মানবিক সত্বা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই

বিএনপি আবার সেই পুরানো সাম্প্রদায়িকতা ও তীব্র ভারত বিদ্বেষের তাস খেলতে শুরু করেছে বলে অনুমিত হয়। গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ অনুসারে, দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যিনি কার্যত দলীয় কার্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে সরকার বিরোধিতার নামে নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচীর উদ্ভাবক, তিনি রবিবার অনুরূপ এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় জনতা পার্টির সুব্রাহ্মনিয়াম নামের কোন এক নেতার কী এক উক্তির উল্লেখ করে সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি ভারত বিরোধিতাকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সুব্রাহ্মনিয়াম কী বলেছেন, রিজভি উল্লেখ করার আগে তা আমরা জানতে পারিনি। কারণ কোন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে এমন কোন খবর আমাদের চোখে পড়েনি। রাজনৈতিক কারণে অনেকে অনেক কিছুই বলেন। হয়ত সুব্রাহ্মনিয়ামও কথামালার রাজনীতিতে সেই চাতুরতা বা কৌশলেরই আশ্রয় নিয়েছেন। এরকম উত্তপ্ত কথামালা আমাদের দেশে অতীতে কম লক্ষ্য করা যায়নি। এখনও আছে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনতর উস্কানিমূলক পোস্ট কম দেখা যায়নি। সরকারি নজরদারি বাড়ানো ও এমন বিদ্বেষপূর্ণ পোস্টের বিষয়ে কঠোর মনোভাব পোষণ এবং এসব বিষয়ে কিছু আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনতর প্রোপাগান্ডা কমে গিয়েছে কিন্তু ইনিয়ে-বিনিয়ে এইসব কথা এখনও দেখা যায়। রাজনৈতিক দায়িত্বশীলদের মুখে গত কয়েক বছর ধরে ভারত ও ধর্ম নিয়ে বিরূপ কথাবার্তা বলতে কমই দেখা গেছে। এমন একটি স্বস্তিদায়ক পরিবেশে রুহুল কবির রিজভির বক্তব্য আমাদের কাছে অনভিপ্রেত মনে হয়েছে।
ভারত বিরোধিতা করা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ধরনের ফ্যাশন। স্বাধীনতার আগে থেকেই এই ধারা সক্রিয়। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়দান ইত্যাদি কারণে ধারণা করা হয়েছিল স্বাধীনতার পর এই ফ্যাশনের পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনীতিতে অনেক প্রতিক্রিয়াশীল বিষয়বস্তুকে যেমন পুনর্বাসন করা হয়েছে তেমনি সাবেকি ভারত বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিও পুনরায় আবির্ভূত হয়। কার্যত কথামালার রাজনীতিতে যাদের মুখে সর্বদাই তীব্র ভারত বিরোধিতা শোনা যায় তারাই এ দেশে ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণে বেশি ভূমিকা রেখে গেছেন। তাদের কথা ও কাজের এমন বৈপরীত্য আমাদের রাজনীতির দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা ছিল। কয়েক বছর ধরে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে ভারত বিরোধিতা তথা সাম্প্রদায়িক বিষয়াবলীতে বেশ দায়িত্বশীল দেখা গিয়েছিল। এতে সকলের মনে এমন আশা জাগ্রত হয়েছিল যে, একটি সস্তা জিনিস হয়ত আমাদের রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু জনাব রিজভির বক্তব্য আমাদেরকে আবারও আশংকার মধ্যে ফেলে দেয়। তবে রিজভির এই বক্তব্যের কোন প্রতিধ্বনি তাঁর দলের অন্য কারও মুখে শোনা যায়নি। সুতরাং সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া এই বক্তব্যকে আমরা জনাব রিজভির ব্যক্তিগত মন্তব্য বলেই ধরে নিতে চাই।
সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যমে এদেশে সংখ্যালঘুদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার-নিপীড়ন, ব্যাপকহারে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ, সংখ্যালঘুদের কার্যত দেশের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করে রাখা; এমন ভয়ানক অতীত এখনও আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। আধুনিক বিশ্বে আমরা সব ধরনের ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়গত বিভাজনের উর্দ্ধে উঠে মানবিক সত্বা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। এর মাধ্যমেই আমাদের জাতীয় উন্নয়ন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এই জায়গায় আমরা সকলের দায়িত্বশীলতা আশা করি।