মনোয়নবঞ্চিতদের টাকা ফেরৎ চেয়ে আহাজারি

নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের একটি কদর্য রূপ ফুটে উঠেছে জাতীয় দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের একটি সংবাদে। সোমবার প্রকাশিত ওই সংবাদ থেকে জানা যায়, চাহিদা মোতাবেক টাকা দিয়েও মনোনয়ন না পাওয়ায় অনেক প্রার্থী হন্যে হয়ে খুঁজছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদারকে। সংবাদের তথ্য অনুসারে রুহুল আমীন হাওলাদার এমন মনোনয়নবঞ্চিতদের ভয়ে অনেকটা আত্মগোপনে আছেন, যদিও বা কোন অনুষ্ঠানে যান তখন তিনি ব্যক্তিগত রক্ষীদের নিরাপত্তা বেষ্টিত হয়ে থাকেন। অভিযোগকারীদের কথা মোতাবেক মনোনয়ন পেতে অনেকেই এক কোটি বা ততোধিক টাকা দিয়েছেন। বড় দলগুলোর ভিতরে মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে নানা সময় নানা কথা শুনা গেলেও প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ আগে শোনা যায়নি। এইসব টাকা প্রদানকারী মনোনয়নবঞ্চিতরা নিজেদের হতাশার পাশাপাশি আমাদের জাতীয় নির্বাচনী সংস্কৃতিতে বিষাক্ত ক্ষতের মতো লেগে থাকা একটি বিভৎসতার স্বরূপ সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী ক্রীড়া সংগঠক জামাল রানার উদ্ধৃত বক্তব্যটি এরকমÑ‘…এরপর যারা টাকা দিয়েছে তাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। যারা টাকা দেননি তারা জনপ্রিয় হলেও মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’ জনাব রানা টাকা দিয়েও মনোনয়ন না পাওয়ায় ক্ষোভে দুঃখে চরম সত্যটি প্রকাশ করেছেন, যেমন প্রকাশ করেছেন আরও অনেকে। এই নির্জলা সত্য থেকে যে বিষয়টি সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তা হল, রাজনীতিতে টাকার খেলা বড়ই চমৎকার। প্রায়শই বলা হয়, রাজনীতি এখন সবচাইতে বড় ব্যবসা। এখানে মিলিয়ন বা বিলিয়ন পরিমাণে টাকা বিনিয়োগ করা হয় এখন। তাই অর্থহীনরা রাজনীতিতে নিতান্তই অর্থহীন হয়ে পড়েছেন আজকাল। রাজনীতি যখন ব্যবসার সমার্থক হয়ে উঠার কথা উচ্চারিত হয় তখন রাজনীতির গায়ে সমাজসেবা বা কল্যাণমুখীতার যে লেভেল আঁটা থাকে সেটি আলগা হতে বাধ্য। কারণ যিনি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ‘কিছু একটা’ হন তখন তাকে তো আগে বিনিয়োগের টাকা মুনাফা সমেত উঠিয়ে নিতেই ব্যস্ত থাকতে হয়। এর উপর পরবর্তী মেয়াদে বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তহবিল মজুদ করার বাস্তবতা থাকে। এই অবস্থায় রাজনীতির ‘জনসেবা’ বানের তোড়ে ভেসে কোথায় হারিয়ে যায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আজ জাতীয় পার্টির যেসব মনোনয়নবঞ্চিত নেতা টাকা ফেরৎ পেতে মহাসচিবকে খুঁজছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তাদের আমরা কোন পরিচয়ে বিবেচনায় নিব? কথায় আছেÑ অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে। এখানে ঘৃণার আগুন জ্বালানোর কথা বলা হয়েছে অন্যদের। মনোনয়নের জন্য টাকা নেয়া ও দেয়া দুইটিই সমান অপরাধ। সুতরাং যারা আজ টাকার কষ্টে আহাজারি করছেন তারা বিন্দুমাত্র সহনাভূতি পাওয়ার যোগ্য নন। বরং তাদের প্রতিও জনগণের ঘৃণার আগুন জ্বালানো উচিৎ। নতুবা রাজনীতিকে, নির্বাচনকে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে তারা যেভাবে কলঙ্কিত করে তুলেছেন তার মাত্রা বাড়তেই থাকবে। রাজনীতিকে কখনও ব্যবসার সমতুল্য করা উচিৎ হবে না। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নিজেদের বঞ্চনার অবসান হওয়ার আশা করেন। রাজনীতিতে অবশ্যই সমাজ ও মানুষের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতৃবৃন্দকেই কাতারে কাতারে আসতে হবে। যারা টাকা দিয়ে মনোনয়ন কিনেন তাদেরকে রাজনীতির মাঠ থেকে হঠানো তথা রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণার আগুন যতদিন পর্যন্ত না জ্বলবে ততদিন পর্যন্ত রাজনীতির ব্যবসা হয়ে উঠার এই বাস্তবতার অবসান হবে না।