মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পুরাতন সার্কিট হাউস সংরক্ষণের দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি ও পুলক রাজ
জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রের মুক্তিযুদ্ধ সহ ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী পুরাতন সার্কিট হাউস ভবনকে সংরক্ষণের দাবি ওঠেছে। সুনামগঞ্জের সন্তান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিকও মঙ্গলবার পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি সহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের কাছে এমন দাবি জানিয়ে অনুরোধপত্র পাঠিয়েছেন।
কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক তাঁর অনুরোধ পত্রে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে প্রথম পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে ঘাঁটি স্থাপন করে এখানে এবং সুনামগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই ভবনের চারপাশ থেকে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই ভবনের চারপাশ থেকে মুক্তিবাহিনী অর্থাৎ ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ভবনে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেন। প্রথম প্রহরের এই যুদ্ধে ভবন থেকে ছোড়া গুলিতে সুনামগঞ্জের আবুল হোসেন শাহাদাত বরণ করেন। এই সার্কিট হাউস ভবন দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ ব্যবহার করেছেন। এই ছোট সার্কিট হাউস ভবনটি আমাদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের নিদর্শন, যা দুর্লভ একটি স্থাপনা।
অনুরোধ পত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, এই ভবনের বারান্দায় বসে সামনের জুবিলী স্কুল মাঠ, সুরমা নদী, দূরের নীল পাহাড় অর্থাৎ সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপ বৈচিত্র উপভোগ করা যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলার ছোট অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহৃ, ঐতিহাসিক ও নান্দনিক স্থাপনা অবিকল সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সদয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য অনুরোধ করছি।
এই অনুরাধ পত্র একই সঙ্গে মন্ত্রী পরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সুনামগঞ্জের জেলা প্রশসককে পাঠিয়েছেন ড. মোহাম্মদ সাদিক।
সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকবাহিনী সুনামগঞ্জে এসে প্রথম অবস্থান নেয় পুরাতন সার্কিট হাউসে। ক্যাপ্টেন মাহবুব এর নেতৃত্বে ১১ জন পাকিস্তানি সৈন্য ছিলো এই দলে, ক্যাপ্টেন মাহবুব একা বাঙালি ছিলো।
খবর পেয়ে আনসার, মুজাহিদ, বিডিআর, ইপিআর ও পুলিশ মিলে চারদিক ঘিরে পাকবাহিনীর এই দলকে সার্কিট হাউজের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখে। চারদিকে গুলাগুলি শুরু হয়। সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে আনসারদের একটি দল অবস্থান নেয়। জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় ও নদীর তীরে মুক্তিকামী জনতা অবস্থান নেন।
পাকবাহিনীর অবস্থানের সংবাদ প্রচার হলে ছাত্র ইউনিয়নের মেনন ও মতিয়া গ্রুপ, ছাত্র লীগ সহ গণমানুষের একটি বিশাল মিছিল জুবিলী স্কুলের দিকে আসে। মিছিলকারীরা সরকারি জুবিলী স্কুল অতিক্রম করার সময় পাকবাহিনীর দল সার্কিট হাউজ থেকে গুলি করে। প্রথম গুলি রিকশা চালক গনেশের ওপর লাগে। গণেশকে পুরাতন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গণেশ মারা যান। গণেশ গুলি খাওয়ার ঘন্টা খানেক পরে সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের জানালা দিয়ে পাকবাহিনীর ছুঁড়া গুলিতে শহীদ হন আবুল হোসেন। পরবর্তীতে তাঁর নামেই হয় শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তন।
এই গুলাগুলির সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী’র মধ্যে দুই তিন জন আহত হয়। আহতরা হাসপাতালে আসার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা এদের আটকে রাখে। গভীর রাতে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির মাঝে সার্কিট হাউজ থেকে বের হয়ে মরাটিলা হয়ে পাকবাহিনীর দল পালিয়ে যায়। এই সার্কিট হাউস তাই মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সাক্ষী।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অ্যাডভোকেট আইনুল ইসলাম বাবলু বলেন, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে আগ্রহী করবে।
শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালেহ্ আহমদ বলেন, পুরাতন সার্কিট হাউস মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি বহন করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারক হোক এটি।
শহীদ আবুল হোসেনের ফুফাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক বলেন, সার্কিট হাউস ভবন সংরক্ষণের পাশাপাশি ওই দিনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী এখানে তুলে ধরার ব্যবস্থা হোক।
মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান বলেন, পুরাতন সার্কিট হাউসের এখন কোন প্রয়োজনীয়তা নেই, যেহেতু নতুন সার্টিক হাউস হয়েছে। আমি মনে করি পুরাতন সার্কিট হাউসকে এরকম না রেখে সুনামগঞ্জ’র মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাসকে আজীবন মনে রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর হতে পারে এটি ।
মুক্তিযোদ্ধা আইনজীবী বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ শুরু এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে পুরাতন সার্কিট হাউসকে কেন্দ্র করে । ঐতিহ্য যাদুঘরের মত পুরাতন সার্কিট হাউসকে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর করা যায়, তাহলে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, দেখতে পারবে । পুরাতন সার্কিট হাউস মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষী, এটি পরিবর্তন না করেই সংরক্ষণ করা জরুরি ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক এ প্রসঙ্গে বলেন, সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পুরাতন সার্কিট হাউস ভবনটি সুনামগঞ্জের একটি স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই ভবন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, তার স্থাপত্য সৌন্দর্য, অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতিধন্য একটি দুর্লভ স্থাপনা। এই স্থাপনাকে ঘিরে সুনামগঞ্জের আইনজীবী, লেখক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক সহ সুশীল সমাজের বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অনির্বচনীয় আবেগ জড়িত। এজন্য আমি মনে করছি এটি অবিকল সংরক্ষণ জরুরি।