মানুষে মানুষে বৈরিতার বিনাশ চাই

ইকবাল কাগজী
‘আমরা আসলেই এক ভীষণ বিরোধপূর্ণ পৃথিবীতে বাস করি। এটি একটি পাশবিক ঘটনা বহুল সমাজ।’ এই বিবৃতিটি অ্যালেন বাদিয়্যু নামের একজন দার্শনিকের। ২০০১ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই কথা বলেন। পৃথিবীতে সমাজ বিরোধপূর্ণ এবং অনিবার্য পাশবিক ঘটনা ঘটার পক্ষে নিরন্তর শ্রেণিবৈরিতা তৈরি করা সমাজের বর্তমান আর্থসামাজিক বিন্যাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শ্রেণিবৈরিতার একটি সরলার্থ হতে পারে মানুষে মানুষে বৈরিতা। পৃথিবীর উন্নত কিংবা অউন্নত প্রতিটি জনপদের মানবিক পরিস্থিতির বিষয়ে নিতান্তই কম জানি, এই সত্যটি স্বীকার করে নিচ্ছি, কিন্তু এ কথা তো সত্য যে, পর্যাপ্ত গণমাধ্যমেরÑ বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেরÑ কল্যাণে স্বদেশের  মানবিক পরিস্থিতির অজানা থাকার কোনও অবকাশ নেই, যদি না কেউ বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনভাবে উদাসীন না থাকেন। আজকের (বুধবার ১১ অক্টোবর ২০১৭) পত্রিকার, পত্রিকাটি সমকাল,  কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম তুলে দিচ্ছি, পরিস্থিতিটা হৃদয়ঙ্গম করার জন্য : ১. বগুড়ায় বখাটের উত্ত্যক্তে আরও এক ছাত্রীর আত্মহত্যা,  ২. বগুড়ায় কিশোরী ধর্ষণ ও নির্যাতন, তুফানসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট, ৩. আসামি না পেয়ে চাচাকে হত্যা, কালাইয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার অভিযোগ, ৪. জিডিতেই দায় শেষ, ঢাকায় বেড়েছে ছিনতাই, ৫. সিলেটে ইয়াবাসহ স্বামী-স্ত্রী আটক, ৬. বাগেরহাটে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার ১, ৭. পিডিবিএফে নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি, ৮. জঙ্গি মারজানের বোন খাদিজা জেলহাজতে, ৯. রক্ষকরাই ভক্ষক রাজশাহিতে, ১০. ঢাবি উপাচার্য চ্যানেল অবৈধ। ব্যস! আর নয়,  আপাতত এইটুকু পর্যন্ত। আর তার পরে তো ‘রান্নাঘরে আরও আছে’-য়ের মতো আছে সিন্দুবাদের ভূতের মতো ঘাড়ে চড়ে বসা রোহিঙ্গা সংকট, যে-রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ এখন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইতোমধ্যেই এই সংকটের গর্ভে আরও একটি ভয়ঙ্কর সংকটের অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছেন বিজ্ঞ বিশ্লেষকরা। তাঁরা মনে করছেন: বাংলাদেশে তো বটেই, রোহিঙ্গা সংকট সমগ্র দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় অচিরেই আবির্ভূত হতে পারে দানবিক সন্ত্রাসের প্রতিমূর্তিতে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যে এই ভয়ঙ্কর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে যে, ভারতকে অস্থিতিশীল করে তুলার দুরভিসন্ধিতে পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠনগুলো ভারতে আশ্রিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্য থেকে সদস্য সংগ্রহ করছে। বিবেচনা করুন, সমাজে মানবিক পরিবেশ কতোটা ভালো আছে কিংবা থাকবে, আর মনে রাখা দরকার অতীতেও তেমন ভালো কখনওই ছিল না।    
কদিন আগে এক পত্রিকায় বাংলাদেশের এক চিন্তক, আবুল কাসেম ফজলুল হক, বলেছেন : একগুচ্ছ সমস্যা সমাধানের সাপেক্ষে, ‘পৃথিবীটা সবার জন্য অনেক সুন্দর ও সুখময় করে তোলা সম্ভব।’ তাঁর সমস্যার তালিকাতে আছে :  গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে প্রগতিহীনতা, সা¤্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিগ্রহ, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকদ্রব্যের প্রসার, অসামাজিক কার্যকলাপ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, নৈতিক পতনশীলতা, জুলুম-জবরদস্তি, অপব্যবস্থা ও দুর্নীতি ইত্যাদি। এই তালিকার ‘সা¤্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিগ্রহ’ ছাড়া বাকি সবকটি বাঙলাদেশে বহুল চর্চিত, বরং বর্তমানে এসব অপকর্মের চর্চা ব্যাপকাকারে বেড়েছে । এই মওকায় বলে রাখা ভালো যে, ‘সা¤্রাজ্যবাদী যুদ্ধ’ বিষয়টি বর্তমানে মিয়ানমারের দেওয়া উসকানির পর্যায়ে আছে, বাংলাদেশ একটু অসহিষ্ণু হলেই সেটা ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’-য়ের সকল সম্ভাবনাকে কাচকলা দেখিয়ে বাংলাদেশের উপর বলতে গেলে হামলে পড়বে। এটুকু সর্বজনের জানা আছে যে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হলো একটি নীতি, যে নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আলাপ-আলোচনা, চুক্তি, কখনও বা পরস্পরের পক্ষে গ্রহণযোগ্য আপস-মীমাংসা এবং পারস্পরিক কল্যণকর সহযোগিতা ইত্যাদি কর্মপ্রয়াস অবলম্বন করে বিরোধ নিরসন করা যায়। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌটনীতিক সম্পর্ক চীন, রাশিয়া, ভারত ও আমেরিকার সা¤্রাজ্যবাদী স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার কারণে অনতিক্রম্য ব্যবধানে পর্যবশিত হয়েছে এবং প্রকারান্তরে বিশ্ববাসীর সম্মুখে রোহিঙ্গাসংকটে বাংলাদেশের সহিষ্ণুতার পরীক্ষা দেওয়াটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে।   
অবস্থা যখন এরকম তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন  উঠতে পারে, দেশটা কি আদপেই বসবাসের উপযুক্ত আছে? দেশের এই যখন অবস্থা  তখন বিশ্বমানবিক পরিবেশও তেমনি ভালো নেই। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য মিয়ানমারে  ধারাবাহিক নিষ্ঠুরতা চলছে। বিশ্ব মড়ল আমেরিকাসহ চীন, রাশিয়া ও ভারত এই রোহিঙ্গা সমস্যাকে নিজেদের পুঁজিবাদী স্বার্থে ব্যবহারে কসুর করছে না, তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি বাণিজ্যিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চায়, আর সেটা করতে গিয়ে বাংলাদেশে তাঁরা শরণার্থী সমস্যার সঙ্গে রাজনীতিক অস্থিরতা সৃষ্টির যাবতীয় উপকরণসহ ব্যাপক সন্ত্রাস রপ্তানি করছে এবং প্রকারান্তরে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথটিকে চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে এখানে নিজেদের পণ্যের বাজার সৃষ্টির স্বপ্ন দেখছে, এমকি অস্ত্রবিক্রির বাজার করার জন্য এখানে তারা সন্ত্রাসের কিংবা যুদ্ধের চাষ করতে কার্পণ্য করবে না। ভুলে গেলে চলবে না যে,  রোহিঙ্গাসংকট বাংলাদেশে রপ্তানি করে ইতোমধ্যে অস্ত্র, মাদক, সন্ত্রাস, যুদ্ধ রপ্তানির ক্ষেত্র  প্রস্তুত করা হয়ে গেছে। প্রয়োজনে তারা সরকার কিংবা সন্ত্রাসী দু’পক্ষের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করবে, তাদের চাই মুনাফা, মুনাফা অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে তারা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দিতেও পিছপা হবে না।  তা ছাড়া এই রোহিঙ্গাসমস্যাকে কেন্দ্র করে ব্যাপকাকারে ‘প্যান-ইসলামিজম’ দৃশ্যমান হতে শুরু করলে এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী দমনযুদ্ধ ঘোষণার মওকা সন্ধান করবে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি। সর্বাবস্থায় সকল সম্ভাবনাকে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি তাঁদের মুনাফা অর্জনের স্বার্থে কাজে লাগাবার সুযোগ সন্ধান করে, এই কথা মনে রাখার সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, অপশক্তি সমগ্র বিশ্বটাকেই দখল করে নিয়েছে, পুঁজিবাদী মুনাফালোভী রাষ্ট্রগুলোর হাত থেকে আর্থনীতিকভাবে দুর্বল ও অউন্নত রাষ্ট্রগুলোর কোনও সুরক্ষা নেই, যদিএকাট্টা হয়ে সা¤্রাজ্যবাদী বিশ্ব আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ উত্থান সম্ভব না হয়। সা¤্রাজ্যবাদের মুনাফা শিকারের ক্ষেত্র প্রসারিত করার লক্ষ্যে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে অবর্তীর্ণ হয়ে নিজেকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের আপোষহীন পথে কদম ফেলা ছাড়া আর কোনও গত্যান্তর নেই।     
