মহামারী করোনা কালের ঈদ

এস ডি সুব্রত
ঈদ মানে খুশি , ঈদ মানে আনন্দ। আর এই আনন্দ যদি সবার কাছে ছড়িয়ে দেয়া যায় তা হয়ে উঠে অর্থবহ, সার্বজনীন।
ঈদুল ফিতরের এই ঈদে মুসলমান জাতি আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানে দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উৎসব ঈদুল ফিতর পালন করে থাকে। গোটা বিশ্বে মুসলিম জাতি আনন্দের সাথে এ দিনটি পালন করে থাকে। ঈদ অর্থ খুশি। ফিতর শব্দ টি এসেছে ফিতরা থেকে। ফিতরা হল রমজান মাসে রোজার ভুলত্রুটি দূর করার জন্য ঈদের দিন দুস্থদের অর্থ প্রদান করা।
ঈদের সামাজিক অর্থ উৎসব আনন্দ।আর আভিধানিক অর্থ পূনরাগমন বা বার বার ফিরে আসা। তাই ঈদ প্রতি বছর মুসলমানদের মাঝে ফিরে আসে। একটি হল ঈদুল ফিতর,আরকেটি হল ঈদুল আজহা।
আমাদের দেশে এই ঈদ উৎসবের পুংখানুপুংখু ইতিহাস আজো জানা যায় নি। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলেও নামাজ রোজা ঈদ উৎসব পালন হয়ে আসছে তার আগে থেকেই। বঙ্গদেশ যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে মুসলমানদের অধিকারে আসার বহু আগে থেকেই মধ্য পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলিম সুফী দরবেশগন ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে ভারত হয়ে পূর্ব বাংলায় আসেন। আবার আরবীয় অন্যান্য মুসলিম দেশের বণিকেরা চট্টগ্রাম নৌ বন্দরের মাধ্যমে বাংলার সাথে বানিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এভাবে মুসলিম পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল।তবে মুঘল আমলে ঈদের যে আনন্দ তা কিছু টা হলেও মুঘল ও বনেদি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তার সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদের কিছুটা দূরত্ব ছিল।
হিজরী বর্ষ পুঞ্জি অনুসারে রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের এক তারিখে ঈদুল ফিতর পালন করা হয়। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের সমাপ্তি তে শাওয়ালের প্রারম্ভ গণনা করা হয়।
ঈদের আগের রাতটিকে ইসলামের পরিভাষায় লাইলাতুল জাযজা যার অর্থ পুরস্কার রজনী এবং চলতি ভাষায় চাঁদরাত বলা হয়। শাওয়ালের মাসের এক ফালি নতুন চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদ হয় এই কথা থেকেই চাঁদরাত কথাটির উদ্ভব হয়।
এদিন ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। ঈদের দিন রোজা রাখা নিষেধ। মুসলিম বিধান অনুযায়ী ঈদের নামাজ পড়তে যাবার আগে একটি খেজুর কিংবা কোরমা খেয়ে বের হওয়া সওয়াবের কাজ।
আরবী ভাষায় সেহরী শব্দের অর্থ ঊষার পূর্বে খাবার। অর্থাৎ সূর্যোদয়ের আগেই খাবার। রমজান মাসে মুসলমানরা সূর্য উঠার আগে যে খাবার খায় তাই সেহরী।
রমজান মাসে মুসলমানরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখে মানে উপবাস থাকে। সারা দিন পানাহার থেকে বিরত থাকে।রোজা বা সিয়াম ইসলাম এর মুল পাঁচটি স্তম্ভের একটি।সুবেহ সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,
পাপাচার, কামাচার এবং যাবতীয় ভোগ বিলাস থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমানের জন্য রোজা রাখা ফরজ যার অর্থ হলো আবশ্যক।
