মেঘালয়ে উত্তোলিত ২ লাখ টন কয়লা রপ্তানী হবে

বিশেষ প্রতিনিধি
ভারতের ন্যাশনাল গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) ২ লাখ টন উত্তোলিত কয়লা রপ্তানীর অনুমতি দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা এই তথ্য জানিয়ে বলেছেন, জাতীয় গ্রীণ ট্রাইব্যুনালের (এনজিটি) একটি কমিটি এই রাজ্যে দুই লাখ টন উত্তোলিত কয়লা নিলামের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে কয়লা পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও নিয়ম নীতি অনুসরণ করার শর্ত দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মেঘালয়ের শিলংয়ের ইংরেজি দৈনিক শিলং টাইমস’এ শুক্রবার প্রকাশিত ‘এনজিটি এলাও অকসন অব টু লাখ মে.টন অব কোল’ শীর্ষক সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, বিচারপতি (অব) বি ডি আগরওয়ালের নেতৃত্বে এনজিটি কমিটি বৈঠকে চারটি জেলায় প্রাথমিকভাবে দুই লাখ টন কয়লা পরিবহনের অনুমোদন দেন। এনজিটি কমিটি ৩২ লাখ টন উত্তোলিত কয়লার মধ্যে ২ লাখ টন নিলাম করার জন্য অনুমোদন দিয়েছেন।
এর মধ্যে পূর্ব খাসি পাহাড়ে ৫০,০০০ টন, যা বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী দিয়ে রপ্তানী হতে পারে। পূর্ব জৈন্তিয়া পার্বত্য অঞ্চলে ৭৫,০০০ টন, যা বাংলাদেশের সিলেটের ডাউকি শুল্কস্টেশন দিয়ে রপ্তানী হতে পারে। দক্ষিণ পশ্চিম খাসি পাহাড় ২৫,০০০ টন। যা বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী দিয়ে রপ্তানী হতে পারে। দক্ষিণ গারো পাহাড়ে ৫০,০০০ টন। যা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট শুল্কস্টেশন দিয়ে রপ্তানী হতে পারে।
সংবাদে উল্লেখ করা হয়, নিলাম কার্যক্রম সরকারী মালিকানাধীন এমএসটিসি লিমিটেড (ধাতব স্ক্র্যাপ এবং ট্রেডিং কর্পোরেশন) দ্বারা পরিচালিত হবে। নিলাম প্রক্রিয়ায় মেঘালয় সরকারের কোনও ভূমিকা নেই। এতে রাজস্ব হিসাবে রাজ্য কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা পাবে। মোট নিলামের মধ্যে বিড মূল্যের ১০ শতাংশ কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড কেটে নেবে। বাকী রাজ্য সরকারকে হস্তান্তর করা হবে এবং রয়্যালটি কেটে নেওয়া হবে। বাকি অর্থ পাবেন সংশ্লিষ্ট কয়লা স্টক মালিক।
মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা বলেন, কয়লা অবৈধ উত্তোলন বা পরিবহন পাওয়া গেলে এমএমডিআর আইন ১৯৫৭ এর ২১ ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নিলামের সময় এবং কয়লা পরিবহনের সময় কঠোর পরিবেশগত নিয়মকানুন অনুসরণ করা যেতে পারে তা নিশ্চিত করতে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন অস্থায়ী ডিপো স্থাপন করা হবে। এসময় সিআইএল কর্মকর্তাদের উপস্থিতি, কিউআর কোডের মতো নির্বোধ সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকার শীঘ্রই পরিবেশবান্ধব এবং বৈজ্ঞানিক খনির পদ্ধতি নিয়ে আসবে। রাজ্য সরকারও একটি খসড়া পরিবেশ বান্ধব খনির পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে। খুব শীঘ্রই ভারত সরকারের অনুমোদনের পর খনির কাজ শুরু করা হবে।