মেঘ দেখলেই বাড়ি ফিরছেন কৃষক

ইয়াকুব শাহরিয়ার, দ. সুনামগঞ্জ
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে বজ্রপাত আতঙ্কে হাওরে ধান কাটতে যাচ্ছেন না সাধারণ কৃষকরা। আর যারা যাচ্ছেন আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছেন। এতে বিঘিœত হচ্ছে ফসল তোলার কাজ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। প্রতিকূল আবওয়া হলে শুধু হাওরেই নয়, বাড়ির কাছে খলায় স্তুপ করা ধানের কাছেও যাচ্ছেন না তারা। একে তো বৈরি আবহাওয়া তার উপর স্তুপ করা ধান ঘরে তোলাতে কৃষকদের মাঝে বজ্রপাত আতঙ্ক কাজ করায় স্তুপাকৃত ধানে চারা গজানো শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকদের মাঝে কাজ করছে হতাশা। তারা দুশ্চিন্তায় কাটাচ্ছেন প্রতিটি মেঘলা দিন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলাসহ জেলায় প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে। হাওরে কৃষক মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃতির বেখেয়ালি এই দুর্যোগ।
কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এ বছরের মতো আর কোনো বছরই এতো বজ্রপাত হয়নি। জেলার প্রায় প্রতিটি হাওরে প্রতিদিনই মানুষ মরছে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জেও এ পর্যন্ত দু’একজন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাই আকাশে মেঘের আভাস পাওয়া মাত্রই তারা মাঠ থেকে বাড়িতে অথবা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যত দ্রুত সম্ভব তারা মাঠ ছাড়েন। কোনো কোনো দিন বজ্রপাতের ভয়ে মাঠ থেকে বাড়ি চলে এলে আর মাঠে যাওয়া হয় না।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি জমিরুল হক জম্মু জানান, খলায় বাদশা মেম্বারের প্রায় ২শ’ মণ ধান স্তুপ করে রাখা আছে। ইতোমধ্যে সব ধানেই চারা গজিয়েছে। রোদ এবং বজ্রপাত আতঙ্কে একটা ধানও ঘরে তুলা যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বীরগাঁওয়ের পাখিমারা হাওরের সংলগ্ন বিশাল খলায় শতাধিক ধানের স্তুপ। জীবনের মায়া ত্যাগ করে গোটা দশেক কৃষক কাজ করছেন। বাকী সবাই বজ্রপাত আতঙ্কে ঘর থেকে বের হননি। এমন সময় তারাহুড়ো করে খলা থেকে টুকরি হাতে বাড়ি ফিরছিলেন আবুল হোসেন। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, ‘বাবারে, বাড়িত জাইরামগি। জানে বাঁচলে ধান পাইমুনে। যে ঠাটা দের, আগে জীবন বাঁচাই।’
হাওর থেকে
কাটা ধান নৌকায় করে বীরগাঁও ব্রিজের নিচে পাড়ে তুলছিলে পূর্ব পাড়ার কৃষক আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘হাওরে তো কৃষকের নিরাপত্তা নাই। সরকার কৃষকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতি হাওরে একটি করে আশ্রয় কেন্দ্র করলে বেশ উপকার হতো। দুর্যোগ বা বজ্রপাতের সময় আশ্রয় নেওয়ার জায়গা পাওয়া যেতো।’
হাঁসকুড়ি গ্রামের ইউপি সদস্য আবুল খয়ের বলেন, ‘আবহাওয়া ভালো না হলে আমরা মাঠেই যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। গতো বছর শালদিঘার হাওরে একজন বজ্রপাতে মৃত্যবরণ করার পর থেকে জনমনে এ আতঙ্ক কাজ করে।’
জয়কলসের আসামপুর গ্রামের উকিল আলীর বাড়িতে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট থেকে ধান কাটতে এসেছেন শ্রমিক খোকন মিয়া। তিনি বলেন, ‘আকাশে মেঘ থাকলেই আমরা কাজ ফেলে বাড়িতে চলে আসি। বজ্রপাতের প্রচ- ভয় কাজ করে মনের ভিতর। প্রতিদিনই মানুষ মরছে। হাওরে একটি আশ্রয় কেন্দ্র করা দরকার।’