সারাদিন রোজা রাখার পর সূর্যাস্তের পর যে খাবার খাওয়া হয় তাই ইফতার। খেজুর খাবার মাধ্যমে ইফতার শুরু করার রেওয়াজ আছে। আবার কোথাও জল পান করে ইফতার শুরু করা হয়।
আরবী শব্দ ফিতর থেকে ফিতরা এসেছে যার বাংলা প্রতিশব্দ পবিত্রতা। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের রমজান মাসে রোজার ভুলত্রুটি দূর করার জন্য ঈদের দিন অভাবী বা দূস্থদের অর্থ প্রদান করার রীতিই হল ফিতরা। ঈদের নামাজ পড়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করার বিধান রয়েছে।
যাকাত আরবী শব্দ । যাকাত হলো যা পরিশুদ্ধ করে। ইসলামের মূল পাঁচ স্তম্ভের একটি। প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক স্বাধীন মুসলমান নরনারী কে প্রতি বছর স্বীয় আয় ও সম্পত্তির একটা নির্দিষ্ট অংশ অর্থাৎ ইসলামী রীতি অনুযায়ী নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে এমন আয়ের অংশ গরীব দূস্থদের দান করাকে যাকাত বলে।
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ— এ গান হয়তো জনমনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না এবছর । কালো মেঘের আড়ালে হয়তো দেখা যাবে এক টুকরো রূপালী চাঁদ। কিন্তু এ চাঁদ মানুষের মনে কতটুকূ খুশির জোয়ার বইয়ে দেবে জানা নেই।ঈদ মানে নাড়ীর টানে স্বজনের কাছে ছুটে যাওয়া,ঈদ মানে মানে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের মিলন মেলা।ঈদ মানে কোলাকুলি, কুশল বিনিময়। কিন্তু এবারের ঈদ অন্যরকম।নভেল করোনা মহামারীর কারনে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশও থমকে গেছে, বিঘ্নিত হয়েছে স্বাভাবিক জীবন যাপন।বন্ধ অধিকাংশ কলকারখানা, অর্থ নীতিতে পড়ছে বিরুপ প্রভাব। মৃত্যু হানা দিচ্ছে সারা পৃথিবীতে। এপর্যন্ত বিশ্বে মৃত্যু ছাড়িয়েছে তিন লাখ। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মৃত্যু বরন করেছেন ৪৫২ জন।আক্রান্ত হয়েছে ৩২০৭৮ জন। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এবারের ঈদ একটু অন্যরকম।এবার ঈদের জামাত হবে না খোলা ময়দানে, হবে না কোলাকুলি। থাকবে সামাজিক দুরত্ব, এবারের ঈদে কেনাকাটার ভীড় নেই। নেই বাড়ি ফেরার জন্য টিকেট কাউন্টারে লম্বা লাইন।থাকবে না বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড় করোনা সংক্রমনের কারনে।
তার উপর আবার ‘ গোদের উপর বিষ ফোঁড়া ‘হয়ে দেখা দিয়েছে সুপার সাইক্লোন আম্পান । উপকূলীয় এলাকায় সাতক্ষীরা বাগেরহাট সহ বিভিন্ন জেলায় লন্ডভন্ড হয়েছে রাস্তা ঘাটে ,কৃষি জমি, চিংড়ি ঘের সহ মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিম জেলার পানের বরজসহ রাজশাহী অঞ্চলে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এ যেন ……” এক রামে রক্ষা নেই,সুগ্রীভ দোসর” । একেতো বিশ্ব ব্যাপী করোনা মহামারীর তান্ডব আবার উপকূলীয় অঞ্চলে ঘুর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাব। আসুন সবাই মিলে মানবিক সবার সাধ্যমত ।পাশের প্রতিবেশী , অসহায় দুস্থ মানুষের সাথে আরো বেশি করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে , প্রতিরোধ করি করোনা ,ঈদ উদযাপন করি ঘরে থেকেই।
লেখক: কবি ও গীতিকার। পরিদর্শক,জেলা সমবায় কার্যালয়,সুনামগঞ্জ।