মাদকে ফাঁসানো ব্যক্তির কারাগারে মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার ও কাজী জমিরুল ইসলাম মমতাজ
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে মাদক বিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী সড়ক অবরোধ করেছেন। গ্রামবাসী পুলিশের বিরুদ্ধে নিরপরাধ নিরীহ ব্যক্তিকে অন্যের মদদে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পরে আসামীর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন। মৃত ওই ব্যক্তির নাম বাবুল বিশ্বাস (৩৫), তিনি উপজেলার জয়কলস গ্রামের মৃত আনন্দ বিশ্বাসের ছেলে। বুধবার রাতে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে তার মৃত্যু হয়। বাবুল বিশ্বাসের দুই স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। গত রোববার রাতে বাবুল বিশ্বাসকে আটক করে পুলিশ এবং সোমবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, বুধবার রাত ৭.৫২ মিনিটে বাবুল বিশ্বাস অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক তাকে সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে সেখানে ৮.১০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
তবে সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাবুল বিশ্বাসকে সদর হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে বাবুল বিশ্বাসের মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।
বাবুল বিশ্বাসের মৃত্যুর খবর জানাজানি হওয়ায় বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২ থেকে ১ টা পর্যন্ত জয়কলস গ্রামের লোকজন মিথ্যা মামলায় ধরে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ এনে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক অবরোধ করে। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের অভিযোগ, পুলিশের নির্যাতনে মুত্যু হয়েছে বাবুল বিশ্বাসের।
এদিকে রাস্তা অবরোধের কথা শুনে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হারুন রশীদ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আতাউর রহমান, উপজেলা পূঁজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দিলীপ কুমার তালুকদার, জয়কলস ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদ মিয়া, আব্দুল মজিদ কলেজের প্রভাষক নুর হোসেন, ইউপি সদস্য মসকু মিয়া, শিক্ষক মানিক লাল চক্রবর্তী ঘটনাস্থলে যান।
উপস্থিত দুই কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিগণ দোষীদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বিচারের আশ্বাস দিলে গ্রামের লোকজন অবরোধ প্রত্যাহার করেন। ময়নাতদন্ত শেষে বাবুলের লাশ জয়কলস শ্মশানঘাটে সৎকার করা হয়েছে।
বাবুলের প্রথম স্ত্রী দিপালী বিশ্বাসের দাবি, গ্রামের প্রতিবেশী আলী হোসেন, আনোয়ার হোসেন ও রমেন্দ্র বিশ্বাস তার স্বামীকে মদ দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে। ঘুম থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তার স্বামীকে মারধর করেছে। রোববার রাত ও পরদিন সোমবার সকালে থানায় গেলে বাবুল বিশ্বাসের সাথে দেখা করতে পারেননি তিনি।
তার দ্বিতীয় স্ত্রী অঞ্জলী বিশ্বাস বলেন, ‘আমার স্বামী কোন মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত নয় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ঘর থেকে সুস্থ সবল লোকটিকে ধরে নিয়ে তাঁেক পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’ কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী সামান্য চায়ের দোকান দিয়ে ৫ সন্তানের পরিবার কোন রকম চালাতেন। এখন আমাদের কি উপায় হবে। আমি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই পরিকল্পিত হত্যার বিচার চাই।’
সড়ক অবরোধ চলাকালে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার ওসি ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ শতাধিক মানুষের সামনে কাঁদতে কাঁদতে অঞ্জলী বিশ্বাস বলেন,‘ গত ২৭ মে রোববার রাত ৩ টার সময় দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার এসআই জিয়াউর রহমান বাবুল বিশ্বাসকে ঘুম থেকে ডেকে ধরে নিয়ে আসেন। পরে আস্তমা গ্রামে নিয়ে ৪ লিটার মদ উদ্ধার হয়েছে দাবি করে মাদক মামলায় আসামী করে অমানষিক নির্যাতন করে পরদিন সোমবার তাকে আদালতে প্রেরণ করেন।’
উজানীগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর ও জয়কলস গ্রামের আব্দুল শহীদ বলেন,‘ বাবুল বিশ্বাস একজন নিরীহ মানুষ ছিল। সে রাস্তার পাশে দোকান দিয়ে পরিবার চালাত। তাকে ঘুম থেকে ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। সে কোন সময়ই মদের ব্যবসা করত না। ’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্য (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন,‘ গত ২৮ মে আমরা তাকে মাদকের মামলায় আদালতে সোপর্দ করেছি। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। কি কারণে বাবুল বিশ্বাস মারা গেছে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তার তথ্য উৎঘাটন করবেন। ময়না তদন্তে যদি পুলিশের কোন নির্যাতনের ঘটনা চলে আসে তাহলে কর্তৃপক্ষ ছাড় দেবেন না।’
এক জায়গায় আসামী ধরে অন্য জায়গায় স্পট দেখানোর ব্যাপারে তিনি বলেন,‘ অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখব। যদি এ ধরণের হয়ে থাকে তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিচার হবে। নিরপরাধ কেউ যাতে সমস্যায় না পড়েন সে ব্যাপারে আমার নজর থাকবে।’ সড়ক অবরোধের সময় উপস্থিত বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীকেও থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী ঘটনার ন্যায় বিচারের আশ্বাস দেন।