বাংলাদেশের এই যখন অবস্থা তখন কিন্তু খোদ আমেরিকাতেও গণহত্যা হচ্ছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে জানা যায়, সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অস্ত্রের গুলিতে মানুষ মরছে। এক একটি ঘটনায় এক দুজন হতে প্রায় শতজন পর্যন্ত।  কিন্তু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না অস্ত্রব্যবসায়ীদের বিরোধিতার মুখে। নরহত্যা অব্যাহত থাক,  অস্ত্র বিক্রি করে আরও বেশি বেশি মুনাফা চাই।  এমনও সংবাদ পাওয়া গেছে, একবার পাঁচ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ ছিল না, হাজার হাজার নারী সম্ভ্রমহানির শিকার হয়েছিল, তথাকথিত সেই সভ্য ও উন্নত দেশে। পাশ্চাত্যে এইরূপ হাজার  কৌন্দর্যতার পাশাপাশি আর একটি বৃহৎ অমানবিকতা আছে, সেটি হলো পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তির যুদ্ধজীবিতা। তারা কমবেশি সকলেই যুদ্ধবাজ চরিত্রের আড়ালে প্রকারান্তরে মানববিদ্বেষী, এককথায় খুনি এবং বিশ্বব্যাপী এই অমানুষিকতার চূড়ান্ত লক্ষ্য মুনাফা। এই যুদ্ধবাজ চরিত্রের জন্য পৃথিবীকে দুইটি বিশ্বযুদ্ধের ধকল সইতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কেবল রাশিয়াতেই ৫ কোটি মানুষ নিহত হয়েছে। ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধ বলতে গেলে শেষ হয়ে গেছে। বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যোদ্ধারা ঘরে ফিরছে। কিন্তু আমেরিকা নিজেকে বিশ্বে পরাশক্তিরূপে হাজির করার আসুরিক আকাক্সক্ষার বশবর্তী হয়ে দুইটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, ৬ ও ৯ আগস্ট যথাক্রমে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে। বিস্ফোরিত এই এটম বোমার ভয়ঙ্করত্বের প্রত্যক্ষদর্শী পদার্থবিদ কেনেথ বেইনব্রিজ  মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমরা সবাই এখন কুত্তার বাচ্চা।’ বিজ্ঞান ও রাজনীতির অবৈধ সঙ্গমের এই হলো ভয়ঙ্কর পরিণতি। আর বর্তমানে বিশ্বে যতোগুলো পারমাণবিক বোমা বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে, এমনকি ইসরাইল কিংবা পাকিস্তানের কাছেও, মজুদ আছে, সেগুলো দিয়ে পৃথিবীকে, বোধ করি, কয়েক  হাজার বার অনায়াসে ধ্বংস করা যাবে। অথচ বিজ্ঞানের এই শক্তিকে মানবকল্যাণের কাজে লাগালে পৃথিবীতে অস্তিত্বশীল  সভ্যতাবিরোধী সকল অকল্যাণকে নির্মূল করা সম্ভব হতো।
বিশ্বকে পুঁজিবাদ যুদ্ধ ব্যতীত শান্তি উপহার দিতে পারে না। পুঁজিবাদ দেশে দেশে যুদ্ধ রফতানি করে। বাংলাদেশে পুঁজিবাদ রপ্তানি করেছে মূর্তিমান অশান্তির আগ্নেয়গিরি রোহিঙ্গাসংকট। শান্তিকে বিনাশ করে পুঁজিবাদের চাই  একটি মুক্তবাজার অর্থনীতি, সে হোক অস্ত্র কিংবা ইয়াবার বাজার। মোদ্দা কথা পুঁজিবাদের চাই অধিক মুনাফা। মনে রাখতে হবে, পুঁজিবাদী পশ্চিমা অপশক্তির অধীনে বিশ্ববাসীর  ভবিষ্যৎ তিমিরাচ্ছন, কারণ সেখানে মানুষের জন্য কোনও কল্যাণ অপেক্ষা করে নেই, নেই কোনও মানবিকতা। এই অপশক্তির নাগপাশ থেকে মানবপ্রজতির মুক্তি চাই, চাই পুঁজিবাদের বিনাশ। এখন পৃথিবীতে একটি নতুন মানবিক বিশ্বআর্থব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাসংকট থেকে রেহাই পেতে হলে চাই পুঁজিবাদের বিপরীতে সমাজে কার্যকর একটি অর্থনীতি, একটি নতুন আর্থসামাজিক বিন্যাস, যেখানে রাষ্ট্র পুঁজির দাসে পরিণত হবে না। এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভেতরে উদ্বাস্তু ঠেলে দেবে না। সেখানে মানুষ বাঁচবে সত্য, স্বাধীনতা ও সুন্দরের জন্য আর সকল মানুষের সমবেত প্রচেষ্টা নিয়োজিত থাকবে পৃথিবী ও পৃথিবীর বাইরের বিশাল প্রকৃতিকে রক্ষার কাজে।