মন্দের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহিষ্ণুতা জারি থাকুক

বুধবার মধ্য রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জেলা শহর মধ্যস্থিত অফিসার্স ক্লাব থেকে ৪ জুয়ারিকে আটক করে, পরে তাদেরকে ৩০ দিন করে বিনাশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়। গতকালকের স্থানীয় গণমাধ্যমে এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য খবর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই খবরটি বিশেষ আলোড়ন তৈরি করেছে। অনেকেই এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অভিযান পরিচালনা করায় ভ্রাম্যমান আদালত ও জেলা প্রশাসনসহ পুলিশ প্রশাসনের প্রশংসা করেছেন। আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন অফিসার্স ক্লাবের মতো একটি মর্যাদাজনক স্থানে রাতভর কী করে জুয়া খেলা চলে সে সম্পর্কে। বুধবার যে ৪ জুয়ারি ধরা পড়েছেন তাদের তিনজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী, একজন দলিল লেখক। ভ্রাম্যমান আদালতের কাছে অভিযুক্ত ২ জন বলেছেন, তারা আগেও এখানে জুয়া খেলেছেন। অর্থাৎ অফিসার্স ক্লাবে রাতভর জুয়া খেলার ঘটনাটি নতুন কিছু নয়। মানুষের মুখে মুখেও অনুরূপ কথাই প্রচলিত আছে। বাংলাদেশে এখন যে ক্লাব-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেখানে ক্লাব মানেই যেন জুয়া খেলা ও পানীয় পানের আড্ডাস্থল। অনেকেই রসিকতা করে বলেন, এই দুই উপকরণ ছাড়া কোনো ক্লাবই জীবন পায় না। বলাবাহুল্য সুনামগঞ্জ অফিসার্স ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করার সময়ও ‘শরীর উত্তেজক পানীয়ের বোতল’ উদ্ধার হয়েছে। ভদ্র ও ভব্য ভাষায় ‘শরীর উত্তেজক পানীয়’ বলা হলেও এ যে মাদকদ্রব্য তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি। খেলারত অবস্থায় ৪ জন জুয়ারি ধরা পড়েছেন বলে ভাবার কোনো সুযোগ নেই যে এখানে আর কেউ জুয়া খেলেন না। ভাগ্যক্রমে অভিযান পরিচালনাকালে তারা হয়তো অকুস্থলে ছিলেন না। তাই অনুপস্থিত জুয়ারিরা একটি বড় রকমের সামাজিক মর্যাদা হানির হাত থেকে বেঁচে গেলেন।
অফিসার্স ক্লাব হল জেলা সদরে কর্মরত সরকারি-আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তাগণের বিনোদনের জায়গা। এই ক্লাবের সদস্যরা শিক্ষিত ও মার্জিত রুচির বলেই আমরা ভেবে নিতে পারি। উপরন্তু সরকারি কর্মকর্তারাই সরকারের আইন, নীতি ও আদেশাবলী সাধারণ মানুষের উপর প্রয়োগ করেন। এমন মর্যাদাজনক অবস্থানে যারা থাকেন তাঁরা সকলের নিকট অনুকরণীয় হবেন এবং তাদের বিনোদনের জায়গাটিও একই রকম উচ্চ পর্যায়ের সুরূচিসম্পন্ন হবে, এমনটিই প্রত্যাশা সকলের। এই ক্লাব পরিচালনার জন্য নিশ্চয়ই একটি ব্যবস্থাপনা পরিষদ আছে, আছে ক্লাবের নিজস্ব প্রশাসনিক পরিচালনা ব্যবস্থা। তো এরকম একটি মর্যাদাশালী জায়গায় মধ্যরাতে জুয়া খেলা চলতে পারে কী করে? তাও দেখা যায়, যে ৪ ব্যক্তি ধরা পড়েছেন তার অন্তত ১ জন এই ক্লাবের সদস্য হওয়ার যোগ্যই নন। ব্যাপারটি তো এমন হওয়ার কথা নয় যে, ক্লাব কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীর দৃষ্টি এড়িয়ে এরা খেলাধূলা করেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না ক্লাবেরই কেউ না কেউ (হতে পারে সে দারোয়ান বা অন্য কেউ) এই সুযোগ করে দিয়েছেন। সুতরাং এই জুয়া খেলার দায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না। তবুও ভাল যে, এমন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করতে ভ্রাম্যমান আদালত বিব্রত হননি।
সরকার জুয়া, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করেছেন। এই তিন অনুষঙ্গ আমাদের জাতীয় উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। তবে যেসব সামাজিক বাস্তবতা এমন মন্দ উপসর্গকে আমন্ত্রণ করে আনে তা দূর না করে শুধুমাত্র মাঝে-মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে আটকের মাধ্যমে এই ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি দূর হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। এইসব সামাজিক ব্যাধি দূর করতে হলে একটি ন্যায়পরায়ণ সমতাভিত্তিক সমাজ কায়েম করা হল জরুরি। মন্দের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহিষ্ণুতা শেষ পর্যন্ত ওই ধরনের একটি আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখুক এই আমাদের অভিপ্রায়।