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ৩ শুল্ক বন্দরে প্রায় ৬০০ আমদানীকারক ভারতীয় কয়লা আমদানী করেন। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় কয়লা শুল্কস্টেশন এগুলো। শুল্কস্টেশন চালু থাকলে কমপক্ষে ৫০ হাজার শ্রমিক এসব বন্দরে কাজ করেন। ২০১৪ ইংরেজি’র ১৩ মে থেকে এই শুল্কবন্দরগুলোর দুর্দিন যাচ্ছে। বেশিরভাগ সময়ই এই বন্দরগুলো দিয়ে কয়লা আমদানী হয় নি। একারণে এই উপজেলাসহ জেলা শহর সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোণা জেলা শহরেও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে। কয়লা ব্যবসায় দুর্দিন থাকায় এই দুই জেলা শহরে জমি-জমার মূল্যও কমে গেছে।
ভারতের মেঘালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন ডিমাহাসাও জেলা ছাত্র ইউনিয়নের আবেদনের ভিত্তিতে ২০১৪ ইংরেজির ১৭ এপ্রিল ন্যাশনাল গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) মেঘালয় সরকারের অবৈধ কয়লা খনন ও পরিবহন বন্ধের নির্দেশ দেন। একই বছরের ৬ মে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় মূখ্যসচিব এব্যাপারে প্রতিটি জেলায় নির্দেশ জারি করেন। গ্রীণ ট্রাইব্যুনালের এই নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয় মেঘালয়ের জেলা প্রশাসকদের। এ কারণে ২০১৪ ইংরেজির ১৩ মে থেকে মেঘালয়ের সীমান্ত জেলাগুলোয় ১৪৪ ধারা জারি করে কয়লা পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শুল্কবন্দর সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বড়ছড়া-চারাগাঁও ও বাগলী দিয়ে কয়লা আমদানী বন্ধ হয়ে যায়।
রপ্তানীকারকরা আইনী লড়াই করে প্রথমে উত্তোলিত কয়লার রাজস্ব জমা দিয়ে ৩ মাস (এপ্রিল, মে ও জুন’২০১৫) রপ্তানীর সুযোগ পান। পরে এই সময় ৬ দফায় বাড়িয়ে গত প্রায় সাড়ে ৫ বছরে ২৭ মাস উত্তোলিত কয়লা রপ্তানী হয়।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তোলিত কয়লা রপ্তানীর সুযোগ দেয়।
তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক গ্রুপের সদস্য সচিব রাজেশ তালুকদার জানান, ভারতের ন্যাশনাল গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল বৃহস্পতিবার মেঘালয়ের ২ লাখ টন উত্তোলিত কয়লা মৌখিক চালানের ভিত্তিতে রপ্তানী করার আদেশ দিয়েছেন। মেঘালয়ে ৩২ লাখ টন উত্তোলিত কয়লা রয়েছে। এরমধ্যে ২ লাখ টন কয়লা রপ্তানী করার সুযোগ পেয়েছেন রপ্তানীকারকরা।
রাজেশ জানালেন, ওপারের রপ্তানীকারকরা জানিয়েছেন আগামীকাল শনিবার থেকে এপারে ওপারে পরিবহন শ্রমিকদের করোনা পরীক্ষা করা হবে। সক্রিয় থাকবে মেডিকেল টিম।
সিলেটের কাস্টমস বিভাগের সহকারী কমিশনার আহমেদুর রেজা চৌধুরী বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৫ শুল্কস্টেশনের জন্য দুই লাখ টন, খুব বেশি কয়লা নয়। এই কয়লা আমদানী হতে বেশি দিন সময় লাগবে না। বৃহস্পতিবার ভারতের গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দিয়েছেন বলে আমরা জেনেছি।
তিনি জানান, করোনা ভাইরাসের জন্য শুল্কবন্দরে আমদানী রপ্তানীতে কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শুল্কবন্দরে মেডিকেল টিম রয়েছে আগে থেকেই।