মহালয়ায় মহোৎসবের অধিবাস

স্টাফ রিপোর্টার
আজ মহালয়া। মা আসছেন। শুরু হলো বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম দুর্গা পূজার ক্ষণগণনা। আনন্দময়ীর আগমনে, ঢাকের বাদ্যে, শঙ্খ ও উলু ধ্বনি, চন্দনের সৌরভে, ধূপের ধোঁয়া, আরতির অনুষঙ্গে জগন্ময়ীর সামনে নব পরিধানে-সাজে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে সবাই। যান্ত্রিক জীবনের বাইরে গিয়ে স্মৃতির পাতায় সঞ্চিত হবে কিছু আনন্দঘন মুহূর্তের। বড় আনন্দের কয়েকটা দিন। প্রতি বছরের চেনা ছবিটারই আবার ফিরে আসা। আনন্দময়ীর আগমন আমাদের দিনগত পাপক্ষয়লব্ধ জীবনের সমস্ত হতাশা বিপন্নতা শোক ব্যাকুলতাকে ঢেকে দিতেই। আকাশ-বাতাসে এখন কেবলই আগমনীর সুর। সারাবছরের সব গ্লানি-ঘৃণা, হিংসা ভুলে মিলন উৎসবে মেতে উঠার দিন যে দোরগোরায় তা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন আজ।
‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে/বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির/ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা/প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা/মা আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীমও ছন্দে বেজে উঠে রূপ লোক ও রসলোকে আনে নব ভাব মাধুরীর সঞ্জিবন ’ (মাতৃবন্দনা -বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র)
কবির ভাষায় শারদীয় পুজা মানেই শরতের শিশিরভেজা প্রকৃতি, শরতের নবীন ভোরের আলো, কাশফুলের দুলুনি, কখনও কয়েক ছিটে ইলেশগুঁড়ি বৃষ্টি, গালিচার মতো বিছানো শিশির-ভেজা কমলা-সাদা শিউলি ফুলের মধুরতা। যদিও শহুরে জীবনে এসব দেখা যায় না বললেই চলে। এখন পূজার ছোঁয়া পাওয়া যায় বিপনী বিতান, জুতোর দোকান, প্রসাধনীর দোকানে এমনকি ফুটপাতের দোকানগুলোতেও নানা বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে, বাসা বাড়িকে মনের মতো সাজিয়ে তোলার প্রয়াসে, বন্ধুদের সঙ্গে মন্ডপে মন্ডপে ঘুরে কোন পাড়ার প্রতিমা গড়ার কাজ কতটুকু, কোনটি বেশি জাঁকজমক হবে, বেশি সুন্দর হবে, পূজার কয়েকদিন কোথায় কি কি আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজিত হবে, পূজার কয়েকদিন ঘুরে বেড়ানোর প্রোগ্রাম সাজানো এসব নিয়ে আড্ডা-বিতর্ক-চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যে।
শাস্ত্রীয় বিধান মতে, মহালয়ার অর্থ হচ্ছে মহান আলোয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আবাহন। কন্যা-জায়া-মাতৃরূপে শরৎকালেই দেবী দশভূজা পূজিত হন ঘরে ঘরে। কখনও তিনি উমা, পার্বতী, মহামায়া, কৈলাশি, দুর্গতিনাশিনী, পরমা প্রকৃতি, নারায়ণী, মাহেশ্বরী, গিরিজা, গৌরী, দাক্ষায়ণী আবার কখনও বা মহিষাসুরমর্দিনী দশপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গা। রামপ্রসাদ দেবী দুর্গাকে কন্যা বলে অবিহিত করেছেন। আবহমানকাল কৈলাস থেকে পিত্রালয়ে উমার এই আগমন যেন বিবাহিতা কন্যার বৎসরান্তে পিতৃগৃহে আগমনের রূপকমাত্র। সঙ্গে নিয়ে আসেন গণেশ, কার্ত্তিক, লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে।
শ্রীশ্রীচন্ডিতে বলা হয়েছে, জগৎপ্রপঞ্চের অন্তরালে এক মহাশক্তি আছেন। তিনিই মহামায়া। এই মহামায়াই জগৎ সৃষ্টি করেন, পালন করেন আবার প্রলয়কালে সংহারও করেন। অসুরদের দ্বারা নির্যাতিত দেবতারা মহামায়ার সহায়তায় অসুরদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য পুনরায় অধিকার করে নেন।
আশ্বিনের কৃষ্ণ পক্ষের তিথীকে বলা হয় মহালয়া। এই কৃষ্ণ পক্ষকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। পিতৃপক্ষে স্বর্গত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করা হয়। পিতৃপুরুদের তৃপ্ত করার জন্য তিল, জল, দান করা হয়। মহালয়া হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবী পক্ষের আগের দিন। মহালয়ার পর প্রতিপদ তিথি থেকে শুরু হয় দেবী বন্দনা। এক কথায় শারদীয় দুর্গা পুজার সকল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে আজ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে।