মায়ের প্রতি ভালবাসা

মো.মশিউর রহমান
মা ডাকলে বুক ভরে যায়। কি মধুর শব্দটি। মা ডাকলে প্রাণ শীতল হয়ে যায়। মা শব্দটিই পৃথিবীতে অধিক উচ্চারিত শব্দ। মায়ের সাথে কারো তুলনা হয়না। দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন কষ্টে গর্ভে ধারন করে মা সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখে। সন্তানের মুখ দেখা মাত্রই মা সকল কষ্ট ভুলে যান। মায়ের সাথে সন্তানের যে সম্পর্ক সেটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই মায়ের বিকল্প হিসেবে ভাবা যায়। সেই মাকে সম্মান জানানোর জন্যেই বিশ্ব মা দিবস। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস হিসেবে পালিত হয়। আজ বিশ্ব মা দিবস। প্রতি বছরের ন্যায় সারা বিশ্বে দিবসটি উৎযাপিত হচ্ছে। মা দিবস প্রথম উৎযাপিত হয় গ্রিস ও রোমে। প্রাচীন গ্রিকরা তাদের দেবতা গ্রিককের মা রিয়ার সম্মানে উৎযাপন করতো বসন্ত উৎসব। ১৬ শতকে যুক্তরাজ্যে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি দিবস পালন করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রে এ দিবসটি প্রচলন হয় শান্তিকামী জুলিয়া ওয়ার্ড হোর উদ্যোগে ১৮৭২ সালে। এরই ধারাবাহিকতায় মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর স্বীকৃতি ও প্রসার ঘটে ১৯১৪ সালের ৮ মে ভার্জিনিয়ায়। অনেকের মত আমারও মনে প্রশ্ন জাগে মাকে ভালবাসা জানানোর জন্যে কি কোন দিবসের প্রয়োজন আছে? মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা মা দিবসের মত প্রতি দিনেই দেখানো উচিত। মায়ের সাথে সন্তানের নারীর সম্পর্ক। সন্তান যদি সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে বিপদে থাকে। মা সেটা জেনে যান। মা হলেন এমনই একজন ব্যক্তি যিনি শুধু সন্তানকে দিতে জানেন। বিনিময়ে কিছুই আশা করেন না। মায়ের সাথে সম্পর্কের কখনও বিচ্ছেদ ঘটে না । তিনি শুধু চান তার সন্তান সর্বদা ভাল থাকুক। কোথায় মায়ের বর্ণনা নেই। ধর্মে, সাহিত্যে, গানে, সিনেমায়। পৃথিবীর সকল ধর্মেই মায়ের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে একটি হাদিসে বলা হয়েছে- ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত’। এক সাহাবী রাসুলুল­াহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন ‘আমার সুন্দর ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ আল­াহর রাসুল (সাঃ) স্পষ্টভাবে ঘোষনা করলেন ‘তোমার মা’। সাহাবী আবার জিজ্ঞেস করলেন। রাসুল বললেন তোমার মা। সাহাবী আবার জিজ্ঞেস করলেন ‘আমার মায়ের পরে আমি কার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করব?’ এরপর তিনি তাগিদ দেয়ার জন্যে বললেন তোমার মায়ের অধিকার পালন করতে হবে। তাঁর সঙ্গে তোমাকে সুন্দর আচরণ করতে হবে। চতুর্থবার বলেছেন ‘অতঃপর তুমি তোমার বাবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করবে।’ পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের উক্তিগুলো পর্যবেক্ষন করলে মায়ের গুরুত্ব ও মর্যাদার কথা পাওয়া যায়। আব্রাহাম লিংকন বলেছেন- ‘আমি যা কিছু পেয়েছি যা কিছু হয়েছি অথবা যা কিছু হতে আশা করি তার মধ্যে আমি আমার মার কাছে ঋনী’। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং বলেছেন ‘মাতৃত্বের সকল মায়া মমতা ও ভালবাসার শুরু ও শেষ’। শিক্ষিত জাতি গঠনের ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। সন্তানের শিক্ষার প্রথম পাঠ শুরু মায়ের কাছেই। মায়ের মুখের ভাষা দিয়েই কথা বলা শুরু হয়। নেপোলিয়ন বলেছেন ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেব’। গানেও মায়ের সরব উপস্থিতি। খুরশীদ আলমের জনপ্রিয় গান- ‘মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা’, ফকির আলমগীরের ‘মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম’, ফেরদৌস ওয়াহিদের ‘এমন একটা মা দেনা’, জেমস এর ‘রাতের তারা আমায় তুই বলতে পারিস’, নচীকেতার ‘ছেলে আমার মস্ত বড় মস্ত অফিসার’ মাকে নিয়ে গান গুলো খুবই জনপ্রিয় এবং আবেদনময়ী। মাকে নিয়ে অনেক কবি তাদের কবিতায় মায়ের মর্যাদা, সম্মান তুলে ধরেছেন। হুমায়ুন আজাদের ‘আমাদের মা’, কাজী নজরুলের ‘মা’, রবীন্দ্রনাথের ‘বীরপুরুষ’, ‘মনে পড়ে’, ‘লুকোচুরি’, কামিনী রায়ের ‘কত ভালবাসি’ কবিতা গুলো যুগে যুগে মায়ের সাথে আত্মার সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। মাকে