মানবপাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ অনন্য

অন্তত আমাদের ক্ষুদ্র বিবেচনায়, অনন্য এক ঘটনা ঘটে গেল সুনামগঞ্জের আদালত অঙ্গনে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, একই পত্রিকায় দিরাই উপজেলার মানবপাচারকারী এনামুল হককে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদটি সুনামগঞ্জের মানবপাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: জাকির হোসেনের নজরে এসেছে। ওই সংবাদ নজরে আসায় আদালত দিরাই থানা পুলিশকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করে ২০ জুনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার আদেশ জারি করেছেন। আদেশে মানবপাচার, বিদেশ গমনকারী ব্যক্তিদের হেনস্তার শিকার হওয়া, মানবপাচারকারীদের দৌরাত্ম্য, ভূমধ্যসাগরে সম্প্রতি অভিবাসীদের সলিল সমাধি ঘটা; প্রভৃতি বিষয়ে আদালত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। আদেশের এক জায়গায় আদালত বলছেন, ‘বেকারত্ব ও আর্থিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর দালাল তাদের সংগীয় অন্যান্য দালালের সহায়তায় অনেক নারী ও যুবককে অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচারের অবৈধ কর্মে নিয়োজিত আছে এবং এর মাধ্যমে নিজেরা আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। পক্ষান্তরে ওইসব হতভাগা মানুষ সর্বশান্ত হচ্ছে এবং পাচারের শিকার হয়ে অনেকেরই সলিল সমাধি হচ্ছে’। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতার নির্যাস মাত্র। আমাদের চারপাশে একটু নজর দিলেই এই কথাগুলোর মর্ম বুঝতে একটুও সময় লাগবে না। কথার কথায় বলা হয়, আদালত নাকি অন্ধ, স্বাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে আদালতকে বুঝাতে হয় কোন কিছুর সত্য-মিথ্যা। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের বিচার ও আদালত ব্যবস্থা যে আক্ষরিক অর্থেই অন্ধ নয় বরং অনেক বেশি চক্ষুষ্মান আলোচ্য আদেশটি এর বড় উদাহরণ মাত্র। আদালতের এ ধরনের সামাজিক নজরদারি সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করবে নিঃসন্দেহে।
সুনামগঞ্জের মানবপাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে পাচারকারী এনামুল হকের বিষয়ে যে আদেশ ইস্যু হলো একে অনেকটা হাইকোর্টের স্বপ্রণোদিত (সুয়েমটো) রুলের মতো মনে করা যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে হাইকোর্টের স্বপ্রণোদিত রুলের খবর আমরা জানি। কিন্তু নি¤œ আদালতে এ ধরনের চর্চার খবর আমাদের জানা নেই। সুনামগঞ্জের কোন আদালত পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আদেশ অতীতে কখনও জারি করেছেন কিনা আমরা বলতে পারব না, বিজ্ঞ আইনজীবীরা সেটি ভাল করে বলতে পারবেন। তবে সাম্প্রতিক অতীতে এ ধরনের কোন আদেশ আমাদের নজরে আসেনি (অন্তত পত্রিকায় খবর হয়নি)। এ দিক দিয়ে মানবপাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই আদেশটি আমাদের কাছে অনন্য মনে হয়েছে। একই সাথে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিকারপ্রার্থী না থাকলেও আদালত যে হস্তক্ষেপ করতে পারেন সেই নজিরও তৈরি হলো। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক দিরাই থানা পুলিশ নিশ্চয়ই প্রতিবেদন জমা দিবেন। সেই প্রতিবেদন পেয়ে আদালত পরবর্তী পর্যায়ে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখান তা জানার জন্য এখন অনেকেই কৌতুহলী থাকবেন। আইনচর্চায় এই আদেশটি তাই বহু সচেতন মানুষের জন্য শিক্ষণীয় বার্তা বহন করছে।
তবে যে কথাটি আমরা বলতে চাই, সমাজে এখন বহুমাত্রিক অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে। অপরাধের মাধ্যমে ‘আঙুল ফুলে কলা গাছ’ হওয়াটাই আজকাল কিছু মানুষের জীবনের প্রধান ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কত মানুষের কান্নার পানিতে সমুদ্র তৈরি হলো, কত মানুষের হাহাকারে বাতাস ভারী হলো, কত মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গিয়ে স্বজনদের চিরকাতর করলো; সে নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা নেই অপরাধীদের। এই অপরাধীরা সংখ্যায় অল্প হলেও এদের জালে আটকা আজ সারা দেশের মানুষ। তাই আমাদের সকলের প্রিয় মাতৃভূমিকে মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য করে তুলতে হলে ওই সংখ্যাল্প অপরাধীগোষ্ঠীকে অবশ্যই নির্মূল করতে হবে। এই জায়গায় সুনামগঞ্জের আদালত থেকে জারি হওয়া আদেশটি সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।