সন্তুষ্ট করা যায় সেই কঠিন পরীক্ষার সামনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রধান দুই দলই। এ যেন ক্রিকেট খেলায় একই পজিশনে একাধিক দক্ষ খেলোয়াড় থাকার মত মধুর সমস্যা, কাকে রেখে কাকে সুযোগ দেয়া হবে সেজন্য নির্বাচকদের একটি আনন্দদায়ক পরীক্ষায় ফেলে দেয়া। রাজনীতি যেহেতু খেলার মতো নির্মল নয় তাই দলীয় হাইকমান্ডকে সবদিক সামাল দিয়ে প্রার্থী বাছাই করতে বেশ সমস্যায়ই পড়তে হবে। এই প্রতিযোগিতা মূল নির্বাচনী মাঠে দলগুলোকে কতোটা অস্বস্তি ও সমস্যায় ফেলে সেটি এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক দলগুলো সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে কেন্দ্রিকতা বজায় রাখায় এত প্রার্থী আধিক্য বলে রাজনীতি বিশ্লেষকদের কাছে পরিগণিত হয়। নেতাকেন্দ্রীক কেন্দ্রিকতা পরিহার করে দলে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা চর্চা শুরু করা হলে হাইকমান্ডকে এতোটা কঠিন প্রতিযোগিতা সামলাতে হত না। ইংল্যান্ডে আমরা দেখেছি জাতীয় নির্বাচনের বছর দুই আগেই কোন আসনে কে প্রার্থী সেটি নির্ধারিত হয়ে যায়। সেখানে স্থানীয় ইউনিটগুলোর মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা অনুশীলনের এই জায়গা এখনও শক্তিশালী হয়নি। ফলে যেমন গণসম্পৃক্ত না হয়েও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া যায় তেমনি দীর্ঘদিন দলঅনুগত ও নিবেদিত থেকেও অনেকেই প্রার্থিতার সোনার হরিণ ধরতে সক্ষম হন না। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহ, উদ্দীপনা ও উৎসবমুখরতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত যারা প্রার্থী হয়ে আসেন তাদের অনেকেই ব্যাপক নির্বাচকম-লীর সন্তোষ বয়ে আনতে পারেন না। এই সীমাবদ্ধতা আমাদের জাতীয় রাজনীতির একটি দুর্বল দিক।
অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট বলে বাংলা প্রবচন আছে। জাতীয় নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থিতা নিয়ে সীমাহীন প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশে যদি কোনরূপ নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে তাহলেই আমরা খুশি হব। নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ নষ্ট হোক তা কারও কাম্য নয়। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এই ব্যাপক আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা সুস্থ ধারায় প্রবাহিত হোক, ভবিষ্যতে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরও গুণগত পরিবর্তন ঘটুক, এই আমাদের কামনা।