নিয়ে লেখা ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস তো বিশ্ব ব্যাপী সর্বাধিক পঠিত। বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসও তো বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। মায়ের বন্দনার শেষ নেই। পৃথিবীর সব মায়েই শ্রেষ্ঠ। মায়ের অবদানেই সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মায়ের কোলে মাথা রেখে যে সুখ পাওয়া যায় সেই সুখ কি আর কোথাও পাওয়া যায়। আমরা ব্যাথা পেলে বা অসুস্থ হলে মাকে ডাকতে থাকি। বিপদে মায়েই শান্তনার আশ্রয়স্থল। অসুস্থ সন্তানকে মায়েই সেবা শশ্রুষা করে রোগ থেকে সারিয়ে তুলেন। বর্তমান বিশ্বায়ন ও নগরায়ন প্রক্রিয়ার ফলে ব্যস্ত নাগরিক জীবনে প্রযুক্তির নির্ভর জীবন যাপনে অভ্যস্ত,পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হয়ে আমরা মাকে কতটুকুই বা সময় দিচ্ছি। মা দিবসে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম গুলোতে আর্কষনীয় একটি সেস্টাস ও মায়ের সাথে একটি ছবি শেয়ার করলেই কি মায়ের প্রতি আবেগ, ভালবাসা দেখানো হয়। বৃদ্ধ বয়সে মায়ের যত্নের প্রতি আমরা কতটুকু সচেতন। আমরা কি পারছি হৃদয় ছেড়া ধন, আত্মার আত্মীয়, কলিজার টুকরো মাকে সঠিক ভাবে পরির্চযা করতে। দেশে দিন দিন বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বৃদ্ধাশ্রমে মায়েরা কেমন আছেন? সেটা কি আমরা জানি। তাঁদের মনের কথা আমরা কতটুকুইবা জানি। অনেক মা অনাদরে অবহেলায় দিন কাটাচ্ছেন। বৃদ্ধ বয়সে অনেক মা তিন বেলা খাবার পাচ্ছেন না, চিকিৎসার ঔষদ পাচ্ছেন না। মা দিবসে পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যাবে সন্তান থাকা সত্বেও বৃদ্ধ মা ভিক্ষা করছেন বেচেঁ থাকার তাগিদে। সন্তানেরা মাকে লালন পালন করছে না। সময়ের প্রয়োজনেই ২০১১ সালে পাস হওয়া পিতা মাতার ভরন পোষন আইনে সন্তানকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বলা হয়েছে মা বাবা যেখানে থাকতে চাইবেন তাঁদের সেখানেই থাকতে দিতে হবে। শুধু তাই নয় তার সঙ্গে ভরন পোষনও দিতে হবে সন্তানকে। আইনে ভরনপোষন না দিলে সন্তানকে দুলাখ টাকা জরিমানা ও তিন মাসের কারাদন্ডের কথা হয়েছে। আইন করে মা বাবাকে ভরনপোষন দিতে হবে । ভাবতেই কেমন লাগে। কতটুকু অমানবিক হলেই আমাদের জন্য এই আইনের প্রয়োজন হয়। মানুষের বিবেকবোধ জাগ্রত না হলে মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হবে না। আজকের এই বিশেষ দিনে মাকে নিয়ে অনেক স্মৃতির কথা মনে পড়ছে। আমার মা গ্রামের অল্প শিক্ষিত ধর্মপরায়ন একজন মহিলা। মা নানার অতি আদরের মেয়ে ছিলেন। অর্থ বিত্তের অভাব ছিল না। তাই মায়ের হাত সব সময় একটু খোলা ছিল। প্রায় অর্ধশত বছর পূর্বে বাবার সংসারে এসেও মা হিসেব নিকেশের প্রতি ছিলেন একটু উদাসীন। ফলে চরম আর্থিক দৈন্যতার মধ্যে মাকে সংসার চালাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। মায়ের সেই কষ্টটুকু দেখেছি। হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি। তারপরও আমাদের নয় ভাইবোনদের সবার প্রতিই মা ছিলেন দায়িত্বশীল। সত্তরের কোটায় মায়ের এখনও সংসার থেকে মুক্তি মেলেনি। প্রযুক্তির সুবাধে বাড়ির বাহিরে অবস্থানরত ছেলে মেয়ে নাতী নাতনীদের খোজঁ খবর প্রতিনিয়তই নিচ্ছেন নিজের শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও। এই করোনার মহামারিতে লকডাউনে দিন শেষে আমাকে সেই মায়ের কোলেই ফিরে যেতে হয়। শনির হাওরের এক নিভৃত পল্লীতে থাকা মাকে রাতে ফোনে খুঁজে ফিরি। মাকে ফোন দেয়া মানে মায়ে বারো ভাই বোনসহ তাদের অর্ধশত সন্তানাদির খোঁজ পেয়ে যাওয়া। সাথে আমার গ্রামে সকলের খবর পাওয়া। ফোনে মায়ের কন্ঠটা শুনলে হৃদয় জুড়িয়ে যায়। জাগতিক জীবনে অনেক কষ্টের মাঝের হৃদয়ে প্রশান্তি মেলে। আমিও আমার দুই মেয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখি আসলেই মা কতখানি আদর যত্ন দিয়ে কষ্ট করে আমাদেরকে মানুষ করেছেন। আজকের এই দিনে সকল মায়েদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ভালবাসা। একই সাথে শপথ নেই আমরা মায়ের সেবা করব, মায়েদের প্রতি যত্নশীল থাকব। একদিন নয় প্রতি দিনই হোক মা দিবস।
লেখক- প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি দিগেন্দ্র বর্মন কলেজ, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ।