মাদকের ভয়াবহতা ও এ থেকে বাঁচার উপায়

রিয়াজ উদ্দিন
মাদকের প্রতি আসক্তি বর্তমান পৃথিবীতে অন্যতম প্রধান একটি সামাজিক সমস্যা। মাদকাসক্তি হলো এক ধরনের আত্মঘাতী আসক্তি। মাদকাসক্তি দেশের প্রাণশক্তি যুব সমাজকে ধ্বংসের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। এটি সমাজের দেশের শান্তি,শৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ১৭ জনে ১ জন তরুণ মাদকাসক্ত। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ মাদকসংক্রান্ত মামলা হচ্ছে দেশে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে সাড়ে তিন লাখ মানুষ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত যার ১৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত! নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, দেশে ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত রয়েছে। উপরোক্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, দেশে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও মাদক সমস্যার লাগাম
টেনে ধরা যাচ্ছে না।
রাজধানী ঢাকা থেকে মফস্বল অঞ্চল এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত মাদকের ব্যপকতা ছড়িয়ে পড়ছে। সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে বিশেষ করে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে এখন শহরাঞ্চলের মতো চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। গত এক বছরে সুনামগঞ্জ জেলায় ১২৮ কেজি গাজা, ১৫ হাজার পিস ইয়াবা, ৪৯১ বোতল বিলেতি মদ এবং ২০০ লিটার চোলাই মদসহ অনান্য অনেক মাদক জব্দ করেছে সুনামগঞ্জের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সুনামগঞ্জ জেলায় যেভাবে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে তা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা আচিরেই ভয়াবহ আকার ধারণ করবে
মাদক এখন বেশিরভাগ অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। অধিকাংশ হত্যাকান্ডের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদকসেবীরাজড়িত। একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা যায় নেশাখোর সন্তানের হাতে ২০০ পিতা-মাতা খুন হয়েছেন এবং মাদকসেবী স্বামীর হাতে ২৫০ জন নারী খুন হয়েছেন। মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে পরিবারে নেমে আসে অশান্তির কালো ছায়া। মাদকাসক্ত সন্তানের অস্বাভাবিক আর দুর্ব্যবহারের কারণে সন্তানের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিতেও দেখা যায় অনেক পিতামাতাকে। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানির মতো ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হয়। আবার অনেকে যুক্ত হয় কিশোর গ্যাং-এর সাথে যা সম্প্রতি মানুষের মনে মারাত্মক ভীতির সঞ্চার করেছে। কিশোর গ্যাং এর কাজেই হলো এলাকার তথাকথিত ‘বড় ভাই’দের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ড কিশোররা দিবে মাদক কেনার অর্থের বিনিময়ে করে দেয়।
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যেসব কারণ দায়ী সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো মাদকাসক্ত চালক।
পুলিশের ভাষ্যমতে, সম্প্রতি সিলেট এমসি কলেজে স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ, নোয়াখালীতে বস্ত্রহীন করে মহিলাকে নির্যাতন করে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী ধর্ষণ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরারকে পিটিয়ে হত্যাসহ যতগুলো ঘৃন্য, লোমহর্ষক, অমানুষিক এই ধরনের কর্মকান্ড যারা ঘটিয়েছে তারা সবাই ছিল মাদকাসক্ত।
যে মাদকে আসক্ত হলে বিনষ্ট হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি, বাধাগ্রস্ত হয় দেশের উন্নয়ন, সংঘটিত হয় ধর্ষণ, হত্যা, খুন, ডাকাতির মতো ঘৃন্য কর্মকাণ্ড তবুও কেন অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা?
মাদকাসক্ত হওয়ার জন্য যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে তা হলো….
