মুজিববর্ষেই পর্যটনকে ব্রাণ্ডিং করার উদ্যোগ

বিশেষ প্রতিনিধি
সীমান্তের চারটি মুক্তিযুদ্ধ উপত্যকা, হাসন রাজা মিউজিয়াম, রাধারমণ, বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের উজানধলের বাড়ি, শহরের ঐতিহ্য জাদুঘর, তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর, সীমান্তের বারেকের টিলা, শিমুল বাগান, লাউড়ের রাজবাড়ী, গৌরারংয়ের জমিদার বাড়িসহ নানা ঐতিহ্যবাহী ও দৃষ্টিনন্দন এলাকাকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল পর্যটকদের কাছে দিনদিন আকর্ষণীয় হয়ে ওঠছে। গত ১৫ বছরে প্রতি মাসেই পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েছে। পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের স্থান হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে টাঙ্গুয়ার হাওর। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দল টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসছেন। মাঝে মধ্যে আসছেন বিদেশি পর্যটকরাও। বিলাবহুল ট্রলার থাকায় পর্যটকদের অনেকেই হাওরে এখন রাত্রিযাপনও করে থাকেন। উপজেলা সদরে আবাসিক হোটেল থাকলেও হাওর দেখতে অনেক পর্যটকই নৌকায়
রাত্রিযাপন করেন।
প্রতিটি দলে থাকছেন ১৫ থেকে ২০ জন করে পর্যটক। সাধারণত ছুটি ও বন্ধের দিনই পর্যটকদের আগমণ বেশি হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে এসে পর্যটকরা মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগান, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রী লেক), লাকমা ছড়া, চাঁনপুর ঝর্ণা, বড়গোপ টিলা (বারেক টিলা), যাদুকাটা নদী ছাড়াও হাওর, সীমান্তে বসবাসকারী পরিবার এবং আদিবাসীদের জীবনযাপন দেখে মুগ্ধ হন। পর্যটকদের সুবিধার্থে এসব এলাকায় নানা ধরণের কাজে স্থানীয়রা সম্পৃক্ত আছেন। হাওরে ঘুরে বেড়ানো ও রাত্রিযাপনের একমাত্র ব্যবস্থা নৌযান হওয়ায় অনেক বাহারী ও বিলাসবহুল নৌযান গড়ে ওঠেছে তাহিরপুর উপজেলায়। বিলাসবহুল অন্তত ২০টি নৌযান পর্যটকদের ভ্রমণকে নিরাপদ ও আনন্দময় করতে ভাড়ায় চলছে। এছাড়াও ছোট বড় আরো শতাধিক নৌযান রয়েছে ভাড়ায় চালিত।
তাহিরপুর উপজেলার রতনশ্রী গ্রামের আতাউর রহমান তালুকাদার জানালেন, হাওর দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য তিনিই প্রথম বিলাসবহুল নৌযান নির্মাণ করেন। এই নৌযানে দিনের বেলায় ১৫০ থেকে ২শ’ পর্যটক ঘুরে বেড়াতে পারেন। রাত্রিযাপনের জন্য ২২ জন পর্যটকের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে আলাদা কেবিন আছে, দুইটি খাট আছে। আছে বালিশ, লেপ, তোষক ও মশারির ব্যবস্থা। নৌযানটিতে তিনটি টয়লেট রয়েছে, এর মধ্যে একটি হাই কমোড আর দুইটি ফ্ল্যাট কমোড। ফø্যাট কমোডের একটি নৌকার স্টাফদের জন্য। নিজস্ব পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য আলাদাভাবে বেসিন দেওয়া আছে। বেসিন ও টয়লেটে পানি সরবহরাহের জন্য তিনশ’ লিটার পানি ধারণ ক্ষমতার ট্যাংকি রয়েছে নৌযানটিতে। নৌযানের নিজস্ব মোটরে এই রিজার্ভ ট্যাংকিতে পানি উঠানো হয়। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবাহের জন্য আইপিএস এর ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে ল্যাপটপ মোবাইল সবই চার্জ দেওয়া যায়। আর আলোর ব্যবস্থাতো আছেই। আইপিএসটি নৌকার ইঞ্জিন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হয়ে থাকে। ইঞ্জিনের শব্দদুষণ ঠেকাতে থাই গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। শক্তিশালী ইঞ্জিনে চলা নৌযানটির গতি কমানো বাড়ানোর জন্য অটো গিয়ারের ব্যবস্থা রয়েছে। নৌযানটির ছাদে এক সাথে দেড় শ’ লোক যে কোন অনুষ্টান পরিচালনা করতে পারে।
টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসা পর্যটকরা সুনামগঞ্জ শহরের মরমি কবি হাসন রাজার বাড়ি’র হাসন রাজা মিউজিয়াম, ঐতিহ্য জাদুঘর এবং গৌরারং জমিদার বাড়ির প্রাচীণ ঐতিহ্যও দেখছেন। কেউ কেউ সুরমা নদী পার হয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৪৮ শহীদের কবরস্তান দেখতে ডলুরায় যাচ্ছেন। কেউবা উজানধলে বাউল স¤্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়ি, আবার কেউ যাচ্ছেন জগন্নাথপুরের ইশাকপুরে রাধারমণের আস্থনায়। দোয়ারাবাজার সীমান্তের বাঁশতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্তান ও ঝুমগাঁও আদিবাসী পল্লীতেও যাচ্ছে পর্যটকেরা।
টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটকেরা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিবেশ বিশুদ্ধ রাখা এবং নৌ-যান আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বললেন স্থানীয়রা।
তাহিরপুরের বাসিন্দা, লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষক নেতা গোলাম সরোয়ার লিটন জানালেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে বিলাসবহুল অন্তত ২০টি নৌযান পর্যটকদের ভ্রমণ কে নিরাপদ ও আনন্দময় করতে ভাড়ায় চলছে। এছাড়াও ছোট বড় আরো শতাধিক নৌযান রয়েছে, পর্যটকদের নিয়ে হাওরে ভাড়ায় চালিত।
স্টীলের পাঠাতনে নির্মিত ছয়টি আকর্ষণীয় নৌযান তাহিরপুর উপজেলা সদর থেকে পর্যটকদের নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই হাওর ঘুরছে এবং পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দে রাত কাটাচ্ছেন এসব নৌযানে।
তাহিরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানালেন, পর্যটকরা তাহিরপুর, টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, বারেকেরটিলা, যাদুকাটা ভ্রমণ করে ফিরতে চান, সেই অনুয়ায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন চান। ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাহিরপুর উপজেলা সদরের সমাবেশে বলেছিলেন, তাহিরপুরের হাওর, লাউড়ের রাজবাড়ী ও সীমান্ত এলাকাকে ঘিরে পর্যটকজোন গড়ে তোলা হবে। আমাদের প্রত্যাশা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়ন হবে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানালেন, মুক্তিযোদ্ধা উপত্যকা, মরমি সাধক রাধারমণ, হাসনরাজা, শাহ্ আব্দুল করিম, দুর্ব্বিন শাহ্সহ অসংখ্য বাউল কবির পাদপীঠ এই জেলা। শতাধিক হাওরের রূপ সৌন্দর্য্য রয়েছে এখানে। রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো বিশাল হাওর। টেকেরঘাটের শহীদ সিরাজ লেক, বারেকের টিলা ও শিমুল বাগানকে সম্ভাবনাময় পর্যটন জোন তৈরির জন্য আন্ত:মন্ত্রণালয় ও আন্ত:বিভাগীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং হয়রানিমুক্তভাবে পর্যটকদের কাছে এই এলাকাকে ব্রা-িং করার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রস্তাবনা প্রেরণ করা হয়েছে। এই প্রস্থাবনার মধ্যে রয়েছে জেলায় এবং টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ে নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ে এবং জেলা সদরে বিআইডব্লিউটিএ’র অফিস স্থাপন, একই সঙ্গে ট্যুরিজম বোর্ডের অফিসও স্থাপন করার প্রস্তাব। মুজিববর্ষেই সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের লক্ষ্য সকলের সহযোগিতায় সুনামগঞ্জের পর্যটনকে ব্রা-িং করা।