মানুষের মৃত্যু এতোই সস্তা হয়ে উঠবে?

মহা ধুমধামে ট্রাফিক সপ্তাহ উদযাপনের সময়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ জেলায়ই সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের ডাবর এলাকায় বৃহস্পতিবার ভোরে দিরাই থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা লিমন পরিবহনের একটি বাস খাদে পড়ে গেলে আবু বকর ছিদ্দিক নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। ওই দুর্ঘটনায় ১৫ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এদিন রাতে একই সড়কের জেলা সদর সন্নিকটবর্তী ইকবালনগর এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের খুঁটিবাহী দুই লরির গতির প্রতিযোগিতায় একটি লরি খাদে পড়ে গিয়ে পথচারী ভানু দাসকে চাপা দিয়ে হত্যা করে। এই ঘটনায় ৭ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ঠিক একদিন আগে বুধবার একই সড়কের গোবিন্দপুর মোড়ে বেপরোয়া গতির একটি ট্রাক এক মোটরসাইকেলকে চাপা দিলে মোটরসাইকেল আরোহী মানিক মিয়ার মৃত্যু ঘটে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বুধ ও বৃহস্পতিবার জেলার সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে যে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোর জন্যই গাড়ির চালক দায়ী। দিরাই থেকে ছেড়ে আসা লিমন পরিবহনের বাসটি যাত্রীর চাইতে বিভিন্ন পণ্যে ঠাসা ছিল উপর থেকে নীচ পর্যন্ত। যাত্রীবাহী বাসে পণ্য পরিবহন করা অবৈধ। কারণ যাত্রীবাহী বাসের ডিজাইন পণ্য পরিবহনের উপযুক্ত নয়। ফলে ভারসাম্য হারিয়ে বাসটি খাদে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। পল্লী বিদ্যুতের খুঁটিবাহী লরি দুইটি একটি আরেকটিকে দ্রুত গতিতে অতিক্রম করতে চাইলে একটি ভারসাম্য হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। গোবিন্দপুরের মোড়ে যে ট্রাকটি মোটরসাইকেলকে চাপা দিয়েছে সেটিও বেপরোয়া গতির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এই ঘটনাগুলোকে কখনও নিছক দুর্ঘটনা ভাবার অবকাশ নেই। এগুলো সড়ক সেক্টরে যে দানবদের রাজত্ব চলছে তাদের বেপরোয়া মনোবৃত্তির পরিচায়ক এবং অবশ্যই এগুলো হত্যাকা-। দুর্ঘটনা সংঘটনকারী যানবাহনগুলোর চালকরা কেউ কোথাও ধরা পড়েননি। অর্থাৎ এই ঘাতকরা আপাতত নিজেদের নিরাপদ করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
ট্রাফিক সপ্তাহ চলমান থাকতেই দুর্বিনীত চালকরা যখন এরকম বেপরোয়াত্ব দেখানোর সাহস রাখেন তখন স্বাভাবিক অবস্থায় এরা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠে তা বলে বুঝানোর দরকার নেই। এই ধরনের খুনের নেশাগ্রস্ত চালকদের হাতেই আমাদের যাত্রীগনকে বাধ্য হয়ে সমর্পিত হতে হয়। উপরের দুর্ঘটনা তিনটিতে আহত ২২ ব্যক্তির অবস্থা কেমন সেই তথ্য গণমাধ্যমে আসেনি। সাধারণত মৃত্যু না ঘটলে এর সংবাদমূল্য নি¤œগতির থাকে, তাই দুর্ঘটনায় আহতদের বিস্তারিত তথ্য পত্রিকায় কখনও পাওয়া যায় না। গণমাধ্যমের এই মনোভাব গড়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত এরকম দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর খবর সহজলভ্য হওয়ার কারণে। খোঁজ নিলে জানা যাবে আহতদের মধ্যে অনেকেই বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছেন।
এখন আমাদের প্রশ্ন হলো, এই তিন দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কি কঠোর আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে? যারা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তারা বিচার চাওয়ার অনেক উর্দ্ধে উঠে গেছেন। রাষ্ট্র কি নিহতদের পক্ষে সুবিচার পাওয়ার জন্য ঘাতক চালকদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে? মানুষের মৃত্যু যদি এতোটাই সস্তা হয়ে যায়, যেখানে ঘাতককে ন্যুনতম শাস্তির প্রতিবিধান করা যাবে না, তখন এই ধরনের হত্যাকা- বাড়তেই থাকবে। আমরা নিরবেই মৃত্যুর এই না থামা মিছিল দেখে যাব? তাহলে ঐতিহাসিক কিশোর শিক্ষার্থী আন্দোলনের ফলে জেগে উঠা গণসচেতনতা আর চলমান ট্রাফিক সপ্তাহ ঘটা করে পালনের স্বার্থকতা থাকে কোথায়?