মাঝারি বন্যায় সড়কের বড় ক্ষতি

বন্যা যে ক’টি জায়গায় ক্ষতি করে সড়ক তার অন্যতম। সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ছোট বা মাঝারি আকারের বন্যা হলেই প্রায় সকল সড়ক ডুবে যায়। বন্যা ছাড়াও অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণেও কিছু সড়ক ডুবে। বন্যায় নিমজ্জিত হলে সড়কের ডুবন্ত অবস্থা বেশ ক’দিন অব্যাহত থাকে। এতে করে সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাংঘাতিকভাবে। বিশেষ করে বিটুমিনের তৈরি রাস্তাগুলোর ক্ষতি হয় সবচাইতে বেশি। বৃষ্টি ও বন্যাপ্রবণ বাংলাদেশে বিটুমিনের রাস্তা অকার্যকর বলেই প্রমাণিত। তারপরেও বিটুমিনের রাস্তাই প্রসারিত হচ্ছে। এখন গ্রামীণ রাস্তা-ঘাটও বিটুমিন দ্বারা তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিটুমিনের সড়কগুলোর উপযোগিতা বিষয়ে প্রকৌশলগত বিশ্লেষণ এখন নতুন করে করা উচিত বলে আমরা মনে করি। যাহোক চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে জেলার সড়কগুলোর ক্ষয়-ক্ষতির উপর গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সড়কের ক্ষতির কারণে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ যোগাযোগ দুর্ভোগে পড়েছেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত জেলার এমন কোন সড়ক খুঁজে পাওয়া যাবে না যে সড়কের অংশবিশেষ এই বন্যায় ডুবে যায়নি। এখন আস্তে আস্তে সড়কের উপর থেকে পানি সরে যাচ্ছে আর বেরিয়ে আসছে বন্যাজনিত ক্ষতির চিহ্ন। সড়কগুলোর উপর বিটুমিনের প্রলেপ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সড়ক আগে থেকেই ভাঙা চূড়া ছিলো, এখন অবস্থা চরমে পৌঁছেছে। সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষ ও যানবাহন চালকদের যন্ত্রণার শেষ নেই। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের ঘরে বসে থাকারও উপায় নেই। আর কয়দিনই বা বসে থাকবে। তাই অন্তত বেশ কিছু দিনের জন্য জেলাবাসীকে যাতায়াত দুর্ভোগ যে সহ্য করে যেতে হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এলজিইডি, সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলীর দেয়া তথ্য অনুসারে জেলার ৬০০ কিলোমিটার বিটুমিনের রাস্তার ২০০ কিলোমিটার অংশে পানি উঠেছে। এছাড়া ৯০০ কিলোমিটার আরসিসি রাস্তার ৮০০ কিলোমিটার অংশ ডুবেছে। ৫১টি সড়ক ভেঙ্গেছে এবং ১৫০ টি সেতুর এপ্রোচ ধসে পড়েছে। এ শুধু এলজিইডির সড়কের হিসাব। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জানাচ্ছেন, চলমান বন্যায় তাদের অংশের ১৫০ কিলোমিটার সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সড়ক এই হিসাবে অন্তর্ভূক্ত নয়। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের একই দিনের অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় সুনামগঞ্জ পৌরসভার অন্তর্গত সবগুলো সড়কই ব্যাপকভাবে ভাঙ্গাচূড়া। অন্যসব পৌরসভার সড়কেরই একই ধরনের হাল হবে। সুতরাং জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই মাঝারি বন্যাটি যে সড়কের বড় ক্ষতি করে গেছে তা অনস্বীকার্য। এখন এই সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বন্যায় সড়কের ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে সংস্কার কাজের প্রাক্কলন তৈরির কাজ নিশ্চয়ই এতদিনে শুরু করে দিয়েছেন। সংস্কারের তহবিলও হয়তো আসবে। কিন্তু সেই তহবিল আসা ও সংস্কার কাজ শেষ হতে কতদিন লেগে যাবে তা কেউ বলতে পারেন না। যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সংস্কার শেষ করার জন্য আমরা দাবি জানাই। এই জায়গায় আমাদের আহ্বান থাকবে, বৃষ্টি ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় কোন ধরনের সড়ক উপযোগী সে নিয়ে এখনই চিন্তা-ভাবনা শুরু হোক। অন্তত গ্রামীণ সড়কগুলোকে বিটুমিনের পরিবর্তে উন্নত মানের আরসিসি সড়ক করা যায় কিনা সেটি কার্যকরভাবে ভেবে দেখতে হবে। আমাদের উন্নয়ন কাজের স্থায়িত্ব খুবই কম। দুর্নীতি এর পিছনের সবচাইতে বড় কারণ। এর উপর প্রকৌশলগত কারণে যদি সড়কগুলোর স্থায়িত্বকাল আরও কমে যায় তাহলে সেটি হবে দুর্ভাগ্যজনক। আমাদেরকে এই দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি দিতে হবে।