মাদকের সহজলভ্যতাঃ অনেকে বলেন চাহিদা থাকলে সরবরাহ হবেই তবে সরবরাহও কিন্তু চাহিদার সৃষ্টি করে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরে শুধু ইয়াবা বিক্রি হয় ৪০ কোটি পিস। ইয়াবা সেবনকারীর ৮৫% হলো শিক্ষার্থী। বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে দুর্বল নজরদারি, দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাদক ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি কারণে মাদক এখন অনেকটা সহজলভ্য। শহরে যদিও মাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান চোখে পড়ে কিন্তু গ্রামাঞ্চলে তার ঠিক উল্টোটা। গ্রামে মাদকের বিরুদ্ধে কোন শক্ত ভূমিকা নেই। অনেকে মনে করেন, গ্রামে যারা মাদকাসক্ত বা মাদক ব্যবসায়ী তারা স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী এবং স্থানীয় পুলিশের সাথে তাদের যোগাযোগ থাকে বলেই তারা নির্ভয়ে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
সচেতনতা মূলক কার্যক্রমের অভাবঃ যেকোনো সামাজিক ব্যাধি নিরসনের প্রধান উপায় সামজিক সচেতনতা জোরদার করা। যেহেতু মাদকাসক্তি একটি সামাজিক ব্যাধি সেকারণে এই ব্যাধি নিরসনে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। বিবিসি বাংলায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে নারায়নগঞ্জের এক তরুণী বলেন, ইয়াবা খেলে কী হয়, এর ক্ষতিকর দিকগুলো কী এই সম্পর্কে কেউ তাকে সচেতন করেন নি। অধিকাংশ তরুণ-তরুণী মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে যে কারণটি পাওয়া যায় তা হলো সচেতনতার অভাব।
বিচারহীনতাঃ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী মাদক মামলার প্রায় ৬০% আসামী খালাস পায়। মাদক নির্মূলে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে পুলিশ তবে অনেক জায়গায় দেখা যায় অনেক পুলিশ-সদস্য মাদক ব্যবসার সাথে জড়িইয়ে পড়ছেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মেজর সিনহা হত্যার জন্য দায়ী ওসি প্রদীপ ছিলেন মাদক ব্যবসার বড় প্রভাবশালী হোতা। এ যেন অনেকটা রক্ষক হয়ে ভক্ষক হয়ে যাওয়ার অবস্থা। আবার অনেক পুলিশ সদস্য মাদকাসক্ত যার প্রমাণ মিলছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ৬৮ জন পুলিশ সদস্য মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
মাদক মামলার আসামীদের বিচারহীনতার পেছনে অন্য আরেকটি কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক আশ্রয়। অনেক মাদক ব্যবসায়ীর অন্যতম প্রধান শক্তি রাজনৈতিক আশ্রয়।
অপসংস্কৃতির প্রভাবঃ বর্তমান সময়ের নাটক/সিনেমাগুলোতে মাদক গ্রহণের দৃশ্যে ভরপুর। এক শ্রেনীর যুবক মাদক গ্রহণ করাকে আধুনিকতার অংশ হিসেবে মনেকরে আবার একাংশ মাদককে জীবনকে উপভোগ করার মাধ্যমে ভেবে নেয়। আবার অনেকে একাকীত্ব, বিষন্নতা, বেকারত্ব ইত্যাদি মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ এর উপায় হিসেবে মাদককে গ্রহণ করে। এইসব ভুল আর আত্মঘাতী চিন্তা ও বিশ্বাসের ফলে দিনে দিনে মাদকাসক্তের পাল ভারী হচ্ছে। এছাড়া, মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে বন্ধুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
মাদকের এই নেশার জালে একবার জড়িয়ে পড়লে সহজে বের হওয়া যায় না। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলে হয়তো খুব দ্রুতই মাকদকের কড়াল গ্রাস থেকে বাঁচানো যাবে দেশের মানুষকে।

সচেতনতা বৃদ্ধিঃ মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সামাজিক সচেতনতা। প্রতিমাসে একবার মাদকের ভয়াবহতা ও বাঁচার উপায় বিষয়ক একটি সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে প্রতিটি স্কুল-কলেজে। প্রতি উপজেলায় ছাত্র ও অভিভাবক সমাবেশ করা যেতে পারে, টিভিতে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাদকে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, মাদকাসক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে নাটক/শর্ট ফিল্ম বানানো যেতে পারে । এছাড়া টিভিতে ধারাবাহিক একটি আয়োজন করা যেতে পারে, প্রতিটি দৈনিক পত্রিকায় সাপ্তাহিক বিশেষ কলামের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সর্বোপরি যেভাবেই সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করাঃ মাদক ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক মাদক ব্যবসায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে মুক্তি পেয়ে যায় এই বিষয়টি গুরুত্বের সহিত লক্ষ্য রাখা উচিত।
ডোপ টেস্টঃ মাদক নিয়ন্ত্রণ করার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে ডোপ টেস্ট। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ডোপ টেস্ট করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় ডোপ টেস্ট অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
নিরাময় কেন্দ্রর প্রসারঃ মাদকাসক্তি একটি মানসিক রোগ। নিরাময় কেন্দ্রে সুষ্ঠু চিকিৎসার মাধ্যমে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে দেশে লাইসেন্সবিহীন যত্রতত্র যেভাবে নিরাময় কেন্দ্র হচ্ছে এগুলো বাজেয়াপ্ত করে সরকারিভাবে প্রতি জেলায় একটি করে নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
এছাড়াও সন্তানের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ইত্যাদি বিষয়গুলো যত তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন হবে তত দ্রুত মাদকের ক্ষতিকর সামাজিক প্রভাব থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি।
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।