মহামারী নিয়ে ব্যবসা নয়

শুধুমাত্র সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো দিয়ে করোনাক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা বজায় রাখা সম্ভব নয় বলে সরকার প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে করোনা চিকিৎসা করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রথম দিকে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হওয়া করোনা রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় সরকারিভাবে বহন করার ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিলো। এখন প্রাইভেট হাসপাতালে নিজ খরচে চিকিৎসা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর করোনা রোগ নিয়ে ব্যাপক বেনিয়াবৃত্তি ও অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে অগ্নিকা-ে ৪জন করোনা রোগীসহ ৫ জনের মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করেছেন রোগীর স্বজনরা। এ নিয়ে একটি মামলাও হয়েছে। রাজধানীরই আনোয়ার খান মডার্ন হসপিটালে করোনা চিকিৎসার জন্য রোগীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত টাকা নেয়ার খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। একজন রোগী যিনি হাসপাতাল থেকে কোনো আইসিইউ সুবিধা বা অক্সিজেন গ্রহণ করেননি, কেবল ২ হাজার টাকা খরচের কয়েকটি টেস্ট ও সামান্য কিছু গ্যাসের ঔষধ ও প্যারাসিটামল খেয়েছেন; তার কাছ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা গ্রহণের সংবাদটি এখন বহুল আলোচিত। ওই হাসপাতাল আরও রোগীর কাছ থেকে অনুরূপ টাকা আদায় করেছে। অথচ সরকারের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে তারা করোনা রোগীর কাছ থেকে কোনো টাকা নিতে পারে না। এই অবহেলা ও বেনিয়াবৃত্তির ঘটনা শুধু এই দুই হাসপাতালের নয়, বরং সারা দেশের সাধারণ চিত্র এরকমই বলে ধারণা করা যায়। মহামারী নিয়ে এমন চিকিৎসা দুর্বৃত্তায়ন একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত।
বাংলাদেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ ও সীমাবদ্ধতার অন্ত নেই। ছুটে ছুটেও আক্রান্তদের অনেকেই হাসপাতাল সুবিধা পাচ্ছেন না। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছেন অনেকে। সরকারি হাসপাতালগুলোর যে পরিমাণ সিট রয়েছে তার খালি আছে সামান্যই। প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে। এরকম অবস্থায় সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমানভাবে এগিয়ে আসার কথা। কিন্তু এর পরিবর্তে যদি বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা দুর্যোগ নিয়ে ব্যবসাদারী শুরু করে তাহলে সেটি চরম অমানবিক বিষয় হয়ে উঠে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এই দুর্যোগে সকলেই মানবিক উদারতা নিয়ে এগিয়ে আসবেন এ আমাদের প্রত্যাশা। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো ন্যূনতম অর্থ নিয়ে সেবার নতুন উদাহরণ তৈরি করুন তাহলে আপনাদের কথা সকলে মনে রাখবে।
আমাদের জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই প্রচুর অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসার সামর্থ রাখেন না। তাদের একমাত্র ভরসা সরকারি হাসপাতাল অথবা সরকারি ব্যবস্থাধীনে পরিচালিত প্রাইভেট হাসপাতাল। এই গরিব রোগীরা যাতে অন্তত টাকার জন্য চিকিৎসাবঞ্চিত না থাকেন সেই ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।
করোনা দুর্যোগ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে প্রকট করেছে। নতুন চিন্তার সুযোগ করে দিয়েছে। কার্যত আমাদের জনস্বাস্থ্য কতোটা হুমকি ও অবহেলায় রয়েছে এই করোনা দুর্যোগে সেটি ভালভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তুলতে সরকারকে এখন থেকেই মনোযোগী হতে হবে। যাবতীয় উন্নয়নের উদ্দেশ্য হলো মানবকল্যাণ। সুতরাং মানুষকে উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করতে কিংবা উন্নয়নের অংশীজন হতে হলে সুস্থ্য থাকতে হবে। এই সাধারণ সূত্রটি সকলকে মনে রাখতে হবে।