মাছ, মুরগি ও সবজির দামে আগুন

লিপসন আহমদ
রিক্সাচালক সুহেল মিয়া (২৫) সুনামগঞ্জ পৌর শহরের মল্লিকপুর এলাকার বাসিন্দা। তিন বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব নেন কাঁধে। মা, ছোট বোন ও ছোট ভাইকে নিয়ে তার সংসার। গত তিন মাস যাবৎ পরিবার নিয়ে কষ্টে আছে সুহেল মিয়া।
সুহেল বলেন, সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা ইনকাম করতে পারি। কিন্তু এই টাকা দিয়ে এখন সংসার চলে না। চাল কিনলে মাছ কিনতে পারি না। শুধু তাই নয় গরিবের মাছ হিসেবে বিখ্যাত পাঙ্গাস কিংবা তেলাপিয়া মাছও আগের চেয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এক মাস হয়ে গেল দুপুরে শুধু আলু ভাজি, আর রাতে শুধু ডাল দিয়ে ভাত খেতে হচ্ছে।
বুধবার সকালে সুনামগঞ্জ আধুনিক পৌর কিচেন মার্কেটের সামনে এই প্রতিবেদককে বলছিলেন সুহেল মিয়া।
সুনামগঞ্জ আধুনিক পৌর কিচেন মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, ছোট কিংবা বড় সব মাছেরই দাম আকাশছোঁয়া। মাছের বাজারে যেন মাছের আকাল লেগেছে। অনেক বিক্রিতারা মাছ বিক্রি না করে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। আবার অনেকেই আড়ৎ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি দামে নিলামে মাছ কিনে তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। প্রতি কেজি শিং মাছ (আকার ভেদে) বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, প্রতি কেজি রুই মাছের দাম (আকার ভেদে) ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাগুর মাছ ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়, পাঙ্গাস ১৬০ থেকে ১৯০ টাকায়, চিংড়ি প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়, বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়, টেংরা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, তেলাপিয়া ১৯০-২০০ টাকায়, সিলভার কার্প ১২০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুনামগঞ্জে গত ১৬ জুনের ভয়াবহ বন্যায় সকল পুকুরের মাছে ভেসে গেছে। এমনকি বিল থেকে যে মাছ এনে বিক্রি করব সেই সুযোগও নেই। কারণ এখন বিলে মাছ ধরার সময় নয়। আর নদীতে এখন মাছ পাওয়া যায় না। একারণে বাজারে মাছ কম উঠছে এবং দাম বেশি।
এদিকে মাছ বাজারের আড়ৎ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্যায় পানিতে সকল পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এখন অন্য জেলা থেকে মাছ এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব বাজারে পড়েছে। বাইরের জেলা থেকে যে মাছগুলো বাজারে আসছে ,সেগুলো দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
ক্রেতা হাকিম মিয়া বলেন, মাছের দাম যেভাবে বেড়েছে এখন আর নিয়মিত মাছ খাওয়া সম্ভব হবে না। সব পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষগুলো কিভাবে সংসার চালাব, সেই চিন্তায় আছি।
হুসাইন মিয়া বললেন, বাজারে মাছের যেন আকাল লেগেছে। যে মাছগুলো বাজারে রয়েছে সেগুলোর দ্বিগুণ দাম। তাই মাছ না কিনেই বাসায় ফিরে যাচ্ছি।
এদিকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুগরি ১৮০ টাকা কেজি, সোনালি মুরগি এক পিস ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। লাগামহীন দামের কারণে অনেকেই খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি।
মুরগি কিনতে আসা এক ক্রেতা জানান, বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসবে সেই জন্য মুরগি কিনতে আসছিলাম। কিন্তু বাজারে মুরগির যে দাম। মাছের সাথে মুরগির দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এমন কী ঘটনা ঘটল যে, কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা মুরগির দাম বেড়ে গেল?’
তবে মুরগি বিক্রেতারা বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে মুরগি আনতে তাদের গাড়ি ভাড়া বেড়েছে। মুরগির খাদ্যের দামও বেড়েছে। এছাড়া বন্যার পানিতে অনেক মুরগি মরেও গেছে। এখন গরমেও প্রতিদিন মুরগি মরছে, সব মিলিয়ে মুনাফার হিসাব করতে হচ্ছে।
অপরদিকে সবজির বাজারে গিয়ে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে কেজি প্রতি সবজি ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি, বেগুন ৬০ টাকা, পটল ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা, টমেটো ১২০ টাকা, লাউ ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পিস, শিম ১২০ টাকা কেজি, আলু ৩০, মুলা ৬০, করলা ৪০ টাকা।
ক্রেতা হামজা মিয়া ও হারুন মিয়া বলেন, সবজি ও মাছের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। তিনি বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানান।
সবজি বিক্রিতা শাহ আলম বলেন, বন্যার কারণে সুনামগঞ্জে সবজি ক্ষেতের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। বাজারে লোকাল সবজি কোন সবজি নেই। পাইকাররা জেলার বাইরে থেকে সবজি আমদানি করে আমাদের কাছে বিক্রি করে। আমরা তাদের কাছ থেকে যে দাম দিয়ে আনি, সেই তুলনায় কিছুটা মূল্য বেশি দিয়ে বিক্রি করি।